ঢাকা | বঙ্গাব্দ

কুড়িগ্রামে মিলল বিরল সিঁদুরে মৌটুসির দেখা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 28, 2026 ইং
কুড়িগ্রামে মিলল বিরল সিঁদুরে মৌটুসির দেখা ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

বাংলাদেশের সীমানায় বসবাসরত প্রজাতির মধ্যে সিঁদুরে মৌটুসিকে অন্যতম আকর্ষণীয় এবং দৃষ্টিনন্দন পাখি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দীর্ঘকাল ধরে কেবল আলোকচিত্রেই এই প্রাণীর রূপ উপভোগ করা সম্ভব হয়েছিল, তবে বাস্তবে একে চাক্ষুষ করার তীব্র বাসনা ছিল মনে।

রংপুর অঞ্চলে এই পাখি খুঁজে পাওয়ার জন্য অতীতে ব্যাপক চেষ্টা চালানো হয়েছে। এই প্রজাতির পাখি মান্দার ফুলের মধু অত্যন্ত পছন্দ করে বিধায় মান্দার ফোটার ঋতুতে এদের সন্ধান করার প্রবণতা বহুগুণ বৃদ্ধি পেত।

পক্ষী বিশারদ ও খোঁজখবর রাখা ব্যক্তিরা তখন জানিয়েছিলে যে রংপুরে এই পাখি পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। এমনকি সমগ্র উত্তরাঞ্চলের কোথাও এর উপস্থিতি নেই বলেও তারা নিশ্চিত করেছিলেন।

গভীর বনের এই প্রাণীটি মূলত সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান, সুন্দরবন এবং চট্টগ্রামের হাজারিখিল এলাকায় সচরাচর বিচরণ করে থাকে। এসব তথ্য জানার পর রংপুর অঞ্চলে এই সুন্দর পাখিটির সন্ধান করা চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।

লেখকের পৈতৃক নিবাস কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলায় অবস্থিত। ২০২২ সালের একটি শীতের মৌসুমের সকালবেলা নিজ বাড়িতেই এই দুর্লভ অতিথির দেখা মিলেছিল।

সকালের খাবার গ্রহণের সময় দূরে একটি শিম ফুলে সিঁদুরে মৌটুসিকে মধু পান করতে দেখা যায়। দৃশ্যটি সত্য কি না তা নিয়ে মনে সামান্য দ্বিধা ও সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছিল।

খাবারের পাট চুকিয়ে দ্রুত ক্যামেরা হাতে নিয়ে ছবি বন্দি করার কাজ শুরু করা হয়। উচ্চমানের ছবি না পাওয়া গেলেও কুড়িগ্রামের মাটিতে এই পাখি দেখতে পাওয়া একটি ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকে।

দেশের উত্তর জনপদে বন্যপ্রাণী ও পাখির আলোকচিত্র ধারণ করেন এমন অনেকের সঙ্গেই এ বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তাদের সবার বক্তব্য অনুযায়ী, উত্তরাঞ্চলের ভূখণ্ডে এই পাখি দেখার কোনো পূর্বরেকর্ড কারোরই জানা নেই।

কুড়িগ্রামের সীমানার বাইরেও যদি উত্তরাঞ্চলের অন্য কোথাও এই পাখি থেকে থাকে, তবুও একে এই এলাকায় একটি বিরল প্রজাতি হিসেবে অভিহিত করা উচিত।

গভীর বনের এই পাখি কীভাবে গাছপালাহীন লোকালয়ে এসে হাজির হলো তা নিয়ে অনেকেই গভীর বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। পরবর্তীতে জানা গেছে যে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার বিভিন্ন স্থানেও এই পাখির সরব উপস্থিতি রয়েছে।

নাগেশ্বরী উপজেলায় আলোকচিত্রী সঞ্জয় চৌধুরী এই পাখির ক্যামেরাবন্দি রূপ ফুটিয়ে তুলেছেন। এর মাধ্যমে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে কুড়িগ্রাম জেলার একাধিক উপজেলায় এই পাখির নিয়মিত বসবাস রয়েছে।

একবার নিজ চোখে দেখার সুবাদে পরবর্তী সময়ে যখনই গ্রামের বাড়িতে যাওয়া হয়, তখনই এই পাখির খোঁজ করা হয়। লিচু ফোটার ঋতুতে বাড়ির গাছগুলোতে প্রচুর পরিমাণে বিভিন্ন প্রজাতির পাখির আগমন ঘটে।

২০২৩ সালে লিচুর পাশাপাশি অন্যান্য পাখির ছবি তোলার কাজ করছিল ক্যামেরা। ফুলঝুরি, শ্বেতাক্ষী এবং বুলবুলি পাখির দল বারবার এসে লিচু খাচ্ছিল সেই সময়ে।

নানা পাখির ছবি তোলার ফ্রেমে হুট করেই নানা রং ছড়াতে ছড়াতে হাজির হয় একটি সিঁদুরে মৌটুসি। এই পাখি যে গাছের লিচুর রস ভক্ষণ করে, সে সম্পর্কে পূর্বে কোনো ধারণা ছিল না এবং কারো ছবিতেও তা দেখা যায়নি।

লিচুর রস পান করার মুহূর্তের অত্যন্ত মনোরম একটি ছবি ক্যামেরাবন্দি করতে সক্ষম হওয়া গেছে। এর বাইরেও কুড়িগ্রামের রাজারহাটের বৈদ্যেরবাজার এলাকার মধুমঞ্জরী ও জবা ফুলের গাছে এই পাখির দেখা মিলেছে।

অন্য আরেকটি দিনের কথা স্মরণ করলে দেখা যায়, গ্রামের বাড়ি থেকে দুই দিন কাটিয়ে ফেরার প্রাক্কালে উঠানে থাকা গোলাপজাম ফুলে সিঁদুরে মৌটুসির দেখা মিলল।

পরবর্তী সময়ে গোলাপজাম ফুলের ওপর অবস্থান করা এই পাখির অত্যন্ত চমৎকার কিছু ছবি সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে। ইতিপূর্বে ২০১৯ সালে গোলাপজাম ফুলের সঙ্গে সিঁদুরে মৌটুসি প্রজাতির একটি স্ত্রী পাখির ছবি তোলা হয়েছিল।

স্ত্রী প্রজাতির এই পাখিটি পুরুষ পাখির মতো বর্ণিল বা আকর্ষণীয় রঙের হয় না। এছাড়া সেই সময় পাখিটিকে ভালোভাবে চেনার সুযোগও তৈরি হয়নি।

২০২৩ সালের পর উদ্ভূত পরিস্থিতি এবং অভিজ্ঞতার আলোকে স্পষ্ট হয় যে ২০১৯ সালে ধারণকৃত ছবিটি আসলে একটি স্ত্রী সিঁদুরে মৌটুসিরই ছিল।

পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালে সুন্দরবন ভ্রমণকালে এই পাখিকে অত্যন্ত কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ হয়েছে। একই সঙ্গে চট্টগ্রামের হাজারিখিল অঞ্চলেও এই পাখির দেখা পাওয়া গেছে।

সেখানে এই প্রজাতির পাখি এক বিশেষ ধরনের পরগাছা ফুলের মধু সংগ্রহে ব্যস্ত ছিল। হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে মান্দার ফুলের সঙ্গে এই পাখির ছবি অনেকেই তুলেছেন।

যদিও সেই স্থানে ছবি তোলার সৌভাগ্য হয়নি, তবুও লিচু বা গোলাপজাম ফুলের সঙ্গে এই পাখির সান্নিধ্য পাওয়ার অনুভূতি মনকে পরিপূর্ণ করার জন্য যথেষ্ট।

এই পাখির মাথা, গ্রীবা এবং এর সংলগ্ন এলাকার অংশবিশেষ সিঁদুরের ন্যায় প্রখর লাল রঙে আচ্ছাদিত। কেবল এর কপাল এবং দুই চোখ কালচে রঙের হয়ে থাকে।

চঞ্চুর গোড়ার দিক থেকে শুরু করে একটি কালো রেখা লাল অংশের ওপর দিয়ে গ্রীবার দিকে প্রসারিত হয়েছে। পাখিটির চঞ্চু বা ঠোঁট লালচে প্রভাবযুক্ত।

ফুল থেকে সহজে মধু আহরণ করার সুবিধার্থে এর একটি দীর্ঘ জিহ্বা রয়েছে। লাল রঙের অংশটুকু বাদ দিলে এই পাখির দেহের বাকি অংশ ধূসর বর্ণ ধারণ করে।

শারীরিক গঠনের দিক থেকে এই পাখি অন্য সমস্ত মৌটুসি প্রজাতির তুলনায় সামান্য বড় আকৃতির হয়ে থাকে। সিঁদুরে মৌটুসির ইংরেজি পরিচিত নাম ‘Crimson Sunbird’।

জীববিজ্ঞানসম্মত বা বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় এই সুন্দর পাখিটিকে Aethopyga siparaja নামে নামকরণ করা হয়েছে।

সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
দেড় কোটি টাকার অক্সিজেন প্ল্যান্ট বন্ধ থাকায় ঝুঁকি বাড়ছে রোগ

দেড় কোটি টাকার অক্সিজেন প্ল্যান্ট বন্ধ থাকায় ঝুঁকি বাড়ছে রোগ