নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
বিকেলে কিংবা গোধূলি লগ্নে পথ চলার সময় বাতাসে হালকা শীতের পরশ থাকে, আর তখনই হঠাৎ নাকে ভেসে আসে এক ভারী ও সুমিষ্ট সুবাস। পথচারী যখন ওপরের দিকে দৃষ্টি ফেরান, তখন বিশাল আকৃতির একটি গাছ চোখে পড়ে, যেটির শাখাগুলোর প্রতিটি জোড়ায় পাতাগুলো ছাতার শিকের মতো চারদিকে মেলে থাকে। এই উদ্ভিদটি পরিচিত ছাতিম নামে, এবং এর অপর নাম সপ্তপর্ণী, যাকে গবেষকরা Alstonia scholaris হিসেবে অভিহিত করে থাকেন। বেশ দীর্ঘাকৃতির এই উদ্ভিদের শাখা বা পাতা ভাঙলে সাদা রঙের আঠালো রস বা কষ নির্গত হয়। একটি মাত্র গিঁটে সাধারণত সাতটি পাতা অবস্থান করায় এর নামকরণ হয়েছে সপ্তপর্ণী, তবে এর পুষ্পগুলো বেশ সাদামাটা, ক্ষুদ্রাকৃতির এবং এগুলোর বর্ণ হালকা সবুজাভ-সাদা হয়ে থাকে।
এই সুবাস নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন অনুভূতির প্রকাশ দেখা যায়, যেখানে কারও কাছে এটি মাদকতা ছড়ানো মনে হলেও অনেকের আবার এটি মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তা সত্ত্বেও এই সুবাস যে কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়ার মতো নয়, সে বিষয়ে প্রায় সকলে একমত পোষণ করেন। প্রশ্ন জাগে যে, এত ক্ষুদ্র একটি ফুল থেকে কীভাবে এত তীব্র সুবাস চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এই সুবাসের সৃষ্টি মূলত পুষ্পের পাপড়ি থেকে। পুষ্পের পাপড়ির উপরিভাগের স্তরের কোষগুলোর ভেতরে উদ্ভিদ বিশেষ কিছু রাসায়নিক উপাদান প্রস্তুত করে। এগুলি এত হালকা প্রকৃতির হয় যে খুব সহজেই বাষ্পীভূত হয়ে বায়ুমণ্ডলে মিশে যেতে পারে। বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় এগুলোকে উদ্বায়ী যৌগ বলা হয়ে থাকে। ঘ্রাণেন্দ্রিয়ে আমরা যে সুবাস অনুভব করি, তা মূলত বাতাসে ভাসমান এই বাষ্পের কণিকামাত্র।
পুষ্পের সুবাসে সাধারণত কয়েকটি গোত্রের উপাদান বিদ্যমান থাকে, যার একটি হলো টারপিনয়েড এবং এর মধ্যে লিনালুল অন্যতম, যা লেবুফুল ও ল্যাভেন্ডারের সুবাসেও পাওয়া যায়। অন্য আরেকটি গোত্র হলো বেনজেনয়েড, যা উদ্ভিদ তৈরি করে ফিনাইলঅ্যালানিন নামক অ্যামিনো অ্যাসিডের মাধ্যমে। ছাতিমের পুষ্পেও এই ধরনের উপাদানের উপস্থিতি পাওয়ার বিষয়টি কিছু গবেষণায় উঠে এসেছে। তবে সংগৃহীত নমুনাটি যে অঞ্চলের বা যেভাবে তা পরিমাপ করা হয়েছে, তার ওপর নির্ভর করে গবেষণার ফলাফল পরিবর্তিত হতে পারে। তাই নির্দিষ্টভাবে একক কোনো উপাদান ছাতিমের সুবাস তৈরি করে—এমন কথা জোর দিয়ে বলা যায় না। বরং বহুসংখ্যক যৌগের নির্দিষ্ট অনুপাতের মিশ্রণেই এর প্রকৃত সুবাসের সৃষ্টি হয়। বিষয়টি রান্নার মশলার মতো সাদৃশ্যপূর্ণ, যেখানে মশলা একই থাকলেও পরিমাপের তারতম্য ঘটলে যেমন স্বাদের পরিবর্তন ঘটে, সুবাসের ক্ষেত্রেও বিষয়টি ঠিক তেমনিভাবে কাজ করে।
দিন গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলেই ছাতিমের সুবাস তীব্রতর হয়, এই অভিজ্ঞতা আমাদের অনেকেরই রয়েছে। এর নেপথ্যে একক কোনো কারণ নেই। মানব প্রজাতির ন্যায় উদ্ভিদেরও নিজস্ব একটি অভ্যন্তরীণ জৈব ঘড়ি রয়েছে, যাকে সার্কাডিয়ান ছন্দ নামে অভিহিত করা হয়। এই ছন্দের প্রভাবেই অসংখ্য পুষ্প দিবসের নির্দিষ্ট সময়ে অধিক পরিমাণে সুবাস বিকিরণ করে। যেসব পুষ্পের পরাগায়নের জন্য নিশাচর পতঙ্গের প্রয়োজন হয়, তারা রাতেই বেশি সুবাস ছড়ায়। ছাতিমের ক্ষেত্রেও এই একই প্রক্রিয়া কাজ করে বলে বিজ্ঞানীদের ধারণা, যদিও এ বিষয়ে শতভাগ নিশ্চিত প্রমাণের কিছুটা ঘাটতি রয়েছে।
তবে এই ঘটনার পেছনে আবহাওয়া পরিস্থিতিরও একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। দিবসের বেলায় পরিবেশের উষ্ণ বাতাস ওপরের দিকে ধাবিত হয় এবং পুষ্পের সুবাসকেও নিজের সঙ্গে ওপরে বয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু গোধূলি লগ্নে বায়ু শীতল ও স্থির হয়ে পড়ে, এবং আর্দ্রতা বৃদ্ধি পায়। সুবাসের কণিকাসমূহ তখন ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি স্তরে ঘনীভূত অবস্থায় অবস্থান করে। ছাতিম পুষ্প ফোটার মৌসুম হলো অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর মাস, ঠিক এই হিমশীতল আবহাওয়াটার মধ্যেই। তার ওপর নিশাচর সময়ে চারপাশের ধূলিকণা, ধোঁয়া এবং রান্নার সুবাস হ্রাস পায়। ফলস্বরূপ ছাতিমের সুমিষ্ট সুবাস আমাদের ঘ্রাণেন্দ্রিয়ে স্বতন্ত্রভাবে ধরা দেয়।
উদ্ভিদটি অবশ্য আমাদের মুগ্ধ করার উদ্দেশ্যে এই সুবাস বিকিরণ করে না। এক স্থানে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা উদ্ভিদকে তার পরাগরেণু অন্য উদ্ভিদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য পতঙ্গের ওপর নির্ভর করতে হয়। ছাতিমের পুষ্পগুলো থোকা বা গুচ্ছাকারে প্রস্ফুটিত হয়। উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের মতে, সেখানে মৌমাছি, মাছি এবং রাতের নানা কীটপতঙ্গ উড়ে আসে। পতঙ্গেরা এই সুবাসের আকর্ষণে ছুটে আসে, মধু পান করে এবং শরীরের সঙ্গে পরাগরেণু জড়িয়ে নিয়ে পরবর্তী পুষ্পে উড়ে যায়। পরাগায়ন প্রক্রিয়া সমাপ্ত হলেই পুষ্পগুলো ঝরে পড়ে। তখন শাখাগুলোতে সরু ও দীর্ঘ জোড়া ফল ঝুলতে দেখা যায়, যার অভ্যন্তরে বীজ থাকে। ছাতিমের এই সুবাস মূলত কীটপতঙ্গদের উদ্দেশে উদ্ভিদের এক নীরব আহ্বান, আর আমরা মানবজাতি কেবল তার অনাহূত শ্রোতা মাত্র।
তাহলে ছাতিমের সুবাসে আমাদের মন কেন এত আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে? মানুষের ঘ্রাণেন্দ্রিয়ে প্রায় চার শ প্রকারের ঘ্রাণ-গ্রাহক কোষ রয়েছে। একটি সুনির্দিষ্ট যৌগ যেমন একাধিক গ্রাহকে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে, তেমনই একটি গ্রাহকও একাধিক যৌগে প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। ছাতিমের বহুসংখ্যক যৌগ একত্রে ঘ্রাণেন্দ্রিয়ে প্রবেশ করলে গ্রাহকগুলোর সংকেতের মাধ্যমে মস্তিষ্কে একটি নির্দিষ্ট বিন্যাস তৈরি হয়। মস্তিষ্ক সেই বিন্যাস অনুধাবন করেই চিনে নেয় যে এটি ছাতিমের সুবাস। এরপর যা ঘটে তা প্রকৃতপক্ষেই বৈজ্ঞানিক বিস্ময়। সুবাসের এই সংকেত ঘ্রাণ-বাল্বের মাধ্যমে সরাসরি মস্তিষ্কের অ্যামিগডালা ও হিপোক্যাম্পাসে গিয়ে উপনীত হয়। মস্তিষ্কের এই দুটি অংশ মানুষের আবেগ ও স্মৃতি সংরক্ষণ পরিচালনা করে। দর্শন বা শ্রবণের সংকেত মস্তিষ্কে পৌঁছানোর পথ এতটা সংক্ষিপ্ত নয়। ঠিক এই কারণেই পরিচিত কোনো সুবাস হঠাৎ করেই আমাদের শৈশবের বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ, পূজার অবকাশ বা প্রিয় কোনো মানুষের মুখাবয়ব স্মরণ করিয়ে দেয়। অনেকের কাছেই ছাতিম অর্থ শীতকাল আগমনের ঠিক আগের মুহূর্তের স্মৃতি। সুবাস নাকে আসতেই অতীতের সেই দিনগুলো চোখের সামনে মূর্ত হয়ে ওঠে।
শিক্ষালয়ের সঙ্গে এই উদ্ভিদের একটি সুপ্রাচীন সম্পর্কও বিদ্যমান। ছাতিমের হালকা কাঠ দিয়ে অতীতে শিক্ষার্থীদের লেখার স্লেট বা ব্ল্যাকবোর্ড তৈরি করা হতো। যে কারণে ইংরেজি ভাষায় একে ব্ল্যাকবোর্ড ট্রি বলা হয়ে থাকে। আর এর প্রজাতির বৈজ্ঞানিক নামের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছে scholaris শব্দটি। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শান্তিনিকেতনের ছাতিমতলাও অত্যন্ত সমাদৃত। সেখানে উপবেশন করে ধ্যান করতেন মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, এবং শান্তিনিকেতন আশ্রমের যাত্রা সেখান থেকেই শুরু হয়েছিল।
কিন্তু সকলের নিকট তো আর এই সুবাস প্রীতিকর ঠেকে না। কারও কারও ক্ষেত্রে তীব্র মাথা ব্যথার উপসর্গ দেখা দেয়। উদ্ভিদের একেবারে সান্নিধ্যে বা আবদ্ধ স্থানে সুবাসের কণিকাসমূহ অত্যন্ত ঘন অবস্থায় থাকে। ঘ্রাণশক্তির একটি অদ্ভুত নিয়ম রয়েছে—একই যৌগ বাতাসে কম ঘনত্বে থাকলে তা মনোরম মনে হয়, আর অধিক ঘনত্বে থাকলে ভারী ও বিরক্তিকর ঠেকে। রজনীগন্ধা কিংবা জুঁই পুষ্পের ক্ষেত্রেও এই নিয়ম প্রযোজ্য। এর সঙ্গে আবার সম্পৃক্ত রয়েছে ঘ্রাণ-গ্রাহকের জিনের সামান্য ভিন্নতা, যে কারণে একই সুবাস এক ব্যক্তির নিকট মনোহর সুবাস মনে হলেও অন্য ব্যক্তির নিকট তা অতিরিক্ত বা অসহ্য মনে হতে পারে। আর তার সঙ্গে যুক্ত হয় মানুষের ব্যক্তিগত স্মৃতি। ছাতিমতলায় কারও শৈশবের সুখস্মৃতি জড়িত থাকলে সেই সুবাস তার নিকট প্রীতিকর বলে মনে হবেই। পক্ষান্তরে অসুস্থতা বা মানসিক যন্ত্রণার কোনো সময়ের সঙ্গে সুবাসটি সম্পৃক্ত থাকলে বিপরীত অভিজ্ঞতাও হতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, ছাতিমের মনমাতানো সুবাসের নেপথ্যে নির্দিষ্ট কোনো একটি মাত্র কারণ বিদ্যমান নয়। পুষ্পের পাপড়ির বৈচিত্র্যময় যৌগের মিশ্রণ, উদ্ভিদের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ জৈব ঘড়ি, গোধূলি লগ্নের স্থির শীতল বায়ু, পতঙ্গের পরাগায়নের আবশ্যকতা এবং সর্বোপরি আমাদের ঘ্রাণেন্দ্রিয় ও মস্তিষ্কের বিস্ময়কর সংযোগ—সকলের এক অনবদ্য সমন্বয়েই প্রস্ফুটিত হয় চমৎকার এই অনুভূতি।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর