ঢাকা | বঙ্গাব্দ

নিজ পা কেটে ড্রোন উদ্ধারে বাঁচলেন ইউক্রেনীয় সেনা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 23, 2026 ইং
নিজ পা কেটে ড্রোন উদ্ধারে বাঁচলেন ইউক্রেনীয় সেনা ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

বোমায় ধ্বংসপ্রাপ্ত একটি বিদ্যালয়ের বয়লারের নিচের ছোট গর্তে গুটিসুটি মেরে অবস্থান করছিলেন কোস্তিয়ান্তিন ভ্লাসেনকো। সেই চরম মুহূর্তে তাঁকে এক মারাত্মক ও কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়। তিনি উপলব্ধি করেন যে, বেঁচে থাকার একমাত্র উপায় হলো তাঁর শরীরের অবশিষ্ট পা-টি নিজ হাতে কেটে ফেলা। গত ফেব্রুয়ারি মাসে সংঘটিত রুশ ড্রোন হামলায় এই ইউক্রেনীয় পদাতিক সেনা তাঁর বাঁ পা হারিয়েছিলেন। একই দফার হামলায় তাঁর ডান পা ভেঙে বেঁকে গিয়েছিল, যার ফলে তিনি হামাগুড়ি দিয়ে কোথাও যাওয়ার অবস্থাতেও ছিলেন না।

প্রায় তিন মাস পর তিনি এই চরম পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হন। নিজের কাছে থাকা একটি ছুরি ব্যবহার করে তিনি পা-টি কেটে ফেলেন এবং রক্তপাত রোধ করতে ওই স্থানে একটি ব্যান্ডেজ বেঁধে দেন। এই মর্মান্তিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই তিনি নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে বেঁচে যান। গত ৪ অক্টোবর ৪৯ বছর বয়সি এই সেনাসদস্যকে অত্যন্ত নাটকীয় ও রোমাঞ্চকর উপায়ে উদ্ধার করা হয়। তিনি প্রায় আট মাস ধরে ওই বয়লারকক্ষে অবরুদ্ধ ছিলেন এবং ইউক্রেনের ড্রোন-অধ্যুষিত যুদ্ধক্ষেত্রে পার করেছিলেন টানা ৪৯১ দিন। একটি সুবিশাল ছয় পাখার ড্রোন দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করে তাঁকে উদ্ধার করা হয়। হার্নেস বা নিরাপত্তা বেল্ট পরিহিত ঝুলন্ত ভ্লাসেনকোকে ড্রোনটি শূন্যে তুলে নেয় এবং তাঁকে ১৫ কিলোমিটার বা ৯ মাইল দূরে এক নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যায়।

ইউক্রেনীয় সামরিক কমান্ডারদের ভাষ্যমতে, আকাশপথে ড্রোনের মাধ্যমে কোনো সেনাকে সফলভাবে উদ্ধারের এটিই প্রথম জানা ঘটনা। দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে চলা এই সংঘর্ষে ড্রোনের এমন নজিরবিহীন ও ব্যাপক ব্যবহার আধুনিক যুদ্ধের চিরাচরিত সংজ্ঞাই পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে একেবারে সামনের সারিতে বা ফ্রন্টলাইনে সবচেয়ে বেশি সময় কাটানো ইউক্রেনীয় সেনাদের মধ্যে এই পদাতিক সেনা অন্যতম। সংশ্লিষ্ট এলাকাটি বর্তমানে 'কিল জোন' বা মৃত্যুপুরী হিসেবে পরিচিত। কারণ, সেখানকার আকাশ সবসময় ঝাঁকে ঝাঁকে শত্রু ড্রোন দিয়ে পূর্ণ থাকে এবং সামান্য নড়াচড়াও নিশ্চিত মৃত্যুর কারণ হতে পারে। সেখানে সুরক্ষার জন্য কোনো স্থানই নিরাপদ নয়।

যুদ্ধের উভয় পক্ষের সেনারাই মাটির অনেক গভীরে পরিখা খুঁড়তে বাধ্য হচ্ছেন এবং অনেক সময় তাঁরা সেখানে টানা মাসভর অবরুদ্ধ থাকেন। ড্রোনের ব্যাপক ও সর্বব্যাপী ব্যবহারের কারণে রুশ বাহিনীর সামরিক অগ্রগতি অনেকাংশেই থমকে গেলেও যুদ্ধক্ষেত্রে হতাহতের সংখ্যা এখনো অত্যন্ত বেশি। ড্রোন ব্যবহার করে সম্পন্ন হওয়া এই উদ্ধারকাজ ভ্লাসেনকোর জীবনের গতিপথে এক অবিশ্বাস্য মোড় এনে দেয়। নিজের পা নিজে কাটার পরবর্তী অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক মাসগুলোতে তিনি বেঁচে থাকার সব আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন।

ইউক্রেনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর খারকিভের একটি হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে এই সেনাসদস্য আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানান, তিনি নিজেকে জীবন্ত কবর দিয়ে ফেলেছিলেন। ব্যান্ডেজে মোড়ানো নিজের দুই পায়ের দিকে তাকিয়ে তিনি আরও বলেন যে, সেখান থেকে যে তিনি জীবিত ফিরতে পারবেন, সে বিষয়ে তাঁর আর কোনো আশাই ছিল না। ভ্লাসেনকোর এই চরম কষ্টের দিনগুলো এবং তাঁর নাটকীয় উদ্ধারের এই গল্পটি ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে। তাঁকে উদ্ধারকারী ড্রোনে স্থাপন করা ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজও এই ঘটনার সত্যতার জোরালো প্রমাণ বহন করে। যদিও রয়টার্স স্বাধীনভাবে তাঁর বর্ণনার প্রতিটি তথ্য পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করতে পারেনি।

ভ্লাসেনকো খারকিভ অঞ্চলে ৩০তম মেকানাইজড ব্রিগেডের হয়ে দায়িত্ব পালন করছিলেন। গত বছরের মে মাসে তাঁকে যুদ্ধের সামনের সারিতে পাঠানো হয়। সেখানে পৌঁছে তিনি বাস্কি নামের এক সহযোদ্ধার সঙ্গে মিলিত হন। ওই দুজন সেনা একটি ক্ষুদ্র মাটির গর্তে গাদাগাদি করে দিন কাটাচ্ছিলেন। ড্রোনের মাধ্যমে প্রতিদিন ওপর থেকে তাঁদের প্রয়োজনীয় খাবার এবং অন্যান্য দরকারি জিনিসপত্র সরবরাহ করা হতো। এমনকি ভ্লাসেনকোর জন্মদিনে ড্রোন থেকে বিশেষ করে চকলেট ও দামি সিগারেটও নিচে ফেলা হয়েছিল।

ভ্লাসেনকো জানান যে, গত বছরের শরৎকালে যখন সেনাদের রোটেশন বা বদলি করার সময় নির্ধারিত হয়, তখন নতুন দুই সেনা তাঁরা যেখানে অবস্থান করছিলেন সেদিকে আসার পথেই নিহত হন। তাঁদের মৃতদেহগুলো উদ্ধারের জন্য পরবর্তীতে পাঠানো আরও দুই সেনাকেও নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। বিবাহিত এই সেনা স্মরণ করে বলেন, তাঁর তখনই বুঝতে পেরেছিলেন যে এটি নিশ্চিতভাবেই জীবনের এক চূড়ান্ত বাঁকবদল মুহূর্ত। তিনি আরও উপলব্ধি করেন যে, ওই নির্দিষ্ট স্থান থেকে জীবিত অবস্থায় আর কেউ কখনো বাইরে বের হতে পারবেন না।

একটানা ১০ মাস একসঙ্গে বসবাস করার পর ভ্লাসেনকো ও বাস্কি গত ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে তাঁদের পূর্বের অবস্থান ছাড়তে বাধ্য হন। কারণ, তাঁদের আশ্রয় নেওয়া গর্তের ভেতর প্রচুর পানি ঢুকে পড়েছিল। বাধ্য হয়ে তাঁরা একটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া স্কুল ভবনে নতুন করে আশ্রয় নেন। তবে এই সাময়িক স্বস্তি তাঁদের ভাগ্যে বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। সহযোদ্ধাদের রেখে যাওয়া শুকনা কাপড় এবং খাবারের প্যাকেট সংগ্রহ করতে তাঁরা বাইরে বের হলে একটি রুশ নজরদারি ড্রোন তাঁদের শনাক্ত করে ফেলে।

ক্ষুদ্র একটি মুহূর্তের ব্যবধানে আরেকটি রুশ ড্রোন তাঁদের লক্ষ্য করে শক্তিশালী বোমা নিক্ষেপ করে। এই আকস্মিক বিস্ফোরণে বাস্কি তাঁর ৫০তম জন্মদিনের দিনেই প্রাণ হারান। বোমা বিস্ফোরণের অভিঘাতে ভ্লাসেনকোর বাঁ পা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় এবং মাটিতে পড়ে গিয়ে তিনি তাঁর অন্য পায়েও অত্যন্ত গুরুতর আঘাত পান। তিনি তখন সামান্য নড়াচড়াও করার মতো অবস্থায় ছিলেন না। কোনোমতে টেনেহিঁচড়ে তিনি একটি ক্ষুদ্র গর্তে গিয়ে আশ্রয় নেন, যার মাপ ছিল প্রায় ৮০ বাই ৬০ সেন্টিমিটার চওড়া। এই গর্তটি মূলত স্কুল ভবন গরম করার কাজে ব্যবহৃত একটি পুরোনো ধাতব বয়লারের নিচের অংশ ছিল।

ভ্লাসেনকো বর্ণনা করেন যে, তাঁর বাঁ পা ধীরে ধীরে পচে গিয়েছিল। এই মর্মান্তিক স্মৃতির কথা স্মরণ করতে গিয়ে তিনি গভীর মানসিক কষ্টে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। তাঁর ডান পায়ের নিচের অংশটি এতটাই মারাত্মকভাবে জখম ও ক্ষতবিক্ষত হয়েছিল যে হাড় পর্যন্ত বাইরে বেরিয়ে এসেছিল। শেষ পর্যন্ত তিনি তাঁর ওই পা-টিও কেটে ফেলার কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন। তিনি উল্লেখ করেন যে, তাঁকে পা-টি কাটতেই হতো, কারণ এটি তাঁর শরীরের পেছন পেছন কেবল ঝুলছিল। তিনি আরও জানান, পা-টি এমনভাবে ঝুলে ছিল যে হাড় আরও বেশি করে বাইরে বেরিয়ে আসছিল, যার ফলে তাঁর দেহে আর কোনো স্বাভাবিক পা অবশিষ্ট ছিল না।

ভ্লাসেনকো যখন জীবন নিয়ে সম্পূর্ণ নিরাশ হয়ে পড়েছিলেন, তখন পেছনের সারিতে অবস্থানরত তাঁর কমান্ডাররা তাঁকে যেকোনো মূল্যে উদ্ধারের বিকল্প উপায় খুঁজতে শুরু করেন। তাঁরা ৯২তম অ্যাসল্ট ব্রিগেড এবং অন্যান্য সামরিক দলের সঙ্গে যৌথভাবে তাঁকে নিরাপদে বের করে আনার একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন। এই উদ্ধার অভিযানের সার্বিক দায়িত্বে নিয়োজিত এক কর্মকর্তা জানান যে, ড্রোনের লাগাতার হুমকির কারণে মৃত্যুপুরী থেকে পিকআপ ট্রাক বা ভারী সাঁজোয়া যানে করে কোনো আহত যোদ্ধাকে উদ্ধার করা একপ্রকার অসম্ভব ব্যাপার ছিল। ওই কর্মকর্তা কেবল তাঁর ছদ্মনাম 'অ্যালেক্স' ব্যবহার করে নিজের পরিচয় প্রকাশ করেন।

তিনি আরও জানান যে, ইউক্রেনীয় বাহিনী এর আগে চাকাযুক্ত চালকবিহীন স্থলযান ব্যবহার করার উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু সেই পদ্ধতিও ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এই ধরনের দুটি স্বয়ংক্রিয় যান ভ্লাসেনকোর কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করলেও দুটিই রুশ ড্রোন হামলায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। ওই কর্মকর্তা স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, ভ্লাসেনকোকে তখন উদ্ধার করা অসম্ভব বলেই মনে হচ্ছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে কর্মকর্তারা 'গুরজুফ ডিফেন্স' নামের স্থানীয় একটি প্রতিরক্ষা কোম্পানির তৈরি সম্পূর্ণ নতুন এক ভারী ড্রোনের বিষয়ে জানতে পারেন।

ছয়টি খাড়া পাখা ও কালো কাঠামোর সমন্বয়ে তৈরি এই ড্রোনটিকে দেখতে অনেকটা বিশাল আকারের একটি পোকার মতো মনে হয়। এটি সর্বোচ্চ ২৫ কিলোমিটার দূর পর্যন্ত প্রায় ৯০ কেজি পর্যন্ত ওজন অনায়াসে বহন করে নিয়ে যেতে সক্ষম। উদ্ধারকারী কর্মকর্তাদের প্রাথমিক অনুমান ছিল যে, যুদ্ধক্ষেত্রে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে অবরুদ্ধ থাকার পর ভ্লাসেনকোর শরীরের ওজন বর্তমানে প্রায় ৭০ কেজি হতে পারে। তাঁকে এই বিশেষ ড্রোনের সাহায্যে ১৫ কিলোমিটার দূরে পেছনের সারির একটি নিরাপদ স্থানে নিরাপদে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।

এই পুরো উদ্ধার অভিযানটি ছিল চরম বিপদসংকুল ও ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, ইউক্রেনের বড় আকৃতির ড্রোনগুলো প্রায়শই রাশিয়ার তুলনামূলক ছোট ড্রোনগুলোর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। রাশিয়ার ওই ক্ষুদ্র ড্রোনগুলোর ক্যামেরার সরাসরি সাহায্যে দূর থেকে চালকরা যুদ্ধের মাঠের রিয়াল-টাইম পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। গত অক্টোবর মাসের শুরুর দিকে ভ্লাসেনকো লক্ষ্য করেন যে, ওপর থেকে ফেলা তাঁর নিয়মিত সরবরাহের প্যাকেটের ভেতর কিছু অপ্রত্যাশিত ও বিশেষ জিনিসপত্র রয়েছে। এর মধ্যে একটি বিশেষ বেল্ট এবং উদ্ধার সংক্রান্ত জরুরি নির্দেশনার ভিডিও সংরক্ষিত একটি মোবাইল ফোনও অন্তর্ভুক্ত ছিল। ভ্লাসেনকো এই উদ্ধার অভিযানের অন্তর্নিহিত বিপুল ঝুঁকি সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন ছিলেন। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি এ বিষয়েও সম্পূর্ণ নিশ্চিত ছিলেন যে, মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে ফেরার জন্য এটাই তাঁর একমাত্র এবং সেরা ভরসা।

সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
আংশিক মেঘলা থাকবে ঢাকার আকাশ

আংশিক মেঘলা থাকবে ঢাকার আকাশ