নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, মানুষের মধ্যে নিজেকে বড় করে দেখানোর তাগিদের পেছনে স্বীকৃতি পাওয়ার তীব্র বাসনা যেমন লুকিয়ে থাকে, তেমনি এর মূল কারণ হতে পারে নিজের ভেতরকার আত্মবিশ্বাসের অভাব। বিভিন্ন মানুষের ইতিবাচক মন্তব্য কিংবা প্রশংসা সাময়িক সময়ের জন্য মনের জোর বাড়াতে সক্ষম। তবে সার্বক্ষণিকভাবে অন্যের অনুমোদনের ওপর ভরসা করলে নিজের প্রকৃত আত্মমর্যাদাও অন্যান্যদের প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে মিশে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
অনেক সময় নিজেদের সফলতা কিংবা অভিজ্ঞতা প্রকাশ্যে আনলে তাদের হুট করেই আত্মকেন্দ্রিক বলা ঠিক হবে না। অনেকেই নিজের ভালো দিকগুলো তুলে ধরতে পছন্দ করেন কারণ তাদের মনে নিজস্ব যোগ্যতা নিয়ে অবচেতন সংশয় কাজ করে। যখন কর্মক্ষেত্রে কোনো কৃতিত্বের কথা জানানোর পর চারপাশ থেকে প্রশংসা আসে, তখন তারা নিজেদের অর্জন সম্পর্কে আগের চেয়ে বেশি নিশ্চিত হতে পারেন।
তবে এই মানসিক শান্তি সাধারণত ক্ষণস্থায়ী হয়ে থাকে। বারবার বাহবা পাওয়ার তাগিদ তৈরি হলে তারা নিজেদের সাফল্য ও জীবনযাপন সবার কাছে আকর্ষণীয় করতে অতিরিক্ত ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ফলে নিজের ভালো লাগার চেয়ে চারপাশের মানুষ কী ভাবছে সেটাই মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়।
ভার্চুয়াল দুনিয়ায় মানুষ সচরাচর তাদের জীবনের সেরা ও সুন্দর মুহূর্তগুলোই সামনে আনে। ঘোরার ছবি কিংবা নানা অর্জনের খবর খুব দ্রুত সবার নজর কাড়ে। অথচ ওইসব হাসিখুশি ছবির পেছনে লুকিয়ে থাকা ক্লান্তি বা হতাশার চিত্র অনেক সময়ই লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে যায়।
অনলাইন মাধ্যমগুলোতে অন্যের অসম্পূর্ণ জীবনের এই ঝলমলে রূপ দেখে অনেকে পুরো জীবন সম্পর্কে ভুল ধারণা পোষণ করেন। তখন মনে হতে পারে যে সবাই বেশ ভালো আছেন এবং শুধু নিজেদের জীবনেই নানা ঝামেলা রয়েছে। অথচ বাস্তব জীবনে সবার জন্যই কঠিন সময় ও দুশ্চিন্তা থাকে যা ভার্চুয়াল জগতে সবসময় প্রকাশ পায় না।
প্রতিক্রিয়া বা ফলোয়ারের সংখ্যা অনেকের কাছেই সামাজিক স্বীকৃতির মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ায়। বেশি লাইক পেতে অনেকে নিজেদের সাফল্য বাড়িয়ে জাহਿਰ করেন কিংবা বাস্তবতার চেয়ে বর্ণিল জীবন উপস্থাপন করেন। এভাবে নিজের ভেতরের মূল্যবোধ সম্পূর্ণরূপে বাইরের স্বীকৃতির ওপর নির্ভরশীল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা বাড়ে।
অনলাইনে অন্য মানুষের ভ্রমণের বা নতুন অভিজ্ঞতার ছবি দেখে মনে হতে পারে যে কোনো আনন্দ থেকে নিজেই বঞ্চিত হচ্ছেন। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এই অবস্থাকে ফোমো বলা হয়ে থাকে। অন্যেরা কোনো চমৎকার মুহূর্ত উপভোগ করছেন এবং সেখান থেকে নিজে বাদ পড়ছেন এমন আশঙ্কায় অস্বস্তি শুরু হয়।
গোষ্ঠীর অংশ হয়ে থাকার আদিম তাড়না থেকেই এই অনুভূতির জন্ম হয়। দল থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ভয়ে একসময় নিরাপত্তা কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকত। বর্তমান যুগে এসে এই ফোমোর পেছনে ভার্চুয়াল মাধ্যম এবং পারস্পরিক তুলনা বড় ভূমিকা রাখছে।
অন্যের সঙ্গে নিজের জীবন মেলাতে মেলাতে অনেকেই প্রতিযোগিতার দৌড়ে নেমে পড়েন। কে কোথায় ঘুরতে গেলেন বা কার জিনিস দামি তা দিয়ে নিজের অবস্থান প্রমাণের চেষ্টা চলে। তখন নিজেকে জাহির করার একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায় অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করা।
এই মানসিকতা থেকেই অনেকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত জিনিসপত্র কেনেন যা মূলত অন্যকে দেখানোর মাধ্যম। দামি ফোন বা গাড়ি সামাজিক মর্যাদা প্রকাশের হাতিয়ার হয়ে ওঠে। এর মাধ্যমে অন্যের চোখে নিজের অবস্থান উঁচুতে তোলার পাশাপাশি নিজের ভাঙা আত্মবিশ্বাস ধরে রাখার চেষ্টা থাকে।
সবচেয়ে বড় সমস্যা দেখা দেয় যখন মানুষের মূল্যায়ন চরিত্র ও দক্ষতার বদলে বাহ্যিক ধনসম্পদের ওপর হতে শুরু করে। অন্যদের সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে মানুষ একসময় আর্থিক সংকটেও পড়ে যান। তাই নিজেকে প্রমাণ করতে গিয়ে অপ্রয়োজনীয় খরচে জড়িয়ে ঋণের বোঝা বাড়ছে কি না তা দেখা দরকার।
নিজের সাফল্য প্রকাশ করা বা ভালো পোশাক পরা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। শুধু এসব দেখে কারও মানসিক সমস্যা আছে বলে রায় দেওয়া চলে না। তবে নির্দিষ্ট কিছু আচরণ নিজের বা অন্যের জীবনে জটিলতা তৈরি করছে কি না তা যাচাই করা প্রয়োজন।
পাওয়ার কথা থাকলেও প্রশংসা না পেলে যদি বারবার মানসিক আঘাত লাগে, তবে নিজের মূল্যবোধ কতটা অন্যের ওপর নির্ভরশীল তা ভাবা দরকার। সারাক্ষণ অন্যদের সঙ্গে তুলনা করার ফলে যদি নিজের জীবন নিয়ে অসন্তুষ্টির মাত্রা বাড়তে থাকে, তবে অনলাইনে সময় কাটানোর অভ্যাস পাল্টানো উচিত।
অন্যদের বাহবা পাওয়ার জন্য নিজের অর্জন বাড়িয়ে বলা বা ব্যর্থতা লুকাতে গিয়ে সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হতে পারে। নিজের সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে দামি জিনিস কেনার প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক আর্থিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
অন্যের ভালো অবস্থা দেখলে যদি মনের ভেতর হীনম্মন্যতা বা ঈর্ষা তৈরি হয়, তবে নিজের আত্মমূল্যায়ন করার সময় এসেছে। এই ধরনের মানসিকতা যদি দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে এবং দৈনন্দিন কাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে তবে পেশাদার সাহায্য নেওয়া উচিত।
এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে প্রথমে মনে রাখতে হবে যে নিজের মূল্যায়ন অন্যের স্বীকৃতির ওপর নির্ভর করে না। নিজের সব শক্তি ও সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়ে বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ করা আত্মবিশ্বাস বাড়াতে দারুণভাবে সাহায্য করে।
ভার্চুয়াল দুনিয়ায় অন্যের সেরা মুহূর্তগুলোর সঙ্গে নিজের বাস্তব জীবনকে তুলনা করা থেকে বিরত থাকতে হবে। যেসব মাধ্যম দেখলে মনে অশান্তি বাড়ে সেগুলোর ব্যবহার কমিয়ে দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে। একই সঙ্গে এমন কিছু মানুষের সান্নিধ্যে থাকা ভালো যাদের কাছে নিজের ব্যর্থতার কথাও খোলামেলে বলা যায়।
সবকিছুর ওপরে নিজেকে যেভাবে আছে সেভাবেই গ্রহণ করতে শেখাটা জরুরি। জীবনে ভুল হওয়া কিংবা পিছিয়ে পড়া মানুষের স্বাভাবিক অভিজ্ঞতার অংশ। সবসময় নিজেকে নিখুঁত প্রমাণ করার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর