নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা এক মায়ের অবয়ব আজও তাড়িয়ে বেড়ায় গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার চাঁদপুর ইউনিয়নের বড়সিট গ্রামের বাসিন্দা পঞ্চাশোর্ধ্ব বাবুল শেখকে। আজ থেকে প্রায় দুই বছর আগের কথা, যখন কাপাসিয়া-জয়দেবপুর সড়কের পাতলা মোড়ে হুট করে নেমে আসা বৃষ্টির কবলে পড়েছিলেন এক নারী। সেই সময় কোলের সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরার পাশাপাশি অন্য হাতে ভারী ব্যাগ সামলাতে গিয়ে চরম বিপাকে পড়া ওই মায়ের নিরুপায় অভিব্যক্তি বাবুল শেখের মনে গভীর রেখাপাত করেছিল। দিনমজুরের স্বল্প আয়ে কোনোমতে সংসার চালানো এই সরল মানুষটি সেদিনই স্থির করেছিলেন, নিজের সামর্থ্য যতটুকুই থাকুক না কেন, সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে তিনি কিছু একটা করবেন।
অবশেষে দীর্ঘ প্রস্তুতি শেষে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের এক বিকেলে বাঁশ, কাঠ, চাটাই ও পলিথিন সংগ্রহ করে সোজা পাতলা মোড়ে চলে যান বাবুল শেখ। যে নির্দিষ্ট স্থানে দুই বছর আগে সেই মাকে বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিলেন, ঠিক সেখানেই তিনি নিজ হাতে নির্মাণ করেন প্রথম যাত্রীছাউনিটি। এরপর থেকেই শুরু হয় তাঁর জনকল্যাণমূলক এই ব্যতিক্রমী যাত্রা, যা চলমান থাকে চলতি বছরের অক্টোবর মাস পর্যন্ত। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি কাপাসিয়া-জয়দেবপুর সড়কসহ আশপাশের আরও দুটি সড়কে মোট এগারোটি যাত্রীছাউনি স্থাপন করেছেন। এমনকি একটি যাত্রীছাউনির পাশে সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য নিজ উদ্যোগে একটি শৌচাগারও নির্মাণ করেছেন এই কর্মবীর।
চলতি বছরের ৩ নভেম্বর বাবুল শেখের সঙ্গে কথা হয়, যেখানে তিনি তাঁর এই কাজের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথম যাত্রীছাউনিটি তৈরির দেড় মাস পর তিনি একই মোড়ের বিপরীত দিকে আরেকটি ছাউনি এবং শৌচাগারটি গড়ে তোলেন। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের পর ২০২৫ সালের বিভিন্ন সময়ে আরও চারটি যাত্রীছাউনি নির্মাণ করেন তিনি। আর বাকি পাঁচটি ছাউনি তৈরি করা হয়েছে চলতি বছরের নানা সময়ে। সব মিলিয়ে তিন লেনের এই সড়কগুলোতে এখন মানুষের যাতায়াতের দুর্ভোগ অনেকটাই কমে এসেছে।
তিনি জানান, এই এগারোটি যাত্রীছাউনির মধ্যে আটটিই নির্মিত হয়েছে ব্যস্ততম কাপাসিয়া-জয়দেবপুর সড়কে। এছাড়া কাপাসিয়া-কালীগঞ্জ সড়কে একটি এবং পাতলা-বড়সিট সড়কে আরও দুটি যাত্রীছাউনি স্থাপন করা হয়েছে। এই তিনটি সড়কের চার থেকে পাঁচ কিলোমিটারের দূরত্বের মধ্যেই ছড়িয়ে রয়েছে ছাউনিগুলো। বাবুল শেখ জানান যে, বাঁশ, কাঠ, চাটাই ও মোটা পলিথিন দিয়ে তৈরি এসব ছাউনির আকৃতি বিভিন্ন রকমের হয়ে থাকে। কোনোটি লম্বায় সাত ফুট ও প্রস্থে পাঁচ ফুট, আবার কোনোটি লম্বায় পাঁচ ফুট ও প্রস্থে চার ফুট আয়তনের। ছাউনির ভেতরে যাত্রীদের বসার জন্য কোনোটিতে একটি আবার কোনোটিতে চার থেকে পাঁচটি বেঞ্চ পাতা রয়েছে, আর ছাদ রক্ষায় চাটাইয়ের ওপর ব্যবহার করা হয়েছে মোটা পলিথিন।
একটি যাত্রীছাউনি তৈরিতে কী পরিমাণ খরচ হয়, তার হিসাব দিয়ে বাবুল শেখ জানান যে, ছোট আকৃতির ছাউনিগুলো বানাতে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা ব্যয় হয়। অন্যদিকে বড় আকারের ছাউনিগুলোর পেছনে খরচ পড়ে তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকার মতো। আর শৌচাগারটি নির্মাণে রিং-স্ল্যাব, প্যান ও টিনসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনতে মোট সাড়ে তেরো হাজার টাকা খরচ হয়েছে। তবে সবচেয়ে প্রশংসনীয় বিষয় হলো, এসব অবকাঠামো তৈরিতে কোনো পেশাদার শ্রমিকের সাহায্য নিতে হয়নি, সমস্ত কাজ তিনি নিজেই একা সম্পন্ন করেছেন।
শুধু যাত্রীছাউনি বা শৌচাগার নির্মাণ করেই নিজের দায়িত্ব শেষ বলে মনে করেননি এই দিনমজুর। এগুলোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ থেকে শুরু করে যাবতীয় তদারকি তিনি নিজ হাতেই করে থাকেন। শৌচাগারে সরাসরি জলের সুব্যবস্থা না থাকায় তিনি প্রতিদিন কষ্ট করে বোতলে জল ভরে তা সেখানে রেখে আসেন। ব্যবহারের পর শৌচাগার ময়লা হয়ে গেলে নিজেই তা পরিষ্কার করেন। এই সেবাূলকাজ করতে গিয়ে তাঁকে বহুবার মানুষের কটূক্তি ও বিরূপ মন্তব্যের মুখোমুখি হতে হয়েছে। এমনকি তাঁর পরিবারের সদস্যরাও মাঝেমধ্যে এমন কাজের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তবে কাউকেই পাত্তা না দিয়ে নিজের লক্ষ্যে অবিচল থেকেছেন তিনি। মানুষের এই নেতিবাচক সমালোচনা প্রসঙ্গে বাবুল শেখ বলেন যে, অনেকে তাঁকে পাগল বলে আখ্যায়িত করে, কিন্তু তিনি সেই কথায় কান দেন না।
পাতলা গ্রামের বাসিন্দা উবায়দুল্লাহ আকন জানান যে, বাবুল শেখ কেবল যাত্রীছাউনিই বানান না, তিনি গ্রামের বিভিন্ন সড়কের পাশের জঙ্গল ও ঝোপঝাড়ও নিজের উদ্যোগে পরিষ্কার করেন। তিনি অত্যন্ত সরল প্রকৃতির মানুষ এবং কারও সঙ্গে কখনো তর্কে জড়ান না। তাঁকে দেখে সমাজের অনেকেরই অনেক কিছু শেখার রয়েছে। উল্লেখ্য, বাবুল শেখ যে তিনটি সড়কে এই যাত্রীছাউনিগুলো নির্মাণ করেছেন, তার একটি সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের নিয়ন্ত্রণাধীন এবং বাকি দুটি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) আওতাধীন।
এলজিইডির কাপাসিয়া উপজেলা প্রকৌশলী মো. সোহেল রানা এবং কাপাসিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হাফিজুল হক উভয়েই বাবুল শেখের এই মহৎ উদ্যোগকে অত্যন্ত প্রশংসনীয় হিসেবে অভিহিত করেছেন। প্রতিবেদকের মুখে গত বৃহস্পতিবার বিষয়টি শোনার পর দুজনই তাঁর সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
গত ৩ নভেম্বর সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, কাপাসিয়া-জয়দেবপুর সড়কের পাতলা মোড়ের প্রথম যাত্রীছাউনিতে কেউ তীব্র রোদ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আবার কেউ বা যানবাহনের অপেক্ষায় বসে আছেন। এই ছাউনির পাশেই রয়েছে সেই শৌচাগারটি, যার পাশে বাঁশের খুঁটিতে দড়ি দিয়ে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে জলের বেশ কয়েকটি বোতল। শৌচাগারের বেড়ার গায়ে সাঁটানো একটি ব্যানারে ব্যবহার শেষে তা পরিষ্কার রাখার নির্দেশনামূলক বার্তা লেখা রয়েছে।
সেখানে বাসের জন্য অপেক্ষমাণ যাত্রী বেদন মিয়া বলেন যে, রাস্তার পাশে বসার সুব্যবস্থা থাকায় সাধারণ যাত্রীদের অনেক উপকার হয়েছে। রোদের মধ্যে খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে কষ্ট করার দিন শেষ হয়েছে। এছাড়া পাশের বড়সিট গ্রামের মো. রিয়াদ জানান যে, শৌচাগারটি নির্মিত হওয়ায় পথচারী ও যাত্রীদের প্রাত্যহিক চলাচলে দারুণ সুবিধা হয়েছে।
পঞ্চাশোর্ধ্ব এই মানুষটির নিজস্ব সম্বল বলতে কেবল চাঁদপুর ইউনিয়নের বড়সিট গ্রামের বসতঘরটি ছাড়া আর তেমন কিছু নেই। দিনমজুরির পাশাপাশি বাড়িতে ছোটখাটো একটি মুরগির খামার গড়ে তুলেছেন তিনি। এই সামান্য আয় দিয়েই তাঁর কোনোমতে সংসার চলে। তাঁর পরিবারে রয়েছে এক মেয়ে ও দুই ছেলে। মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে, ছোট ছেলে মাদ্রাসায় পড়াশোনা করে এবং বড় ছেলেকে মাত্র সাত মাস আগে বিদেশ পাঠানো হয়েছে, যার জন্য আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ঋণ করতে হয়েছে তাঁকে।
সংসারে এমন চরম আর্থিক অনটন ও টানাপোড়েন থাকা সত্ত্বেও কেন তিনি এই ধরনের জনহিতকর কাজে নিজেকে যুক্ত করেছেন—এমন প্রশ্নের জবাবে বাবুল শেখ অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে জানান যে, ছোট কোনো কাজের মাধ্যমেও যদি মানুষের সামান্য উপকার হয়, তাতেই তাঁর যত আনন্দ।
এদিকে স্বামীর এই অদ্ভুত কর্মকাণ্ড নিয়ে স্ত্রী সালমা খাতুনের মনেও একসময় মিশ্র প্রতিক্রিয়া ছিল। সংসার যেখানে ঠিকমতো চলে না, সেখানে রাস্তার ধারে যাত্রীছাউনি বা শৌচাগার বানিয়ে কী লাভ হবে—এই ভেবে তিনি শুরুতে একে স্বামীর এক ধরনের পাগলামি ছাড়া কিছুই মনে করতেন না। তবে সময়ের পরিক্রমায় এখন তাঁর সেই ধারণায় বড় পরিবর্তন এসেছে। সালমা খাতুন জানান যে, একসময় তিনি ভাবতেন এসব করে কী হবে, কিন্তু এখন তিনি নিজ চোখে দেখছেন যে সাধারণ মানুষের কত উপকার হচ্ছে এবং সবাই তাঁর স্বামীর প্রশংসা করছে। তাই এখন এই ভালো কাজগুলো দেখে তাঁর নিজের মনও গর্ব ও আনন্দে ভরে ওঠে।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর