নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক জলপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের সময় ভয়াবহ মাইন বিস্ফোরণের মুখে পড়ে চারটি তেলবাহী জাহাজ। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় জাহাজগুলোয় আকস্মিক আগুন ধরে যাওয়ার রোমহর্ষক তথ্য নিশ্চিত করেছে দেশটির সামরিক বাহিনী। গতকাল বৃহস্পতিবার ঠিক কী কারণে এই বিপর্যয় ঘটল, তা নিয়ে চারদিকে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি প্রকাশিত একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে হরমুজ প্রণালির নির্দিষ্ট জলসীমায় মাইন বিস্ফোরণের শিকার হয়ে তিনটি তেলবাহী ট্যাংকারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এই নৌযানগুলো তখন প্রণালির দক্ষিণ দিকের সম্পূর্ণ অনুমোদনহীন ও নিষিদ্ধ রুট দিয়ে অতিক্রম করার অপচেষ্টা চালাচ্ছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
একই দিনে ইরানের সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে যে, মাইন বিস্ফোরণের ফলে ওই প্রণালির পূর্ব দিকে আরও একটি তেলবাহী জাহাজে মারাত্মক আগুন লেগে যায়। সেনাবাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, এই নির্দিষ্ট জাহাজটিও তখন প্রণালির অত্যন্ত সংরক্ষিত এবং চরম ঝুঁকিপূর্ণ ও বিপজ্জনক এলাকা দিয়ে অতিক্রম করার চেষ্টা করছিল।
ঘটনার ঠিক এক দিন আগে মার্কিন সামরিক বাহিনী দাবি করেছিল যে, তারা এই কৌশলগত প্রণালিটি থেকে সমস্ত মাইন সফলভাবে অপসারণ করেছে এবং নিরাপদ জাহাজ চলাচলের পথ সম্পূর্ণ পরিষ্কার করা হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতেও দফায় দফায় মাইন বিস্ফোরণের ফলে একাধিক জলযানে আগুন ধরার সুনির্দিষ্ট তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করে আসছে ইরান।
আইআরজিসির প্রকাশিত বিবৃতিতে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে যে, দুর্ঘটনাগ্রস্ত প্রথম তিনটি জাহাজ চলাচলের সময় তাদের নিজস্ব রাডার এবং নেভিগেশন সিস্টেম সম্পূর্ণ বন্ধ রেখেছিল। শুধু তাই নয়, তারা ইরানি নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে বারবার দেওয়া জরুরি সতর্কবার্তাকেও চরমভাবে উপেক্ষা করে সামনের দিকে এগিয়ে গিয়েছিল।
এখন পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত এই তেলবাহী জাহাজগুলোতে ঠিক কোন সুনির্দিষ্ট সময়ে আগুন ধরে গিয়েছিল কিংবা নৌযানগুলো ঠিক কোন দেশের পতাকা বহন করছিল, সে বিষয়ে কোনো তাৎক্ষণিক তথ্য গণমাধ্যমের সামনে প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি।
এর পাশাপাশি, ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও গতকাল রাতে গণমাধ্যমকে জানিয়েছে, ওমানের খাসাবের উত্তর-পূর্বে প্রায় ২৫ নটিক্যাল মাইল বা প্রায় ৪৬ কিলোমিটার দূরে হরমুজ প্রণালিতে একটি জাহাজে আগুন লাগার খবর তাদের কাছে এসে পৌঁছেছে। এর আগে ঠিক একই এলাকায় আরও দুটি নৌযানে রহস্যজনকভাবে আগুন ধরার তথ্যও নিশ্চিত করেছিল এই ব্রিটিশ নিরাপত্তা সংস্থাটি।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে এর আগেই জোরালো দাবি করেছিল যে, তারা প্রধান বাণিজ্যিক পথগুলো থেকে সব মাইন সম্পূর্ণ সরিয়ে নিয়েছে। তবে গতকাল বৃহস্পতিবার সেন্টকমের এই দাবির সত্যতা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেইন মোহেবি।
আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেইন মোহেবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি কঠোর পোস্ট দিয়ে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে বলেছেন যে, স্রেফ বিবৃতির ওপর নির্ভর না করে মার্কিন বাহিনীর উচিত তাদের এই দাবির স্বপক্ষে যথেষ্ট ও যথাযথ প্রমাণ সবার সামনে তুলে ধরা।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধের পর থেকেই কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল কার্যত পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পুরো বিশ্বে প্রতিদিন যে পরিমাণ জ্বালানি তেল ব্যবহৃত হয়, তার প্রায় এক-পঞ্চমাংশই এই বিশেষ প্রণালিটি দিয়ে পরিবহন করা হতো।
হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার এই পদক্ষেপের বিপরীতে ইরানের বিভিন্ন বন্দর এলাকায় কঠোর নৌ অবরোধ আরোপ করে রেখেছে পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে তারা পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে তেলবাহী জাহাজগুলোকে ইরানের সম্ভাব্য হামলা থেকে রক্ষা করতে এবং নিরাপদে চলাচলের ক্ষেত্রে সর্বাত্মক সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম গত রোববার একটি বিশেষ পরিসংখ্যানে জানিয়েছে যে, গত গ্রীষ্মকাল থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত হরমুজ প্রণালির জলপথ ব্যবহার করে উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রায় ১৫০ কোটি ব্যারেল তেল রপ্তানি কার্যক্রমে তারা সামরিক সহায়তা প্রদান করেছে।
গতকাল প্রকাশিত নিজেদের ওই বিবৃতিতে আইআরজিসি আরও সতর্ক করে বলেছে যে, হরমুজ প্রণালির সমস্ত অনুমোদনহীন ও বিপজ্জনক পথে সুকৌশলে মাইন পেতে রাখা হয়েছে। এসব নিষিদ্ধ পথে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করার সব দায় পুরোপুরি সংশ্লিষ্ট জাহাজের মালিক ও তাদের নাবিকদের ওপরই বর্তাবে।
আইআরজিসির পক্ষ থেকে আরও জোরালোভাবে বলা হয়েছে যে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের এই ধরনের কোনো বিভ্রান্তিকর বক্তব্যে সাধারণ নৌযানগুলোর মালিক ও নাবিকদের কখনোই কান দেওয়া উচিত হবে না।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর