নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
কাছাকাছি থেকে না ফিরে পাহাড়ের ওপর থেকে সামান্য নিচে নেমে সঞ্জীত ঝরনার শীতল পানিতে নিজেদের শরীর আলতোভাবে জড়িয়ে দিলাম। অবাস্তব ও অবিশ্বাস্য এক অনুভূতি! কিছু মুহূর্ত অতিবাহিত হতেই যেন মায়ার জালে আটকে গেলাম। অলস ভঙ্গিতে বসে থাকতে থাকতে একসময় ঘনিয়ে এল সন্ধ্যা।
এরপর আমরা ছুটলাম অন্য একটি পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত একটি জুমঘরের পানে। সিদ্ধান্ত হলো যে রাতের পুরো সময়টা আমরা ওখানেই অতিবাহিত করব। জুমঘরটির ভেতরটা কিছুটা অগোছালো অবস্থায় থাকলেও সেদিন রাতে লোকালয়ে ফিরে যাওয়ার বিন্দুমাত্র কোনো সুযোগ আমাদের হাতে খোলা ছিল না।
পরের দিন ভোরে চারপাশের মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক পরিবেশ আমাদের মনকে পুরোপুরি শান্ত করে দিয়েছিল। কাঠের বারান্দায় দাঁড়িয়ে বন্য উল্লুকের হরেক রকম হাঁকডাক শোনা বেশ দারুণ এক লাগার অনুভূতি তৈরি করেছিল।
সবচেয়ে বেশি উপভোগ্য বিষয় ছিল এই মহাবিশ্বের উন্মুক্ত ক্যানভাসের নিচে সমস্ত ধরনের কৃত্রিমতার গণ্ডি পেরিয়ে প্রকৃতির উদাত্ত আহ্বানে তার সঙ্গে পুরোপুরি একাত্ম হয়ে যাওয়ার অন্যরকম এক পূর্ণ স্বাধীনতা।
এবার আমাদের অভিযাত্রা শুরু হলো সুবাসিত আতরবাগান পার হয়ে দুর্গম কাঁকড়াছড়া ঝরনার প্রান্তরের দিকে। পাহাড়ি ট্রেইলে হাইকিং ও ট্রেকিং করতে করতে আমরা একপর্যায়ে প্রবেশ করলাম বুনো এক ঝিরিপথে।
একের পর এক পাথারিয়া পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে লুকিয়ে থাকা নানা রূপের সৌন্দর্য আমাদের চোখের সামনে কেবল ধরা দিয়েই যাচ্ছিল। এটি প্রকৃতির এক অপরূপ ও অবিশ্বাস্য বিস্ময়কর সৃষ্টি ছাড়া আর কিছুই নয়।
ঝিরিপথে দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলোর ডালে ডালে ঝুলে ছিল ঢাউস আকারের সব পাকা ডুমুর। যে ফলগুলো দেখতে অনেকটা একেকটি বেশ বড়সড় লাল টুকটুকে আনারের মতো মনে হচ্ছিল।
অন্যান্য ঝিরিগুলোর তুলনায় কাঁকড়াছড়া ঝিরির পাথুরে রূপ ছিল সম্পূর্ণ আলাদা, এখানকার পাথরগুলো আকারে বেশ বড় এবং চমৎকার গোলাকার। এমনি এক নজরকাড়া ঝিরিপথ পেরিয়ে অবশেষে আমরা কাঁকড়াছড়া ঝরনার মূল প্রান্তরে গিয়ে উপস্থিত হলাম।
ঝরনাটি প্রথমবার চোখের দেখাতেই আমাদের নয়ন জুড়িয়ে গিয়েছিল এবং আমরা দারুণভাবে বিমোহিত হয়েছিলাম। এর আসল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ভাষা দিয়ে কোনোভাবেই বর্ণনা করা সম্ভব নয়।
এর চেয়ে বরং ঝরনাটির বর্ণনার ভার সম্মানিত পাঠকদের ওপরই ছেড়ে দেওয়া শ্রেয় বলে মনে করছি। তারাই বরং নিজে সেখানে ঘুরতে গিয়ে নিজ চোখে স্বচক্ষে এই রূপ দেখে আসুক।
আর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আমরাও ভোরের আলো ফুটতেই কাঁকড়াছড়া ঝরনার স্নিগ্ধ জলে অবগাহন বা গোসল করার আনন্দে মেতে উঠলাম। কিন্তু হঠাৎ করেই আকাশ মেঘে ঢাকা পড়ে গেল এবং বিকট শব্দে মেঘের গর্জন শুরু হলো।
হঠাৎ করে নেমে আসা আকস্মিক হরকাবানের বা পাহাড়ি ঢলের চরম ভয়ে আমরা দ্রুততম সময়ের মধ্যে সেখান থেকে ফিরতি পথ ধরতে বাধ্য হলাম।
মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলায় যাওয়ার জন্য ঢাকার সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে দিন ও রাতের যেকোনো সময়ে বিভিন্ন পরিবহনের যাত্রীবাহী বাস ছেড়ে যায়।
আপনাকে প্রথমে সেই বাস থেকেই বড়লেখা উপজেলার নির্দিষ্ট ডিমাই বাজারে নেমে পড়তে হবে। এরপর সেখান থেকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় চড়ে আপনাকে সরাসরি পৌঁছাতে হবে আহমেদপুর গ্রামে।
গ্রামটিতে পৌঁছানোর পর স্থানীয় কোনো পথচারী বা বাসিন্দাকে সঙ্গে নিয়ে শুরু করতে হবে দুর্গম পাহাড়ি হাইকিং ও ট্রেকিংয়ের রোমাঞ্চকর যাত্রা।
ভ্রমণপিপাসুদের থাকার সুবিধার্থে বড়লেখা উপজেলা সদরে মান ও বাজেট ভেদে রাত্রিযাপনের জন্য বেশ কিছু ভালো মানের আবাসিক হোটেল এবং খাওয়ার উপযোগী হোটেল রয়েছে।
সূত্র: আজকের পত্রিকা
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর