নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
কানাডার ভিজিট ভিসার ক্ষেত্রে ভুয়া কাগজ ও অসত্য তথ্যের ওপর ভিত্তি করে একটি বড় ধরনের প্রতারক চক্র পরিচালনার দায়ে পাঁচ ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ আনা হয়েছে। কানাডা বর্ডার সার্ভিসেস এজেন্সি বা সিবিএসএ গত ২২ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত এক আনুষ্ঠানিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই তথ্য গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছে।
কুইবেকের প্রভিন্সের প্ররভ্যালিফিল্ড আদালতে এই জালিয়াতি মামলার আওতায় অভিযুক্তদের মধ্য থেকে চারজনকে ইতোমধ্যে কাঠগড়ায় হাজির করা হয়েছে। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন মন্ট্রিয়ালের দুই স্থায়ী বাসিন্দা রাসেল মির্জা ও মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম এবং টরন্টো শহরের বাসিন্দা মো. মুদাসসার আলম ভূঁইয়া।
এই মামলার অপর অভিযুক্ত হলেন মো. রাকিবুল হাসান, যিনি এই মুহূর্তে নিজ দেশ বাংলাদেশে অবস্থান করছেন বলে তদন্তকারী কর্মকর্তাদের ধারণা। তার অনুপস্থিতির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আদালতের পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।
তদন্তকারী সংস্থা জানিয়েছে, এই অপরাধ চক্রের সঙ্গে উল্লিখিত ব্যক্তিরা ছাড়াও আরও একজন সহযোগী সরাসরি জড়িত রয়েছেন, যা তাদের নিবিড় অনুসন্ধানে পরিষ্কার হয়ে উঠেছে।
পুরো ঘটনার অনুসন্ধান শুরু হয়েছিল মূলত ২০২৪ সালের ৩ জুলাই তারিখে। ওই দিন কুইবেকের মেরসিয়ার শহরের একটি নির্দিষ্ট আবাসিক ঠিকানায় স্থানীয় পুলিশবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে একটি সমন্বিত পরিদর্শন ও নিয়ন্ত্রণ অভিযান পরিচালনা করেছিল সিবিএসএ।
সেই বাসভবনে বসবাসরত ব্যক্তিদের ইমিগ্রেশন সংক্রান্ত আইন ভঙ্গের বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট আলামত বা প্রমাণ হাতে পাওয়ার পর সিবিএসএ কর্তৃপক্ষ একই বছরের আগস্ট মাস থেকে ঘটনাটির পূর্ণাঙ্গ আনুষ্ঠানিক তদন্ত কাজ শুরু করে।
তদন্তে বেরিয়ে এসেছে যে, মোট ২০৯ জন বাংলাদেশি নাগরিকের ব্যক্তিগত পরিচয় ব্যবহার করে সর্বমোট ২৪৩টি টেম্পোরারি রেসিডেন্ট ভিসা বা সাধারণ ভিজিট ভিসার আবেদনপত্র জমা দেওয়া হয়েছিল।
সেসব আবেদনে কানাডার স্থানীয় নাগরিকদের জালিয়াতির মাধ্যমে ভুয়া হোস্ট বা আমন্ত্রণকারী হিসেবে উপস্থাপন করা হয় এবং মিথ্যা নথিপত্র ও তথ্য জুড়ে দিয়ে কানাডার ভিসা হাতিয়ে নেওয়ার অপচেষ্টা চালানো হয়।
তদন্ত কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে ২০২৫ সালের ৩ জুন কুইবেক ও অন্টারিও প্রদেশের মোট চারটি ভিন্ন স্থানে সার্চ ওয়ারেন্ট নিয়ে অভিযান চালান সিবিএসএ-এর জালিয়াতি দমন শাখার দক্ষ কর্মকর্তারা।
অভিযান চালানো স্থানগুলো থেকে প্রচুর পরিমাণে কম্পিউটার সেট, বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল ডিভাইস এবং কাগজপত্রের নথিপত্র জব্দ করা হয়।
জালিয়াতির ঘটনার পরিধি বেশ বিশাল হওয়ায় সিবিএসএ-এর তদন্তকারী দল বিশেষভাবে ৭৯টি ভিসা আবেদনপত্রকে সামনে রেখে সেগুলোর ওপর নিবিড় নজরদারি চালিয়ে মামলার পক্ষে শক্তিশালী ও অকাট্য প্রমাণাদি সংগ্রহ করতে সক্ষম হন।
কানাডার প্রচলিত ইমিগ্রেশন অ্যান্ড রিফিউজি প্রটেকশন অ্যাক্ট বা আইআরপিএ আইনের অত্যন্ত গুরুতর বেশ কয়েকটি ধারার অধীনে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে এই মামলাটি দায়ের করা হয়েছে।
অভিযোগের তালিকায় থাকা ১১৭(১) ও ১১৭(৩) ধারায় মূলত গভীর ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে সম্পূর্ণ অবৈধ উপায়ে কানাডার ভূখণ্ডে লোকজনের প্রবেশের ব্যবস্থা করার বিষয়টি যুক্ত রয়েছে।
এ ছাড়া ১২৬ এবং ১২৮ এর এ ধারার আওতায় ইমিগ্রেশন সংক্রান্ত যেকোনো আবেদনে জেনেশুনে ভুয়া তথ্য তৈরি করা এবং সত্য বিষয়গুলো সুকৌশলে গোপন করার ক্ষেত্রে সহযোগিতার অভিযোগ আনা হয়েছে।
আইনটির ১৩১ নম্বর ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, অভিযুক্তরা জেনেশুনে কানাডার প্রচলিত ইমিগ্রেশন আইন লঙ্ঘনের কাজে প্রত্যক্ষভাবে প্ররোচনা ও নানা ধরনের সহায়তা প্রদান করেছেন।
পুরো ঘটনার প্রেক্ষাপটে সিবিএসএ একটি অত্যন্ত স্পষ্ট ও কঠোর সতর্কবার্তা জারি করেছে যেখানে বলা হয়েছে যে, কানাডার ভিসার জন্য কোনো অবস্থাতেই জাল ব্যাংক স্টেটমেন্ট ব্যবহার করা যাবে না।
সংস্থাটি আরও সতর্ক করে জানিয়েছে যে, ভিসা আবেদনের জন্য ভুয়া আমন্ত্রণপত্র কিংবা কোনো ধরনের মিথ্যা তথ্য ব্যবহার করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
কোনো থার্ড পার্টি বা মধ্যস্বত্বভোগী এজেন্ট যদি আবেদনপত্র তৈরি বা প্রস্তুত করে থাকে, তবুও মিথ্যা তথ্য দেওয়ার অপরাধে মূল আবেদনকারীকে চরম খেসারত দিতে হতে পারে।
এ ধরনের অপরাধ প্রমাণিত হলে মূল আবেদনকারীর ওপর টানা পাঁচ বছরের স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা কিংবা মারাত্মক ইমিগ্রেশন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা আসতে পারে বলে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর