নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
দীর্ঘদিন ধরে চলা অচলাবস্থা কাটিয়ে শিক্ষার্থীরা সম্প্রতি ক্লাস ও পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শুরু করলেও, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) আবারও এক দিনের শাটডাউন কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন আন্দোলনকারীরা। আগামীকালের এই কর্মসূচি পালিত হবে মূলত অধ্যাপক কাজী দেলোয়ার হোসেনকে উপাচার্যের রুটিন দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্তের জোরালো প্রতিবাদ হিসেবে। আজকের সন্ধ্যার দিকে একটি জরুরি বিবৃতির মাধ্যমে এই নতুন কর্মসূচির কথা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম ইউজিসির একটি পূর্বনির্ধারিত সভায় যোগদানের উদ্দেশ্যে বর্তমানে ঢাকার পথ ধরেছেন। তাঁর অনুপস্থিতির কারণে আজকেই তড়িৎ ও কম্পিউটার কৌশল অনুষদের ডিন অধ্যাপক কাজী দেলোয়ার হোসেনের ওপর উপাচার্যের রুটিন দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পরিষ্কার বক্তব্য হলো, তাঁরা বর্তমান নতুন উপাচার্যকে কখনোই মেনে নেননি এবং অন্য কোনো ব্যক্তির মাধ্যমে ক্যাম্পাসে তাঁর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার যেকোনো গোপন বা প্রকাশ্য প্রচেষ্টাকেও তারা সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করছেন।
মূলত সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমের স্বীয় পদে পুনর্বহালের দাবিতে চুয়েটজুড়ে গত ৪১ দিন ধরে টানা আন্দোলন চলছে। গত ২১ সেপ্টেম্বর অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে সরিয়ে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করা হয় অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে, আর এর ঠিক পরের দিন থেকেই এই ক্ষোভ ও আন্দোলন দানা বাঁধতে শুরু করে। এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় গত ১২ অক্টোবর নতুন উপাচার্য ক্যাম্পাসে প্রবেশ করলে প্রায় ৩০ ঘণ্টা অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। পরবর্তীতে প্রশাসনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তিনি ক্যাম্পাস ত্যাগ করতে সক্ষম হন এবং সেই থেকে তিনি ক্যাম্পাসের বাইরে অবস্থান করছেন। যদিও গত বুধবার সাধারণ শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা শিক্ষা কার্যক্রমে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন, তবুও সাবেক উপাচার্যকে পুনর্বহাল করার মূল দাবি থেকে তাঁরা একচুলও সরে আসেননি এবং আন্দোলন এখনো অব্যাহত রয়েছে।
ক্লাস ও পরীক্ষা চালুর পাশাপাশি চলমান আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে শিক্ষার্থীরা তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। তাদের প্রকাশিত বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, একান্তভাবেই নিজেদের শিক্ষাজীবন এবং সামগ্রিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থার কথা গভীরভাবে বিবেচনা করেই তারা ক্লাসে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তবে তাদের পূর্বনির্ধারিত ও অনড় অবস্থান ছিল এই যে, তাঁরা নতুন উপাচার্যকে কোনোভাবেই গ্রহণ করেননি এবং ক্যাম্পাসের দৈনন্দিন স্বাভাবিক কার্যক্রমে তাঁর কোনো ধরনের অযাচিত হস্তক্ষেপ বা কর্তৃত্ব থাকতে পারবে না।
শিক্ষার্থীদের আরও গুরুতর অভিযোগ হলো, তাঁদের এই স্পষ্ট অবস্থান ও নীতিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেই সম্পূর্ণ একতরফাভাবে অন্য আরেকজনকে উপাচার্যের রুটিন দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। এরই তীব্র এবং তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ হিসেবে আগামী সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল ধরনের ক্লাস-পরীক্ষা এবং একইসঙ্গে রুটিন দায়িত্বের ভিত্তিতে পরিচালিত সমস্ত প্রশাসনিক কার্যক্রম বর্জন করার ঘোষণা দিয়েছেন তাঁরা।
এই বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মাহতাব হক গণমাধ্যমকে জানান যে, দীর্ঘদিনের তীব্র আন্দোলনের পর শুধুমাত্র নিজেদের শিক্ষাজীবনের কথা মাথায় রেখেই তাঁরা ক্লাসে ও পরীক্ষায় ফিরেছিলেন। কিন্তু তাঁদের পূর্বঘোষিত অবস্থানকে সম্পূর্ণ বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে উপাচার্যের রুটিন দায়িত্ব অন্য কাউকে অর্পণ করার সিদ্ধান্তটি কোনোভাবেই মেনে নেওয়ার মতো নয় এবং এর প্রতিবাদেই তাঁরা কালকের এই শাটডাউন ডেকেছেন।
একই সঙ্গে শিক্ষার্থী মাহতাব হক দৃঢ়তার সঙ্গে পুনরোল্লেখ করেন যে, তাঁদের মূল দাবি অর্থাৎ অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনরায় স্বপদে পুনর্বহাল না করা পর্যন্ত এই আন্দোলন কোনোভাবেই থামবে না, বরং তা যথারীতি চলতেই থাকবে।
এদিকে আজকের দিনে একটি ই-মেইল বার্তার মাধ্যমে অধ্যাপক কাজী দেলোয়ার হোসেনের কাছে উপাচার্যের রুটিন দায়িত্ব হস্তান্তরের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়। সেই ই-মেইলে পরিষ্কার বলা হয়েছে যে, আগামীকালের ইউজিসির একটি গুরুত্বপূর্ণ সভায় সরাসরি অংশ নেওয়ার জন্য উপাচার্য ঢাকায় অবস্থান করবেন। তাঁর অনুপস্থিতির পুরো সময়টায় অধ্যাপক কাজী দেলোয়ার হোসেন নিজের নিয়মিত পদের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি উপাচার্যের রুটিন প্রশাসনিক ও একাডেমিক দায়িত্বও সাফল্যের সঙ্গে পরিচালনা করবেন।
উক্ত ই-মেইলের নির্দেশিকা অনুযায়ী, আজ রোববারের বিকেল থেকেই এই রুটিন দায়িত্বের কার্যকারিতা শুরু হয়ে গেছে। আগামীকাল সন্ধ্যার দিকে উপাচার্য পুনরায় নিজ কর্মস্থলে ফিরে এসে নিজে দায়িত্ব বুঝে না নেওয়া পর্যন্ত অধ্যাপক কাজী দেলোয়ার হোসেন এই বাড়তি দায়িত্ব বহাল রাখবেন।
সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে এই বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে অধ্যাপক কাজী দেলোয়ার হোসেন পুরো বিষয়টিকে একটি সাধারণ বা ‘রেগুলার ইস্যু’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং কোনো মন্তব্য না করেই দ্রুত ফোনের সংযোগ কেটে দেন। অন্যদিকে উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম জানান যে, সম্পূর্ণ দাপ্তরিক ও জরুরি কাজের অংশ হিসেবেই তিনি ঢাকায় গমন করছেন এবং তাঁর এই সাময়িক অনুপস্থিতিতে তড়িৎ ও কম্পিউটার কৌশল অনুষদের ডিন অধ্যাপক কাজী দেলোয়ার হোসেন রুটিন দায়িত্বগুলো পালন করবেন।
এর আগে আজ রোববার বেলা তিনটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব মিলনায়তনে সমবেত হয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সভা করেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। সভা শেষে তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক থেকে একটি বিশাল বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। মিছিলটি ক্যাম্পাসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে স্বাধীনতা চত্বর ঘুরে পুনরায় প্রধান ফটকের সামনে এসে শান্তিপূর্ণভাবে সমাপ্ত হয়।
উক্ত বিক্ষোভ মিছিলে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণকারী যন্ত্রকৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী যুলক্বারনাইন মিহাদ সংবাদমাধ্যমকে জানান যে, তাঁদের অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও একটাই মূল দাবি রয়েছে—তা হলো অধ্যাপক সায়েম স্যারকে অবিলম্বে পুনর্বহাল করতে হবে। ঠিক এই একটিমাত্র মৌলিক দাবিতেই তাঁরা আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন এবং দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত রাখবেন।
এছাড়া ইউজিসির পরামর্শক কমিটির সাম্প্রতিক সফর প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে যুলক্বারনাইন মিহাদ জানান যে, ইউজিসি কমিটি অত্যন্ত মনোযোগের সঙ্গে তাঁদের কথা শুনেছে এবং শিক্ষার্থীরা যে একমাত্র অধ্যাপক সায়েমকেই এই পদে চাচ্ছেন, সেই প্রকৃত চিত্র ও জনমতই কমিটি উচ্চ মহলে তুলে ধরবে বলে তাঁরা দৃঢ়ভাবে আশাবাদী।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর