নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
রাজধানীর অন্যতম প্রধান উন্মুক্ত স্থান ওসমানী উদ্যান প্রায় নয় বছরব্যাপী চলা আধুনিকায়ন প্রক্রিয়া শেষে অবশেষে জনসাধারণের জন্য আবার উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে এই নবনির্মিত রূপের উদ্যানের শুভউদ্বোধন সম্পন্ন করেন। উদ্যানটির এই আধুনিক রূপান্তরের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে জুলাই মাসের গণ-অভ্যুত্থানে জীবন উৎসর্গকারী শহীদদের চিরস্মরণীয় করে রাখতে নির্মিত একটি নতুন স্মৃতিস্তম্ভ।
দীর্ঘ দীর্ঘ সময় ধরে এই পার্কটি বন্ধ থাকায় নগরবাসীর মাঝে একধরনের হতাশা কাজ করছিল, যা এবার পার্কটি খুলে দেওয়ার খবরে স্বস্তিতে রূপ নিয়েছে। তবে উদ্বোধনের ঠিক দিনটিতেই ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন ধরনের নতুন গাছ রোপণ ও অবকাঠামো গড়ে তুলে উদ্যানকে সাজানো হলেও এর ভেতরের হাঁটার পথগুলোর নির্মাণকাজ এখনও অসমাপ্ত রয়ে গেছে। স্থপতিদের জোরালো অভিমত অনুযায়ী, উদ্যানটির একটি বিরাট অংশ জুড়ে অতিরিক্ত কংক্রিট ব্যবহার করায় এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও মূল উপাদান মাটি এবং সবুজ ঘাসের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে।
সোমবার দুপুরে সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায় যে, পার্কের পুরো চত্বরে নানা প্রজাতির বৃক্ষরোপণ করা হয়েছে। এছাড়া সাধারণ মানুষের বিনোদন, অবসরযাপন ও শরীরচর্চা নিশ্চিত করতে জলাশয়, ওয়াকওয়ে, বসার জায়গা এবং ব্যায়ামাগারের মতো প্রয়োজনীয় নানা অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে।
প্রায় বাইশ একর বিশাল আয়তনের এই পার্কটি দীর্ঘদিন ধরে নগরবাসীর প্রাতঃভ্রমণ, বিশ্রাম ও অবসরের প্রিয় স্থান হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু ব্যাপক উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের অজুহাতে ২০১৭ সাল থেকে দীর্ঘ প্রায় নয় বছর এটি পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়েছিল। তৎকালীন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন ২০১৭ সালে প্রায় ১০৮ কোটি টাকা ব্যয়ে এই বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্পটির সূচনা করেছিলেন। পরবর্তীতে ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি নিজে সংস্কার কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন, যা মূলত ২০২০ সালের মধ্যেই শেষ হওয়ার কথা নির্ধারিত ছিল।
বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার কারণে প্রথম ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কার্যাদেশ বাতিল করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ এবং পরবর্তীতে ২০২৩ সালে পিএফ করপোরেশনকে নতুন করে কাজের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। এই উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ, একটি নগর জাদুঘর স্থাপন, গ্রন্থাগার তৈরি, বারটি বাণিজ্যিক দোকান, একটি জিমনেশিয়াম, আধুনিক শৌচাগার, গাড়ি পার্কিংয়ের পর্যাপ্ত জায়গা এবং তিন কিলোমিটার দীর্ঘ হাঁটার পথসহ বহুবিধ কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
ঘটনাস্থলে ঘুরে দেখা যায়, উদ্যানের নির্দিষ্ট এক অংশে দুই স্তরের একটি বিশাল অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে। এর নিচের তলায় নগর জাদুঘর, লাইব্রেরি, দোকানপাট ও জিমনেশিয়াম স্থাপন করা হয়েছে এবং ওপরের অংশটি দর্শনার্থীদের বসা ও হাঁটার জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। উদ্যানের বিভিন্ন অংশে আম, জামরুল, কদবেল, তেঁতুল, গাব, মেহগনি, অর্জুন, স্বর্ণচাপা এবং সোনালুর মতো বিভিন্ন ফলজ, ফুল ও সৌন্দর্যবর্ধক গাছ রোপণ করা হয়েছে। পাশাপাশি চারপাশের মাটিতে দুর্বা ঘাসও লাগানো হয়েছে। উদ্যানের দুই পাশে দুটি লেক খনন করা হলেও একটিতে শ্যাওলাযুক্ত পানি দেখা গেলেও অপর লেকটি সম্পূর্ণ শুষ্ক অবস্থায় রয়েছে।
তবে এই আধুনিকায়নের মাঝেও উদ্যানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হাঁটার রাস্তাগুলোর কাজ এখনো পুরোপুরি অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। সেখানে কেবল সাধারণ সিমেন্টের ঢালাই দিয়ে কাজ অসমাপ্ত রাখা হয়েছে।
এই বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাওয়া হলে প্রকল্প পরিচালক সাইফুল ইসলাম সংবাদমাধ্যমকে জানান যে, রাস্তার এই কাজগুলো মূলত আগের ঠিকাদারেরাই সম্পন্ন করেছিল। কাজের মান সন্তোষজনক না হওয়ায় সেই ঠিকাদারদের বাদ দেওয়া হয়েছিল এবং পরবর্তী নতুন ঠিকাদারেরা আর রাস্তার অসমাপ্ত কাজগুলো করেনি।
ওসমানী উদ্যানের এই সামগ্রিক আধুনিকায়ন কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণে নির্মিত ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’। ড. মুহম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শাসনকালে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে প্রায় ৩৯ কোটি টাকা ব্যয়ে এই গৌরবময় স্মৃতিস্তম্ভ ও উদ্যানের দুটি মূল প্রবেশফটক নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল।
প্রায় এক একর এলাকজুড়ে নির্মিত নব্বই ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট এই স্মৃতিস্তম্ভের গায়ে আধুনিক লেজার কাটিং প্রযুক্তির সাহায্যে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ হওয়া আটশত চৌত্রিশ জনের নাম নিখুঁতভাবে খোদাই করা হয়েছে। এর সামনের চত্বরে সাজিয়ে রাখা হয়েছে কুড়িটি প্রতীকী সমাধিফলক। এই বিশেষ স্মৃতিস্তম্ভে চমৎকার কিছু রিলিফ ভাস্কর্যের মাধ্যমে ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থান, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী গণ-আন্দোলন এবং চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
ওসমানী উদ্যানের এই বিতর্কিত উন্নয়নকাজ প্রসঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের সম্মানিত অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান সংবাদমাধ্যমকে মূল্যায়ন করে বলেন যে, অতিরিক্ত কাজ করার প্রবণতার কারণে এই ঐতিহাসিক পার্কের মূল চরিত্র পুরোপুরি নষ্ট করা হয়েছে। তাঁর মতে, কেবল সরকারি বাজেট বা প্রকল্পের পরিধি বাড়ানোর উদ্দেশ্যে এত বিপুল পরিমাণ কংক্রিটের ব্যবহার করা হয়েছে। পার্কটির প্রায় ত্রিশ থেকে চল্লিশ শতাংশ জায়গা জুড়ে কৃত্রিম কংক্রিটের আস্তরণ তৈরি করা হয়েছে। উল্লেখ্য, নগর-পরিকল্পনাবিদেরা দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে একসময়ের এই সবুজ ও নিরিবিলি পার্কটির ভেতরে অতিরিক্ত কৃত্রিম স্থাপনা নির্মাণের বিষয়ে শুরু থেকেই তীব্র আপত্তি জানিয়ে আসছিলেন। তাঁদের সুস্পষ্ট অভিযোগ ছিল যে, এসব উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রচলিত কোনো ইমারত বিধিমালার বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি, অথচ নিয়মানুযায়ী পার্কের মোট আয়তনের সর্বোচ্চ মাত্র পাঁচ শতাংশ জায়গায় স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণের আইনি সুযোগ রয়েছে।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর