নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
আমাদের দেশের মুসলিম জনপদে একটি অতি পরিচিত দৃশ্য হলো কেউ পশ্চিম দিকে পা দিয়ে বসলে বা শুলে বয়স্ক ব্যক্তিরা তাকে দ্রুত নিবৃত্ত করেন। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দক্ষিণ এশিয়া থেকে পবিত্র কাবা শরিফ কিংবা কেবলার দিকটি পশ্চিম দিকে হওয়ায় এই নির্দিষ্ট সীমানার প্রতি এ অঞ্চলের মানুষের অন্তরে বিশেষ শ্রদ্ধা ও মর্যাদা রয়েছে।
সাধারণ মানুষের মনে প্রায়ই এই জিজ্ঞাসা উঁকি দেয় যে, কেবলার দিকে পা প্রসারিত করা কি কোনো গুরুতর অপরাধ বা এটি ইসলাম ধর্মে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষিত বিষয়।
পবিত্র কাবা শরিফ কিংবা কেবলার অবস্থান ও মর্যাদার বিষয়টি মুমিন হৃদয়ে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ পৃথিবীর কোটি কোটি মুসলমান প্রতিদিন নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে এই নির্দিষ্ট দিকে মুখ করে মহান স্রষ্টার সমীপে অবনমিত হন। ইসলামের মৌলিক কাঠামোগত শিক্ষার মধ্যে অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো যেকোনো ধর্মীয় পবিত্র স্মারক বা নিদর্শনের যথাযথ সম্মান বজায় রাখা যা মূলত মুমিনের অন্তরের তাকওয়ার পরিচায়ক।
পবিত্র আল-কোআনে মহান আল্লাহ স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে, কেউ যদি আল্লাহর কোনো নিদর্শনকে সম্মান করে তবে তা তার হৃদয়ের খোদাভীতি থেকেই উৎসারিত হয়, যা সুরা হজের বত্রিশ নম্বর আয়াতে বর্ণিত হয়েছে।
এই আয়াতের মূল ভাষ্য ও প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে ইসলামি আইনশাস্ত্রের বিজ্ঞ পন্ডিতগণ একমত হয়েছেন যে কেবলার দিকটির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা প্রতিটি মুমিনের আত্মিক ও নৈতিক দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত।
ইসলাম ধর্মে সরাসরি কোরআন মজিদ কিংবা হাদিসের বাণীতে এমন কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশনা পাওয়া যায় না যেখানে কেবলার দিকে পা প্রসারিত করাকে সরাসরি হারাম বা কবিরা গুনাহ হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়েছে। তবে বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ সা. কেবলার সর্বোচ্চ সম্মান ও পবিত্রতা রক্ষার খাতিরে প্রাকৃতিক প্রয়োজন বা মলমূত্র ত্যাগের সময় সেই দিকে মুখ বা পেছন ফিরিয়ে বসতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন।
সহিহ বুখারি শরিফের তিনশ চুরানব্বই নম্বর হাদিসে নবীজি স্পষ্ট ভাষায় ইরশাদ করেছেন যে তোমরা যখন শৌচাগারে বা মলমূত্র ত্যাগ করতে যাবে তখন যেন কক্ষনো কেবলার দিকে মুখ কিংবা পিঠ করে না বসো।
নবীজির এই হাদিসের গভীর অন্তর্নিহিত শিক্ষা ও তাৎপর্যের ওপর ভিত্তি করেই ইসলামি আইনবিশারদগণ কোনো প্রকার জরুরি প্রয়োজন ছাড়াই কেবলার দিকে অযথা পা ছড়িয়ে বসা বা বিশ্রাম নেওয়াকে অপছন্দনীয় বা মাকরুহ হিসেবে নির্ধারণ করেছেন।
বিখ্যাত ফিকহবিদ ইমাম ইবনে আবিদিন তার বিখ্যাত গ্রন্থ রদ্দুল মুহতার আলাদ দুররিল মুখতারের প্রথম খণ্ডের ছয়শ পঞ্চান্ন পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন যে পবিত্র কোরআন শরিফ, কাবা কিংবা কেবলার দিকে জেনেশুনে ইচ্ছাকৃতভাবে পা প্রসারিত করা মাকরুহ।
ইমাম সাহেবের মতে এটি মূলত শিষ্টাচার ও আদবের সম্পূর্ণ পরিপন্থী কাজ এবং এর মাধ্যমে পবিত্র ধর্মীয় নিদর্শনের প্রতি একধরনের অবজ্ঞার বহিঃপ্রকাশ ঘটে থাকে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
তবে কোনো ব্যক্তি যদি শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকেন এবং পশ্চিম দিক কিংবা কেবলার দিক ব্যতিরেকে অন্য কোনো দিকে পা ছড়িয়ে শুতে বা বসতে বাধ্য হন এবং তাতে তার কষ্ট বা দুর্ভোগ বাড়ে, তবে তার জন্য শরিয়তে কোনো ধরনের পাপ বা গোনাহ লেখা হবে না।
এমনকি শরিয়তের বিধান অনুযায়ী কোনো মুমিন ব্যক্তি যদি অসুস্থতার কারণে শয্যাশায়ী হন এবং স্বাভাবিক নিয়মে দাঁড়িয়ে কিংবা বসে নামাজ আদায়ে অক্ষম হয়ে পড়েন, তবে তার জন্য কেবলামুখী হয়ে শুয়ে ইশারার মাধ্যমে সালাত আদায়ের বিশেষ বিধান রয়েছে, যে অবস্থায় তার পা প্রাকৃতিকভাবেই কেবলার দিকেই থাকে।
এই প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনের সুরা বাকারার দুইশ ছিয়াশিত নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ তায়ালা সান্ত্বনার বাণী শুনিয়ে ঘোষণা করেছেন যে আল্লাহ কখনো কোনো মানুষের ওপর তার সাধ্যের বাইরে অতিরিক্ত কোনো কাজের বোঝা চাপিয়ে দেন না।
তাছাড়া ঘরের ভেতরে জায়গার মারাত্মক সংকট থাকলে কিংবা নিরুপায় ও বাধ্য হয়ে যদি কাউকেই পশ্চিম দিকে পা দিয়ে ঘুমাতে হয়, তবে ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে এই আচরণ পুরোপুরি মার্জনীয় হিসেবে গণ্য করা হয়।
দৈনন্দিন জীবনে মানুষ অনেক সময় ঘুমের গভীরতায় অবচেতন ও আনমনা অবস্থাতেই পশ্চিম দিকে পা প্রসারিত করে ফেলে, আর ইসলামি আইন ও বিচারব্যবস্থায় কখনোই কোনো অনিচ্ছাকৃত ভুল কাজের জন্য মানুষকে জবাবদিহি বা অপরাধী করা হয় না।
পবিত্র আল-কোআনে এই বিষয়ে অত্যন্ত সুষ্পষ্ট ঘোষণা দিয়ে বলা হয়েছে যে তোমরা ভুলবশত যা কিছু করে ফেলো তাতে তোমাদের ওপর কোনো অপরাধ বর্তাবে না, বরং তোমাদের অন্তর যা দৃঢ়ভাবে সংকল্প করে কেবল সেটাই অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়, যা সুরা আহজাবের পাঁচ নম্বর আয়াতে বিবৃত হয়েছে।
অতএব ঘুম ভাঙার পর কেউ যদি লক্ষ্য করেন যে তার পা অজান্তেই পশ্চিম দিকে চলে গেছে, তবে সেই কারণে নিজেকে অকারণে অপরাধী বা পাপী মনে করার বিন্দুমাত্র কোনো কারণ নেই।
আমাদের সমাজে প্রায়শই দেখা যায় যে পশ্চিম দিকে পা দেওয়ার মতো সাধারণ একটি বিষয়কে অনেক বড় অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং বয়োজ্যেষ্ঠরা না বুঝে ছোটদের অকারণে বকাঝকা ও ভর্ৎসনা করেন, যা মূলত ইসলামের সুষম ও ভারসাম্যপূর্ণ আচরণের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
শুধুার পবিত্রতা ও সম্মান রক্ষা করা নিঃসন্দেহে একটি মহৎ আদব ও শিষ্টাচার, কিন্তু তাই বলে এটি এমন কোনো লোমহর্ষক বিষয় নয় যার জন্য সাধারণ মানুষকে অযথা দোজখের ভয় দেখাতে হবে।
বিখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ ও গবেষক ইমাম শাতিবি তার বিখ্যাত গ্রন্থ আল-মাওয়াফাকাত ফি উসুলিশ শারিয়াহর দ্বিতীয় খণ্ডের তিনশ বারো পৃষ্ঠায় অত্যন্ত জোরালোভাবে সতর্ক করে লিখেছেন যে শরিয়তে যা কেবল মাকরুহ বা সাধারণ অপছন্দনীয় বস্তু, তাকে মানুষের ওপর সরাসরি হারাম বা নিষিদ্ধ বস্তুর মতো কঠোরভাবে চাপিয়ে দেওয়া ধর্মে সীমালঙ্ঘনের শামিল।
তিনি আরও উল্লেখ করেছেন যে এই ধরনের বাড়াবাড়ি সাধারণ মানুষজনকে মূল ধর্মের প্রতি বীতশ্রদ্ধ ও বিরক্ত করে তোলে, যা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।
পরিশেষে সবকিছুর সারসংক্ষেপ হিসেবে বলা যায় যে কোনো ধরনের বৈধ কারণ ছাড়া, জেনেশুনে ইচ্ছাকৃতভাবে ও তাচ্ছিল্যের মানসিকতা নিয়ে কেবলার দিকে পা ছড়িয়ে বসা কোনোভাবেই একজন মুমিনের শোভনীয় আদব হতে পারে না এবং এটি মাকরুহ বলেই বিবেচিত।
সীমাহীন ভালোবাসা ও পরম ভক্তির জায়গা থেকেই কেবলার দিকে পা প্রসারিত করা থেকে বিরত থাকা প্রকৃত ইমানেরই একটি অন্যতম দাবি ও বহিঃপ্রকাশ।
তবে মানুষের তীব্র শারীরিক অসুস্থতা, ঘরের ভেতরে পর্যাপ্ত জায়গার অভাব কিংবা ঘুমের মধ্যে অজান্তে ঘটে যাওয়া অনিচ্ছাকৃত ভুলের কারণে পা সেদিকে চলে গেলে তা কোনোভাবেই কোনো পাপের কাজ হিসেবে পরিগণিত হবে না।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর