নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির কাছে ওমানের মুসান্দাম উপকূলে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে আকস্মিক হামলার ঘটনা ঘটে এবং এতে জলযানটিতে আগুন ধরে যায়। এই বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে ওই জলযানটিতে থাকা মোট পঁচিশ জন নাবিককে সফলভাবে নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরিয়ে এনেছে ওমানের সশস্ত্র নৌবাহিনী। গত শুক্রবার ওমানভিত্তিক মেরিটাইম সিকিউরিটি সেন্টারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই উদ্ধারের খবরটি নিশ্চিত করা হয়েছে।
দুর্ঘটনার শিকার হওয়া ওই বাণিজ্যিক জলযানটি পানামার জাতীয় পতাকা বহন করছিল এবং এটি মুসান্দাম উপকূলের নির্দিষ্ট সীমা থেকে এক দশমিক ছয় নটিক্যাল মাইল দূরবর্তী স্থানে আক্রমণের মুখে পড়ে। এই সশস্ত্র আঘাতের ফলেই মূলত জাহাজটির ভেতরে আগুন জ্বলে ওঠে এবং মারাত্মক ঝুঁকির সৃষ্টি হয়।
মেরিটাইম সিকিউরিটি সেন্টারের পক্ষ থেকে জানানো হয় যে, তাদের নিজস্ব তত্ত্বাবধান ও সরাসরি সহযোগিতায় ওমানের নৌবাহিনীর সদস্যরা দ্রুত অভিযান চালিয়ে নাবিকদের অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করেন। পরবর্তীতে জলযান থেকে উদ্ধারকৃত এসব নাবিককে তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হয় যেন তারা সুস্থ হয়ে উঠতে পারেন।
একই সময় সংবেদনশীল হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করার চেষ্টা করা অপর তিনটি তেলবাহী জলযানকে আটক করার জোর দাবি তুলেছে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি। তেহরানের পক্ষ থেকে সাফ জানানো হয়েছে যে আটককৃত জলযানগুলো নির্ধারিত অনুমোদিত পথ বাদ দিয়ে অবৈধ বা নিয়মবহির্ভূত রুট ব্যবহার করে চলাচল করছিল।
উল্লেখ্য যে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শুরু হয় মূলত ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক হামলার মধ্য দিয়ে। এই সংঘাতের সূচনা হওয়ার পর থেকেই কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে জলযান চলাচলের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে চলেছে তেহরান। বর্তমান যুদ্ধের সূচনা হওয়ার আগে এই নির্দিষ্ট সামুদ্রিক পথ দিয়েই গোটা বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ নিয়মিতভাবে পরিবাহিত হতো।
আইআরজিসির পক্ষ থেকে প্রকাশিত সুনির্দিষ্ট বিবৃতিতে বলা হয় যে, আটককৃত তেলবাহী জলযানগুলো নিজেদের গোপনীয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থা এবং সুনির্দিষ্ট অবস্থান নির্ণয় করার প্রযুক্তি সম্পূর্ণ বন্ধ করে রেখেছিল। মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্রত্যক্ষ সহায়তায় তারা পূর্বনির্ধারিত অনুমোদনহীন জলপথ ব্যবহার করে কোনো ধরনের নিয়ম না মেনে প্রণালিটি পাড়ি দেওয়ার বেপরোয়া চেষ্টা চালাচ্ছিল। একাধিকবার বেতারযন্ত্রের মাধ্যমে জরুরি বার্তা পাঠিয়ে তাদের বারবার সতর্ক করা সত্ত্বেও জলযানগুলোর চালকেরা সেই নির্দেশ পুরোপুরি উপেক্ষা করেন।
হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে যেকোনো ধরনের জলযানের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার স্বার্থে ইরান সরকার এখন নিজস্ব উদ্যোগে একটি সুনির্দিষ্ট ও নির্দিষ্ট রুট নির্ধারণ করে দিয়েছে। দেশটির প্রতিরক্ষা বাহিনীর সঙ্গে নিবিড় সমন্বয় সাধন করেই কেবল ওই নির্দিষ্ট নির্ধারিত সমুদ্রপথ ব্যবহার করে চলাচল করতে হবে বলে কঠোর বার্তা দিয়েছে তেহরান। বিশেষ করে ওমান উপকূলের কাছাকাছি অবস্থিত দক্ষিণাঞ্চলীয় একটি নির্দিষ্ট জলপথকে ইরান কর্তৃপক্ষ বর্তমানে সম্পূর্ণ অনুমোদনহীন বলে গণ্য করছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক বাণিজ্য পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ইউকেএমটিও গতকাল এক প্রতিবেদনে প্রকাশ করেছে যে ইরানের লাভান দ্বীপের দক্ষিণাংশে অবস্থিত প্রায় চল্লিশ নটিক্যাল মাইল দূরে সম্পূর্ণ আলাদা আরেকটি জলযানে মারাত্মক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটেছে। এই ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ওই জলযানটিতেও ভয়াবহ আগুন ধরে যায়, তবে স্বস্তির বিষয় হলো আক্রান্ত জাহাজটির সব নাবিক শেষ পর্যন্ত নিরাপদে রয়েছেন।
ইরানে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী হামলা চালানোর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে এই সর্বাত্মক যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটায়। এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জলযান চলাচলের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও বিধিনিষেধ আরোপ অব্যাহত রেখেছে ইরান প্রশাসন। এর আগে বিশ্বব্যাপী মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই গুরুত্বপূর্ণ প্রণালির মাধ্যমে এক দেশ থেকে অন্য দেশে নেওয়া হতো। এদিকে ইরানের এসব আক্রমণাত্মক ও নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপের কড়া জবাব দিতে দেশটির বিভিন্ন প্রধান সমুদ্রবন্দরের ওপর কঠোর পাল্টা অবরোধ আরোপ করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এই নতুন নিষেধাজ্ঞার ফলে ইরানের আন্তর্জাতিক তেল রপ্তানি কার্যক্রম এবং সামগ্রিক বৈদেশিক বাণিজ্য আরও বেশি সীমিত হয়ে পড়েছে।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর