ঢাকা | বঙ্গাব্দ

চট্টগ্রামের ভূগর্ভস্থ পানিতে ভারী ধাতুর দূষণ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 19, 2026 ইং
চট্টগ্রামের ভূগর্ভস্থ পানিতে ভারী ধাতুর দূষণ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

উত্তর পতেঙ্গার হাউজিং কলোনি রোডের একটি চারতলা বাড়িতে ছয়টি পরিবার বসবাস করলেও সেখানে ওয়ান্ডার পানি পৌঁছায় না। পানির প্রয়োজন মেটাতে ভবনের মালিক মোহাম্মদ সায়েম প্রায় ১২০ ফুট গভীর নলকূপ স্থাপন করেছেন। তবে সেই নলকূপের পানি খাওয়ার উপযোগী নয়। মোহাম্মদ সায়েমের ভাষ্য অনুযায়ী, নলকূপ থেকে ঘোলা ও লবণাক্ত পানি নিষ্কাশিত হয়, যার ফলে পান ও রান্নার প্রয়োজনে তাদের জারের পানি ক্রয় করতে হয় এবং এলাকায় পানির তীব্র সংকট বিরাজ করছে ও সবার পরিস্থিতি একই রকম।

শুধু উত্তর পতেঙ্গায় নয়, বরং উত্তর ও দক্ষিণ পতেঙ্গা এবং কাটগড়সহ বন্দরনগরীর ১০টি এলাকায় ভূগর্ভস্থ নলকূপের পানি নিয়ে ঠিক একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। কোথাও নলকূপের পানি লবণাক্ত, আবার কোথাও তা ঘোলা কিংবা লালচে রঙের। এই পরিস্থিতিতে বহু পরিবার বাধ্য হয়ে পান ও রান্নার কাজের জন্য জারের পানি কিনে ব্যবহার করছেন।

বাসিন্দাদের এই দৈনন্দিন কষ্টের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় চট্টগ্রাম অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানিতে বিভিন্ন বিপজ্জনক ধাতুর দূষণের ভয়ংকর চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। কিছু কিছু পানির নমুনায় আয়রন, ম্যাংগানিজ, ক্যাডমিয়াম, আর্সেনিক ও ক্রোমিয়ামের উপস্থিতি মানুষের খাবার পানির নির্ধারিত নিরাপদ মাত্রাকে ছাড়িয়ে গেছে। অগভীর নলকূপগুলোতে এই সমস্যা তুলনামূলকভাবে প্রকট হলেও গভীর নলকূপের পানিও সব ক্ষেত্রে নিরাপদ হিসেবে পাওয়া যায়নি।

এসংক্রান্ত সর্বশেষ গবেষণাটি চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সাময়িকী ক্লিনার ওয়াটার-এ প্রকাশিত হয়। চট্টগ্রাম, ফেনী, নোয়াখালী এবং লক্ষ্মীপুর জেলার ভূগর্ভস্থ পানি নিয়ে পরিচালিত ওই গবেষণায় দেখা গেছে যে চট্টগ্রাম ও লক্ষ্মীপুর জেলায় দূষণের মাত্রা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমজুড়ে চট্টগ্রাম অঞ্চলের পানির মানের ব্যাপক অবনতি লক্ষ্য করা গেছে।

চট্টগ্রাম ওয়াসা কর্তৃপক্ষের প্রায় ৫০টি গভীর নলকূপের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় চার কোটি লিটার পানি উত্তোলনের সক্ষমতা রয়েছে। পাশাপাশি ব্যক্তি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে অনুমোদিত গভীর নলকূপ রয়েছে আরও প্রায় ৪ হাজার ২০০টি। অন্যদিকে ওয়াসার নিজস্ব হিসাব অনুযায়ী, কোনো ধরনের অনুমোদন ছাড়াই স্থাপন করা গভীর নলকূপের সংখ্যা ৫০ হাজারের বেশি। অর্থাৎ ভূগর্ভস্থ নলকূপের পানিই এই মহানগরীর মানুষের পানির অন্যতম প্রধান উৎস।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক মাহমুদুল হাসানসহ মোট আটজন গবেষক ক্লিনার ওয়াটারে প্রকাশিত এই গবেষণাটি সম্পন্ন করেছেন। এই দলের গবেষকেরা চার জেলার মোট ১০১টি নলকূপ থেকে শুষ্ক এবং বর্ষা—এই দুই ঋতুতেই পানির নমুনা সংগ্রহ করেন। পরবর্তীতে সেই নমুনাগুলোতে অ্যালুমিনিয়াম, তামা, আয়রন, ম্যাংগানিজ, ক্রোমিয়াম এবং আর্সেনিকের উপস্থিতি ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা হয়।

সামগ্রিক পর্যালোচনায় দেখা গেছে যে বর্ষাকালের তুলনায় শুষ্ক মৌসুমে ভূগর্ভস্থ পানির মান অনেক বেশি খারাপ থাকে। সংগৃহীত কিছু কিছু নমুনায় আর্সেনিক ও ম্যাংগানিজের উপস্থিতি সহনীয় মাত্রার সীমাকে অতিক্রম করেছে। এমনকি আয়রনের ক্ষেত্রেও উভয় ঋতুতেই নির্ধারিত মাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা নথিবদ্ধ করা হয়েছে।

একাধিক ধাতুর উপস্থিতি একত্রে বিশ্লেষণ করে দূষণের মাত্রা হিসাব করার পর দেখা যায়, চট্টগ্রাম ও লক্ষ্মীপুরের সার্বিক অবস্থা তুলনামূলকভাবে বেশ খারাপ। তবে এর অর্থ এই নয় যে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের প্রতিটি নলকূপের পানিই দূষিত, কারণ গবেষণায় এমন সর্বগ্রাসী ফল পাওয়া যায়নি।

গবেষক মাহমুদুল হাসান সংবাদমাধ্যমকে জানান যে চট্টগ্রামের ভূতাত্ত্বিক গঠন প্রক্রিয়া বেশ জটিল। এর সঙ্গে অতিরিক্ত মাত্রায় ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন এবং অপরিকল্পিত শিল্পায়ন এখানকার পানির মান অবনতির পেছনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। শুষ্ক মৌসুমে পানির উত্তোলন বেড়ে গেলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর স্বাভাবিকের চেয়ে নিচে নেমে যায় এবং ভূগর্ভের ভেতরের রাসায়নিক বিক্রিয়াগুলোতেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটে। তাঁর মতে, আনোয়ারা, সন্দ্বীপ, সীতাকুণ্ড ও হাটহাজারীর নমুনাগুলোতে ম্যাংগানিজ, আর্সেনিক এবং ক্রোমিয়ামের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে বেশি পরিমাণে পাওয়া গেছে। এছাড়া চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এবং বোয়ালখালীর কয়েকটি নলকূপের পানিতেও এসব ধাতুর মাত্রা বেশি ছিল।

চট্টগ্রাম মহানগরীর পানির মানের আরও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায় ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক সাময়িকী হেলিয়নে প্রকাশিত অপর একটি গবেষণায়। সিটি করপোরেশনের আওতাধীন ৪১টি ওয়ার্ডের ১১৭টি নলকূপের পানির নমুনা সংগ্রহ করে তা পরীক্ষা করা হয়েছিল। সংগৃহীত নমুনার মধ্যে ৫৯টিতে অর্থাৎ প্রায় ৫০ শতাংশে আয়রন এবং ৭৪টিতে অর্থাৎ প্রায় ৬৩ শতাংশ নমুনায় ম্যাংগানিজের মাত্রা বাংলাদেশের খাবার পানির জন্য নির্ধারিত মাত্রার সীমাকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল।

কাট্টলী, পাহাড়তলী এবং বায়েজিদ বোস্তামী অঞ্চলে আয়রন ও ম্যাংগানিজের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা গেছে। অন্যদিকে বন্দর ও ডবলমুরিং এলাকার অগভীর স্তরের কিছু নির্দিষ্ট নমুনায় আর্সেনিক, ক্রোমিয়াম এবং ক্যাডমিয়ামের মাত্রা বেশি পাওয়া যায়। তবে পরীক্ষা করা ১১৭টি নমুনার মধ্যে মাত্র একটি নমুনায় আর্সেনিক তার নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করেছিল। সবচেয়ে বেশি মাত্রার আর্সেনিক পাওয়া গিয়েছিল উত্তর পতেঙ্গার মাঝারি গভীরতার একটি নির্দিষ্ট নলকূপের পানিতে। ওই গবেষণায় দেখা যায় যে ৭০টি অগভীর নলকূপের ৬৬ শতাংশ নমুনায় আয়রন এবং ৮১ শতাংশ নমুনায় ম্যাংগানিজ নির্ধারিত সীমার ওপরে অবস্থান করছিল। এমনকি ৩০০ ফুটের বেশি গভীর নলকূপের কিছু নমুনাতেও এই দুই ধাতুর মাত্রা সীমা অতিক্রম করার প্রমাণ মিলেছে।

চট্টগ্রামের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানির অবস্থা নিয়ে ২০২৫ সালে জার্নাল অব হ্যাজার্ডাস ম্যাটেরিয়ালস অ্যাডভান্সেস নামক সাময়িকীতে আরও একটি গবেষণা প্রকাশিত হয়। শিল্পাঞ্চলের ৩৪টি নলকূপের পানি পরীক্ষা করে গবেষকেরা আর্সেনিক, ক্রোমিয়াম, ক্যাডমিয়াম এবং সিসাকে মানুষের প্রধান উদ্বেগের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন। একাধিক ধাতুর সম্মিলিত দূষণ পরিমাপের নির্দিষ্ট সূচকে দেখা যায় যে ৫৩ শতাংশের বেশি নমুনা নির্ধারিত নিরাপদ সীমা অতিক্রম করেছে। শিল্পাঞ্চলের দক্ষিণ অংশজুড়ে এই দূষণের মাত্রা ছিল বেশ বেশি। গবেষকেরা শিল্পকারখানার বিভিন্ন কার্যক্রম এবং সেগুলোর বর্জ্য পদার্থকে এই দূষণের সম্ভাব্য অন্যতম কারণ হিসেবে আলোচনা করেছেন। তবে সুনির্দিষ্টভাবে কোনো নির্দিষ্ট কারখানার বর্জ্যের কারণে কোন নলকূপটি দূষিত হয়েছে, তা গবেষণায় সরাসরি প্রমাণ করা হয়নি।

পরিচালিত তিনটি গবেষণাতেই পানিতে উপস্থিত বিভিন্ন ধাতুর ক্ষতিকর প্রভাবের ওপর ভিত্তি করে সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসাব করা হয়েছে। সর্বশেষ প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে যে আর্সেনিক ও ম্যাংগানিজের কারণে জনস্বাস্থ্যের দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। বিশেষ করে প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় শিশুদের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেক বেশি বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।

চট্টগ্রামে ওয়াসার নিজস্ব নলকূপের পাশাপাশি ব্যক্তি উদ্যোগে, আবাসিক ভবনে, হাসপাতালে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এবং বিভিন্ন শিল্পকারখানায় বিপুলসংখ্যক নলকূপ ব্যবহৃত হচ্ছে। ওয়াসা কর্তৃপক্ষ নতুন করে আরও অন্তত ৮৭টি গভীর নলকূপ স্থাপনের পরিকল্পনাও হাতে নিয়েছে। গবেষক মাহমুদুল হাসান বলেন যে চট্টগ্রামে পাহাড়ি ও সামুদ্রিক—উভয় ধরনের ভূপ্রাকৃতিক অঞ্চলই বিদ্যমান রয়েছে। তাই সামগ্রিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা ছাড়া কেবল গভীর নলকূপ বসালেই যে নিরাপদ পানি নিশ্চিত করা যাবে, তা কোনোভাবেই বলা সম্ভব নয়।

চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান জানান যে নগরের অনেক এলাকার গভীর নলকূপের পানিতেও অতিরিক্ত পরিমাণে আয়রন পাওয়া যাচ্ছে। কিছু কিছু স্থানে ৮০০ থেকে ১ হাজার ২০০ ফুট গভীর নলকূপের পানিতেও উচ্চ মাত্রার আয়রন শনাক্ত হয়েছে। তাই কেবল নলকূপ গভীর হলেই সেই পানি নিরাপদ হবে এমন ধারণা পোষণ করা সম্পূর্ণ ভুল। পানির মধ্যে ঠিক কোন কোন উপাদান কী পরিমাণ মাত্রায় রয়েছে, তা সুনির্দিষ্টভাবে পরীক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।

চট্টগ্রামের সামগ্রিক প্রয়োজনের স্বার্থে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবস্থাপনার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেন গবেষক মাহমুদুল হাসান। তাঁর মতে, নির্দিষ্ট করে দেখতে হবে কোথায় ভূগর্ভস্থ পানি কী পরিমাণ পাওয়া যাচ্ছে এবং সেই পানির গুণগত মান কেমন—তার ভিত্তিতে সম্পূর্ণ এলাকাভিত্তিক একটি মানচিত্র বা ম্যাপ তৈরি করতে হবে। এরপর ওয়াসা ও সরকারের কঠোর তদারকি ও নজরদারির মাধ্যমে নতুন নলকূপ স্থাপনের সুব্যবস্থা নিশ্চিত করা উচিত।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
সিরাজগঞ্জে মোটরসাইকেলের ধাক্কায় বৃদ্ধ নিহ�

সিরাজগঞ্জে মোটরসাইকেলের ধাক্কায় বৃদ্ধ নিহ�