নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
যশোরের ঝিকরগাছা থেকে দুই মাস সাতাশ দিন বয়সি নবজাতক আয়মান সাদিককে নিয়ে রাজধানী ঢাকায় পাড়ি জমিয়েছেন তার মা সানজিদা খাতুন। শিশুটির শরীরে তীব্র শ্বাসকষ্ট ও নিউমোনিয়ার উপসর্গ দেখা দিলে এলাকার একটি বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে তাকে দীর্ঘ ষোলো দিন ফেলে রাখা হয়, কিন্তু শারীরিক অবস্থার কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। উল্টো হামের সংক্রমণের পর নিউমোনিয়ার মারাত্মক জটিলতা আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। উপায়ান্তর না পেয়ে জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা আয়মানকে শেষ পর্যন্ত ঢাকার বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। এখানে চিকিৎসাসেবা পাওয়ার পর কিছুটা উন্নতি হলেও ছোট্ট শিশুটির কাশি এবং শ্বাসপ্রশ্বাসের কষ্ট এখনও সম্পূর্ণ দূর হয়নি।
শুধু এই একটি পরিবার নয়, নোয়াখালীর দূরবর্তী জনপদ থেকেও ঠিক একই রকম করুণ চিত্র নিয়ে ঢাকায় ছুটে আসছেন অসহায় মায়েরা। দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার জাহাজমারা এলাকা থেকে দুবছরের কন্যাসন্তান হামিদাকে কোলে করে রাজধানীতে পৌঁছেছেন মা নুরজাহান বেগম। তিনি জানান, একটানা পনেরো থেকে কুড়ি দিন ধরে তাঁর মেয়ের গায়ে জ্বর ও ফুসকুড়ি বজায় ছিল, পরবর্তীতে রক্ত পরীক্ষা করা হলে তাতে ম্যালেরিয়ার জীবাণুও পাওয়া যায়। তবে যখন ছোট্ট শিশুটির তীব্র শ্বাসকষ্ট শুরু হয়, তখন আর কালক্ষেপণ না করে তাকে দ্রুত ঢাকায় নিয়ে আসেন তিনি। নুরজাহানের বড় অভিযোগ, এমন চরম সংকটাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালে পৌঁছানোর পরও শুরুতে যথাসময়ে কাঙ্ক্ষিত অক্সিজেন সেবা পেতে তাদের যথেষ্ট ভোগান্তির শিকার হতে হয়েছে। একই জেলার কোম্পানীগঞ্জ থেকে চিকিৎসার্থে নিয়ে আসা সাত মাস বয়সি শিশু রাইজানের ক্ষেত্রেও প্রথমে নিউমোনিয়া এবং পরে হাম ধরা পড়ে; একটানা সাত দিন আইসিইউতে রাখার পরও তার শ্বাসকষ্টের সমস্যা পুরোপুরি নিরাময় হয়নি।
দেশের বিভিন্ন প্রান্ত ও প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে এ ধরনের জটিল ও সংকটাপন্ন শারীরিক অবস্থায় হামে আক্রান্ত শিশুদের রাজধানীর একমাত্র বিশেষায়িত শিশু হাসপাতালে নিয়ে আসা হচ্ছে। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব ছোট রোগীদের ক্ষেত্রে প্রধানত দুটি বড় ধরনের সংকট মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। প্রথমত, কেন রোগটি এত মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছে গেল তার কারণ এবং দ্বিতীয়ত, হাসপাতালে এসে তারা ঠিক কী ধরনের চিকিৎসা সহযোগিতা লাভ করছে।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম জানান, মূল সমস্যাটি তৈরি হচ্ছে সঠিক সময়ে চিকিৎসা শুরু করতে ব্যর্থ হওয়ায়। গ্রামের বাড়ি বা প্রত্যন্ত অঞ্চলে হামের রোগ সঠিকভাবে নির্ণয় না করা এবং নিউমোনিয়ার মতো বিপজ্জনক লক্ষণ প্রকাশের পরেও তা চিকিৎসাবিহীন ফেলে রাখায় শারীরিক অবস্থা দ্রুত অবনতির দিকে মোড় নিচ্ছে। তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন যে, হামের সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতি হলো নিউমোনিয়া এবং এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে মারাত্মক অপুষ্টি। বর্তমানে চিকিৎসাধীন আসা শিশুদের প্রায় নব্বই শতাংশই কোনো না কোনোভাবে অপুষ্টির শিকার। এই চরম অপুষ্টির কারণে শিশুদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ করার স্বাভাবিক ক্ষমতা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ছে, যা তাদের জীবনকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
হাসপাতালের মেডিক্যাল অফিসার ডা. মার্জিয়া আফরোজের মতে, সদ্য জন্ম নেওয়া নবজাতক থেকে শুরু করে দুবছর বয়সি শিশুরা হামের সংক্রমণে সবকিছুর চেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকে। বিশেষ করে যেসব শিশু নির্ধারিত সময়ে নিয়মিত টিকা গ্রহণ করেনি, তাদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকির মাত্রা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। হামের সঙ্গে যদি ডায়রিয়া, বমি, খিঁচুনি কিংবা নিউমোনিয়ার মতো উপসর্গগুলো যুক্ত হয়, তবে সাধারণ অক্সিজেন দিয়ে সেই শ্বাসকষ্ট নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না। সে ক্ষেত্রে নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র তথা আইসিইউ এবং ক্ষেত্রবিশেষে ভেন্টিলেশন সাপোর্ট ছাড়া রোগী বাঁচিয়ে রাখা অত্যন্ত দুরূহ হয়ে দাঁড়ায়।
হাসপাতাল সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, হামে আক্রান্ত হয়ে এখন পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন হাজার শিশু এই প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করেছে। তাদের মধ্যে অন্তত সাতানব্বই থেকে আটানব্বইটি শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে হাসপাতালটিতে সব মিলিয়ে সাতানব্বইটি শিশু চিকিৎসাধীন অবস্থায় রয়েছে, যার মধ্যে কেবল সোমবারই নতুন করে ভর্তি হয়েছে আরও পঁচিশ জন শিশু।
আক্রান্ত শিশুদের একটি বড় অংশের জন্যই সার্বক্ষণিক অক্সিজেন সরবরাহ এবং আইসিইউ সেবার তীব্র প্রয়োজন দেখা দিচ্ছে। অথচ পুরো হাসপাতালটিতে মোট শয্যার সংখ্যা সাতশত হলেও আইসিইউ বেডের সংখ্যা মাত্র চৌদ্দটি। ফলস্বরূপ, জটিল রোগীদের জন্য আইসিইউ নিশ্চিত করা চিকিৎসকদের পক্ষে প্রায়শই অসম্ভব হয়ে পড়ছে। এর সঙ্গে আরও যুক্ত হয়েছে প্রয়োজনীয় সেবা প্রদানকারী জনবলের তীব্র ঘাটতি। ডা. মার্জিয়া আফরোজ এ প্রসঙ্গে বলেন, যেভাবে প্রতিনিয়ত জটিল রোগী ছুটে আসছে, সেই তুলনায় মাথাপিছু চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য কর্মীর সংখ্যা অত্যন্ত অপ্রতুল।
অবশ্য হাসপাতালটির পরিচালক অধ্যাপক মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম দাবি করেছেন যে, চিকিৎসক সংকট থাকা সত্ত্বেও তারা যথাসম্ভব সেবা কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। বর্তমানে এই হাসপাতালে প্রায় তিনশত চিকিৎসক কর্মরত আছেন এবং চিকিৎসাসেবা আরও বেগবান ও গতিশীল করার লক্ষ্যে আগামী মাসের মধ্যেই নতুন করে আরও পঞ্চাশ জন চিকিৎসক নিয়োগের পরিকল্পনা তাদের রয়েছে।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শ হলো, শিশুরা যাতে কোনোভাবেই এমন জটিল ও আশঙ্কাজনক পর্যায়ে উপনীত না হয়, সে জন্য নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিয়মিত টিকাদান নিশ্চিত করাই হলো একমাত্র কার্যকর উপায়। শিশুদের দেহে যদি জ্বর, সর্দি, কাশি কিংবা গায়ে ফুসকুড়ির মতো লক্ষণ দেখা দেয়, তবে সামান্য অবহেলাও না করে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। বিশেষ করে শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি, বারবার বমি কিংবা ডায়রিয়ার মতো কোনো বিপজ্জনক সংকেত প্রকাশ পাওয়া মাত্রই বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে শিশুকে দ্রুত বিশেষায়িত হাসপাতালে নিয়ে আসার ওপর জোর তাগিদ দিয়েছেন চিকিৎসকেরা।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর