ঢাকা | বঙ্গাব্দ

জাহিলি যুগের চার অদ্ভুত ও কলঙ্কিত বিয়ের প্রথা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Nov 1, 2026 ইং
জাহিলি যুগের চার অদ্ভুত ও কলঙ্কিত বিয়ের প্রথা ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

ইতিহাসের এক অন্ধকার ও কলঙ্কিত অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রয়েছে জাহিলি যুগ, যে সময়ে সমাজে নারী জাতির কোনো ধরনের সম্মান বা মর্যাদা অবশিষ্ট ছিল না। সেই নিষ্ঠুর সমাজে নারীদেরকে কেবল পুরুষের ভোগের বস্তু হিসেবে বিবেচনা করা হতো এবং তাঁদের ওপর নিয়মিত নির্যাতন ও নিপীড়ন চালানো হতো। এমনকি সে যুগে কন্যাসন্তান জন্ম নিলে তাদের জীবন্ত মাটিতে পুঁতে ফেলার মতো নৃশংস প্রথাও চালু ছিল।

যেসব কন্যাসন্তান বেঁচে বড় হয়ে ওঠার সুযোগ পেত, বিয়ের বয়স হলে তাদের কোনো ধরনের সামাজিক বা ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই সরাসরি পুরুষদের অধীনে সমর্পণ করা হতো। তৎকালীন পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় নারীরা তাঁদের ন্যূনতম মৌলিক অধিকার পাওয়ার কথা চিন্তাও করতে পারতেন না।

পুরুষদের কৃপা বা অনুগ্রহের ওপর নির্ভর করে যতটুকু তারা পেত, সেটাই নারীদের জন্য ছিল জীবনের মহাপ্রাপ্তি। এছাড়া পরিবারের উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পত্তিতে অধিকারের দাবি তো দূরে থাক, সেদিকে চোখ তুলে তাকানোও তখন গুরুতর অন্যায় বলে গণ্য করা হতো।

বিয়ের নানা রীতির আড়ালে জাহিলি যুগে নারী ও পুরুষেরা কীভাবে চরম নির্যাতনের শিকার হতেন, তার একটি বাস্তবসম্মত ও প্রামাণ্য চিত্র হাদিসের বিবরণে পাওয়া যায়। দীর্ঘ সেই হাদিস বর্ণনায় প্রাক-ইসলামি যুগের বিভিন্ন বিবাহপদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

ইসলামপূর্ব সেই অন্ধকার যুগে সমাজে প্রধানত চার ভিন্ন প্রথার বিয়ের প্রচলন ছিল বলে উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেছেন।

প্রথম প্রথার বিয়েটি বর্তমান যুগের আধুনিক বিয়ের ব্যবস্থার সঙ্গেই অনেকটা সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। এই নিয়মে বিয়ের আগ্রহী কোনো পুরুষ কোনো নারীর পুরুষ অভিভাবকের কাছে উপস্থিত হয়ে বিয়ের প্রস্তাব পেশ করতেন। এরপর উভয় পক্ষের পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে মোহরানা নির্ধারিত হতো এবং তারপর তাকে আইনসম্মতভাবে বিয়ে করা হতো।

দ্বিতীয় প্রকারের বিয়ের ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি তার স্ত্রীকে বিশেষ নির্দেশ দিয়ে বলত, তুমি মাসিক ঋতুস্রাব থেকে পবিত্র হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অমুক ব্যক্তির কাছে গমন করো এবং তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে মিলিত হও। এই নির্দেশ দেওয়ার পর সেই স্বামী তার স্ত্রীর কাছ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে দূরে অবস্থান করতেন।

ওই নারীর সঙ্গে অন্য পুরুষের মেলামেশার ফলে তিনি গর্ভধারণ না করা পর্যন্ত স্বামী তার কাছে ফিরে আসতেন না। যখন নারীর গর্ভধারণের বিষয়টি স্পষ্ট হতো, কেবল তখনই স্বামীর যদি ইচ্ছা হতো, তবে তিনি স্ত্রীর সঙ্গে একত্রে বসবাস শুরু করতেন।

এ ধরনের অদ্ভুত নিয়ম প্রবর্তনের পেছনে মূল উদ্দেশ্য ছিল একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী বা উন্নত জাতের সন্তান লাভ করা। জাহিলি সমাজের মানুষের ভাষায় এই নির্দিষ্ট প্রথার বিয়েকে ‘নিকাহ আল–ইস্তিবদা’ নামে অভিহিত করা হতো।

তৃতীয় প্রথার নিয়মে অনধিক প্রায় ১০ জন পুরুষ পালাক্রমে পর্যায়ক্রমে একজন নির্দিষ্ট নারীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে মিলিত হতেন। এরপর সেই নারী গর্ভধারণ করতেন এবং একসময় সন্তানের জন্ম দিতেন।

সন্তান প্রসবের পর কিছু দিন অতিবাহিত হলে সেই নারী অতীতে তাঁর কাছে আসা সেই পুরুষদের সবাইকে নিজের কাছে উপস্থিত হওয়ার জন্য বার্তা বা পত্র প্রেরণ করতেন। ওই নারšী কর্তৃক প্রেরিত পত্র পাওয়ার পর সেই পুরুষেরা সবাই তাঁর কাছে আসতে বাধ্য ছিলেন।

সব পুরুষ উপস্থিত হওয়ার পর সেই নারী তাঁদের উদ্দেশ্যে বলতেন, ‘তোমরা প্রত্যেকেই তোমাদের নিজ নিজ কর্ম সম্পর্কে খুব ভালোভাবেই অবগত আছো, যার ফলস্বরূপ আমি এই সন্তানের জন্ম দিয়েছি।’

এরপর সেই নারী উপস্থিত পুরুষদের মধ্য থেকে নিজের পছন্দমতো যেকোনো একজনের নাম ধরে বিশেষভাবে সম্বোধন করে বলতেন, ‘হে অমুক ব্যক্তি, এই সন্তানটি একান্তভাবেই তোমার।’

নারীর এমন ঘোষণার পর সেই পুরুষ শিশুটিকে নিজের সন্তান হিসেবে গ্রহণ করতে আইনি ও সামাজিকভাবে বাধ্য থাকতেন এবং সেই নারীও ওই পুরুষের স্ত্রীরূপে গণ্য হতেন।

চতুর্থ এবং শেষ প্রথায় বহু লোক একসঙ্গে একত্রিত হয়ে পালাক্রমে একজন নির্দিষ্ট নারীর নিকট গমন করত। সে সময় শয্যাসঙ্গী হওয়ার উদ্দেশ্যে যে বা যারা আসত, সেই নারী তাদের কাউকেই কখনো বারণ করতেন না।

সে যুগে এই শ্রেণির নারীদের পরিচিতি ছিল ‘বারবণিতা’ নামে। এরা সমাজের সবার কাছে নিজেদের অপকর্মের দৃশ্যমান নিদর্শনস্বরূপ তাদের ঘরের দরজায় একটি নির্দিষ্ট নিশান বা পতাকা ঝুলিয়ে রাখত।

যে কেউ চাইলে তাদের নিকট গমন করতে পারত এবং তাদের শয্যাসঙ্গী হওয়ার সুযোগ পেত।

এই প্রক্রিয়ায় যদি সেই নারী গর্ভধারণ করতেন এবং সন্তান প্রসব করতেন, তবে সন্তান জন্মদানের পর তিনি তার সঙ্গ গ্রহণকারী সব পুরুষকে নিজের কাছে উপস্থিত করতেন। এরপর তিনি তাঁদের মধ্য থেকে একজন ‘কাফাহ’ ডাকতেন।

‘কাফাহ’ বলতে এমন বিশেষ ব্যক্তিদের বোঝানো হতো, যারা নবজাতকের মুখাবয়ব বা শরীরের নানা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দেখে নিখুঁতভাবে বলতে পারত যে শিশুটি কার ঔরসজাত সন্তান।

সেই বিশারদ বা কাফাহ যার সঙ্গে নবজাতকের শারীরিক সাদৃশ্য খুঁজে পেত, নারী সন্তানটিকে সেই নির্দিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গেই সম্পর্কিত করতেন। এরপর সেই শিশুকে ওই ব্যক্তির সন্তান হিসেবেই সমাজে ডাকা হতো এবং অভিযুক্ত লোক কোনোভাবেই তা অস্বীকার করতে পারত না।

পরবর্তীতে মহান আল্লাহ তাআলা শেষ নবী হজরত মুহাম্মাদ (সা.)-কে মানবজাতির পথপ্রদর্শক হিসেবে রাসুল হিসেবে প্রেরণ করেন। তিনি পৃথিবীতে এসে জাহিলি যুগে প্রচলিত সমাজের এই সব কলুষিত ও অমানবিক বিবাহপ্রথা চিরতরে বাতিল ঘোষণা করেন।

এর পরিবর্তে রাসুলুল্লাহ (সা.) বর্তমানে ইসলামের সঠিক ও বিধিবদ্ধ যে পবিত্র বিবাহরীতি চালু রয়েছে, কেবল সেটিই সমাজে বহাল রাখেন। সুনানে আবু দাউদ গ্রন্থের ২২৭২ নম্বর হাদিসে এই পুরো ঘটনার বিশদ বিবরণ রয়েছে।

পবিত্র ইসলাম ধর্ম পৃথিবীতে আসার পরই কেবল নারী জাতি তাদের দীর্ঘ হারানো সামগ্রিক অধিকার ফিরে পাওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করে।

পরিবার ও সমাজে একজন মা, বোন এবং স্ত্রী হিসেবে নারীরা লাভ করে সম্মান ও মর্যাদার এক অনন্য ও সুউচ্চ আসন।

পাশাপাশি বিয়েতে নিজেদের স্বাধীন মতামত স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। একই সঙ্গে স্বামী ব্যতীত অন্য কোনো লোলুপ পুরুষের হিংস্র থাবার আক্রমণ থেকে সুরক্ষিত থাকার পূর্ণ নিরাপত্তা এবং সন্তান জন্মদানের পর তাদের যথাযথ মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত হয়।

সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
অনূর্ধ্ব-১৯ দলে সুযোগ না পাওয়ার আক্ষেপ ঘুচে প্রথম শ্রেণির অভ

অনূর্ধ্ব-১৯ দলে সুযোগ না পাওয়ার আক্ষেপ ঘুচে প্রথম শ্রেণির অভ