নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
আমাদের দেশের বাস্তবতায় বিষয়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও তাৎক্ষণিক গুরুত্ব বহন করে। রাজনৈতিক মতবিরোধ, সামাজিক অস্থিরতা কিংবা সংবেদনশীল কোনো পরিস্থিতির সময় যাচাই-বাছাই ছাড়াই বিভিন্ন তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং সাধারণ মানুষের মনে মারাত্মক বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে।
পুরোনো ছবিকে সাম্প্রতিক ঘটনার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া, ডিজিটাল প্রযুক্তির সাহায্যে সম্পাদিত ভিডিওর মাধ্যমে ভুল ধারণা ছড়ানো কিংবা বিভ্রান্তিকর শিরোনামে কোনো বক্তব্য প্রকাশ করার মতো ঘটনা ঘটে থাকে। এগুলোর নেতিবাচক প্রভাব কেবল ব্যক্তিপর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং পুরো সমাজেই এর সুদূরপ্রসারী প্রতিক্রিয়া পড়ে।
ብዙ সময় এ ধরনের অসত্য তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সাধারণ মানুষ কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা সম্প্রদায়ের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব গড়ে তোলে এবং ক্ষেত্রবিশেষে এর জেরে মারাত্মক সংঘাতও সৃষ্টি হতে পারে। তাই বর্তমান সময়ে অপতৎপরতা ও ভুল তথ্য মোকাবিলা করার জন্য শুধুমাত্র প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ বা ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়, এর জন্য প্রয়োজন সাধারণ মানুষের সচেতনতা, পেশাদার সাংবাদিকতার নৈতিকতা এবং তথ্য যাচাইয়ের একটি সুদৃঢ় সামাজিক সংস্কৃতি।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্র ও সরকারের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অনস্বীকার্য। সরকারি তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করা, তথ্য অধিকার আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা এবং সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টি করা হলো একটি দায়িত্বশীল তথ্যপরিবেশ গড়ে তোলার মূল শর্ত।
পাশাপাশি, ভুল তথ্য বা অপপ্রচার প্রতিরোধের নাম করে গণমাধ্যমের ওপর কোনো ধরনের অযৌক্তিক বিধিনিষেধ আরোপ করা বা সরকারের সমালোচনাকারী কণ্ঠস্বরকে অবদমিত করার মানসিকতা পরিহার করতে হবে। কারণ একটি স্বাধীন ও মুক্ত গণমাধ্যম সবসময়ই রাষ্ট্র এবং সাধারণ নাগরিকের মাঝে সঠিক তথ্যের সেতু হিসেবে কাজ করে।
অন্যদিকে সংবাদমাধ্যমগুলোকেও তাদের তথ্য যাচাইয়ের প্রক্রিয়া এবং কোনো ভুল হলে তা সংশোধনের বিষয়ে পূর্ণ স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে। এর মাধ্যমে তারা সাধারণ মানুষের মাঝে সচেতনতা তৈরিতে জোরালো ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী প্রতিটি নাগরিককে এটি মনে রাখতে হবে যে, কোনো তথ্য পড়ার সঙ্গে সঙ্গে যদি আবেগ তীব্রভাবে উসকে ওঠে কিংবা তা নিজের রাজনৈতিক বা সামাজিক মতাদর্শের সঙ্গে মিলে যায়, কেবল সে কারণেই সেটিকে সত্য বলে ধরে নেওয়া যায় না।
যাচাই না করে যেকোনো তথ্য অনলাইনে শেয়ার বা পুনরুৎপাদন করাও মূলত অপতথ্যের বিস্তার ঘটাতে প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা করে। অনেক সময় প্রকৃত দায়িত্বশীলতার সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো—সম্পূর্ণ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কোনো সন্দেহজনক তথ্য প্রচার বা প্রকাশ থেকে বিরত থাকা।
জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা ইউনেসকোর বৈশ্বিক গণমাধ্যম ও তথ্য সাক্ষরতা সপ্তাহ আমাদের সামনে এই বাস্তবতাকে নতুন করে অনুধাবন করার একটি মোক্ষম সুযোগ এনে দেয়। তবে গণমাধ্যম সাক্ষরতা বিষয়টি কেবল কোনো একটি নির্দিষ্ট সপ্তাহের আনুষ্ঠানিক উদযাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়।
এটি মূলত আমাদের নিয়মিত শিক্ষাচর্চা এবং দৈনন্দিন নাগরিক সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গড়ে ওঠা প্রয়োজন। কারণ, তথ্যের এই বিশাল দুনিয়ায় সচেতনতা ও সতর্কতা ছাড়া তথ্যের স্বাধীনতার সঠিক ব্যবহার করা কখনোই সম্ভবপর নয়।
অনুরূপভাবে, একটি স্বাধীন গণমাধ্যম ছাড়া দেশের সাধারণ নাগরিকদের সামনে বহুমাত্রিক তথ্য এবং বিভিন্ন ধরনের মতামত উন্মুক্ত করার সুযোগও মারাত্মকভাবে সীমিত হয়ে যায়। একটি ন্যায়ভিত্তিক, সুশৃঙ্খল ও গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণের স্বার্থে তাই স্বাধীন গণমাধ্যম, দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা এবং সচেতন নাগরিক সমাজ—এই তিন পক্ষের মধ্যে নিবিড় সমন্বয় অত্যন্ত জরুরি।
পরিশেষে বলা যায়, বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে অপপ্রচারের বিরুদ্ধে তীব্র সচেতন প্রতিরোধ গড়ে তোলা, স্বাধীন সাংবাদিকতার পূর্ণ সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং তথ্য যাচাইয়ের প্রক্রিয়াকে প্রতিটি নাগরিকের দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত করা সময়ের দাবি। রাষ্ট্রকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় সর্বাত্মক আন্তরিক হতে হবে, সংবাদমাধ্যমকে পেশাদার সততা বজায় রাখতে হবে এবং নাগরিককে তথ্য গ্রহণে দায়িত্বশীল হতে হবে।
সূত্র: আজকের পত্রিকা
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর