ঢাকা | বঙ্গাব্দ

সোনাদিয়ায় টিকে থাকা তিন পরিযায়ী পাখির চরম সংকট

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 19, 2026 ইং
সোনাদিয়ায় টিকে থাকা তিন পরিযায়ী পাখির চরম সংকট ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

গত শীত মৌসুমে চামচঠুঁটো বাটান, বড় নট ও নর্ডম্যানের সবুজ পা—এই তিন প্রজাতির বিরল পরিযায়ী পাখি দেখার তীব্র আকূতি নিয়ে সোনাদিয়া দ্বীপে পা রেখেছিলাম। দীর্ঘ দুই দিনের নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টার পর কাঙ্ক্ষিত এই তিন পাখির দেখা মিললেও, তাদের বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিশ্বজুড়ে বিপন্ন প্রজাতি হিসেবে তালিকাভুক্ত এই তিন পাখি বর্তমানে মহাবিপদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রয়েছে। সোনাদিয়া দ্বীপে এখনও এদের উপস্থিতি রয়েছে ঠিকই, তবে অতীতের তুলনায় সংখ্যাটি আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে।

২০০৬ সাল থেকে নিয়মিত বিরতিতে সোনাদিয়ায় পাখি পর্যবেক্ষণের উদ্দেশ্যে যাতায়াত করছি। গত দুই দশকের এই দীর্ঘ সময়ে দ্বীপটির প্রাকৃতিক পরিবেশ ও ভূপ্রকৃতিতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। দ্বীপটিতে মানুষের জনসমাগম ও চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। নদীর জোয়ার-ভাটার ফলে কাদাচরের পরিমাণ আগের তুলনায় বাড়লেও, সেই অনুপাতে কাদাচরের পাখির সংখ্যা বাড়েনি।

সোনাদিয়া দ্বীপে প্রধানত যাতায়াত করা হয় বৈচিত্র্যময় সৈকত পাখির ঝাঁক স্বচক্ষে দেখার জন্য। বর্তমান সময়েও এখানে শীতকালে হাজার হাজার সৈকত পাখির দেখা মেলে এবং সব মিলিয়ে প্রায় ৭ থেকে ১০ হাজার পরিযায়ী পাখি এই দ্বীপে সমবেত হয়। তবে গবেষক সায়েম চৌধুরী সম্প্রতি তাঁর একটি গবেষণাপত্রে তথ্য তুলে ধরে দেখিয়েছেন যে, সোনাদিয়াসহ পুরো উপকূলীয় অঞ্চলে পরিযায়ী সৈকত পাখির সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে। প্রায় ২০ প্রজাতির সৈকত পাখির তুলনামূলক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে তিনি দেখেছেন যে, এর মধ্যে ১২ প্রজাতির পাখির সংখ্যাই উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস পেয়েছে, যা আমাদের দেশের পরিবেশের জন্য একেবারেই ইতিবাচক নয়। এই বিপন্ন প্রজাতিগুলোর মধ্য থেকে বিশেষ তিনটি পরিযায়ী পাখির করুণ গল্প এখানে তুলে ধরছি।

আলোচ্য তালিকার প্রথম পাখিটি হলো অত্যন্ত দুর্লভ চামচঠুঁটো বাটান। আজ থেকে প্রায় ১০ থেকে ১৫ বছর আগেও সোনাদিয়া দ্বীপে নিয়মিতভাবে গড়ে ৩০টি করে এই পাখি দেখতে পাওয়া যেত। বর্তমানে সেই সংখ্যাটি নেমে এসেছে ১০টিরও অনেক নিচে এবং গত শীতের মৌসুমে মাত্র তিনটি পাখি নজরে পড়েছে। অথচ ২০১৭ সালের দিকে সোনাদিয়ার কালাদিয়া এলাকায় আমি নিজ চোখে একসঙ্গে ১২টি চামচঠুঁটো বাটান দেখেছিলাম।

চামচঠুঁটো বাটান হলো অত্যন্ত ক্ষুদ্রকায় একটি পরিযায়ী সৈকত পাখি। রাশিয়ার দূরবর্তী চুকোটকা ও কামচাটকা অঞ্চলে এই পাখি মূলত প্রজনন ক্রিয়া সম্পন্ন করে থাকে, যার ভৌগোলিক দূরত্ব সোনাদিয়া থেকে প্রায় আট হাজার কিলোমিটারের চেয়েও বেশি। মাত্র ৩০ গ্রাম ওজনের এই ছোট্ট পরিযায়ী পাখিটির টিকে থাকার ক্ষেত্রে সোনাদিয়া দ্বীপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আশ্রয়স্থল।

সারা পৃথিবীতে বর্তমানে এই প্রজাতির পাখি বেঁচে আছে মাত্র ৪৪৩টি। সোনাদিয়ায় এদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে এই পাখিটিকে এখন আর আগের মতো সহজে দেখা যায় না, যা আমাদের জীববৈচিত্র্যের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। মাত্র দুই দশকের ব্যবধানে পাখিটি আমাদের এই জনপদ থেকে হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে সোনাদিয়ায় এর আগমন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেলে সবচেয়ে বড় খেসারত ও ক্ষতি গুনতে হবে বাংলাদেশকে।

দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ পরিযায়ী সৈকত পাখিটি হলো বড় নট। বিশ্বব্যাপী সংকটাপন্ন এই পাখিটি আমাদের দেশেও ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে এবং বর্তমানে এটি গড়ে প্রতিবছর ১৯ দশমিক ৯ শতাংশ হারে কমে যাচ্ছে। সোনাদিয়া দ্বীপে নিয়মিতভাবেই এই পাখিটির উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।

একসময় সোনাদিয়া দ্বীপে প্রায় পাঁচ শর মতো বড় নট পাখির দেখা মিললেও বর্তমানে সেই সংখ্যা অর্ধেকে এসে ঠেকেছে। এই পাখিগুলো সাধারণত সোনাদিয়ার বিস্তৃত কাদাচরে বসবাস করে। গত বিশ বছরে যতবার আমি সোনাদিয়ায় ভ্রমণ করেছি, প্রতিবারই এই পাখির দেখা পেতে সক্ষম হয়েছি। বিগত বছরের পাখিশুমারির সময় উপকূলীয় অঞ্চলের অন্য কয়েকটি স্থানেও এদের কিছু উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। বড় নট পাখিকে সচরাচর লাল নট পাখির সঙ্গে অনেকে ভুলবশত গুলিয়ে ফেলেন, যার ফলে এটি চিনতে কিছুটা অসুবিধা হয়। এটিও সুদূর পথ পাড়ি দিয়ে আসা এক পরিযায়ী পাখি, যা মূলত শীতকালেই বাংলাদেশে আসে।

আমাদের তালিকার তৃতীয় পাখিটি হলো নর্ডম্যানের সবুজপা। এই প্রজাতিটিও বিশ্বজুড়ে বিপন্ন পাখির লাল তালিকার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে এবং আমাদের দেশে এর বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত ভয়াবহ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সোনাদিয়া দ্বীপ ছাড়া দেশের অন্য কোথাও এই পাখিটির দেখা মেলে না বললেই চলে। এই অতি বিরল পাখিটিকে আমি ব্যক্তিগতভাবে সোনাদিয়াতেই পাঁচ থেকে ছয়বার অবলোকন করেছি। এই পরিযায়ী পাখিটিও প্রতিবছর গড়ে ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ হারে হারিয়ে যাচ্ছে।

পৃথিবীর যেকোনো নিবেদিত পাখিপ্রেমীর কাছে সোনাদিয়া একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও অসাধারণ স্থান। অথচ অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো, আমাদের গ্রহের বুকে সোনাদিয়া যে কতখানি মহামূল্যবান একটি জায়গা, তা কেবল পাখিপ্রেমী ও গবেষক ছাড়া আর কারও নজরেই আসেনি। সোনাদিয়া দ্বীপকে কেন্দ্র করে প্রায় নানা ধরনের মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। দেশের হয়তো ভৌত উন্নয়ন সাধিত হবে, কিন্তু এর বিনিময়ে হারিয়ে যাবে এই সুন্দর ও বিরল পরিযায়ী পাখিরা।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
চীন ইরানকে অস্ত্র দিলে হতাশ হবো: ট্রাম্প

চীন ইরানকে অস্ত্র দিলে হতাশ হবো: ট্রাম্প