নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
মাউন্ট এভারেস্টকে বর্তমান বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস ঘাঁটলে প্রশ্ন জাগে, সুদূর অতীতে কি এর চেয়েও উঁচু কোনো পর্বতমালা পৃথিবীতে ছিল?
মহাদেশীয় প্লেটগুলোর তীব্র সংঘর্ষের ফলে বিশালাকার পর্বতমালা তৈরি হয়। এই ধরনের ভূকম্পন ও সংঘাতের মাধ্যমেই হিমালয় এবং এভারেস্টের মতো উচ্চ পর্বত গড়ে উঠেছে। তবে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৮ হাজার ৮৪৯ মিটার বা ২৯ হাজার ৩২ ফুট উঁচুতে অবস্থিত এভারেস্টের চেয়ে প্রাচীনকালে কোনো বড় পর্বত ছিল কি না, তা নিয়ে পুরোপুরি পরিষ্কার তথ্য নেই। যদিও বিজ্ঞানীরা কিছু ভূতাত্ত্বিক প্রমাণ খুঁজে পেয়েছেন, যা প্রাচীনকালে সর্বোচ্চ পর্বতগুলোর সম্ভাব্য অবস্থান সম্পর্কে ধারণা দেয়।
অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অ্যালান কলিন্স জানান, শতকোটি বছর আগের ঠিক কোন পর্বতটি সবচেয়ে উঁচুতে ছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানা সম্ভব হয়নি। তবে ভূগর্ভস্থ পাথরের স্তর এবং বিভিন্ন উপাদানের মধ্যে কিছু সূত্র লুকিয়ে রয়েছে। বিজ্ঞানীরা মাটির নিচের এই অবশিষ্টাংশ নিয়ে গবেষণা করে দেখেন যে সেগুলোর শিকড় ভূত্বকের কত গভীরে প্রোথিত ছিল। এই গভীরতা পরিমাপ করেই প্রাচীন পর্বতগুলোর সম্ভাব্য উচ্চতা সম্পর্কে ধারণা লাভ করা যায়।
টেকটোনিক প্লেটগুলোর অতি মন্থর গতির সংঘর্ষের কারণে পাহাড় বা পর্বতরাজি ওপরের দিকে উত্থিত হয়। ভূত্বক অত্যন্ত ভারী হওয়ায় এর একটি বিশাল অংশ মাটির নিচে অবস্থান করে। এভারেস্টের মতো উচ্চ পর্বতগুলোও ভূত্বকের গভীর স্তরের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে সংযুক্ত থাকে। অধ্যাপক কলিন্স এবং কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূরসায়নবিদ জিয়ি ঝু যৌথভাবে এই বিষয়টি নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
গবেষকদের মতে, পর্বতগুলো মূলত সমুদ্রের ভাসমান আইসবার্গের মতো আচরণ করে। একটি আইসবার্গের যেমন সামান্য অংশ পানির ওপরে দৃশ্যমান থাকে এবং মূল অংশটি নিচে ডুবে থাকে, তেমনি পর্বতেরও খুব অল্প অংশই চোখে পড়ে। হিমালয়ের নিচের ভূত্বকের গভীরতা প্রায় ৮০ কিলোমিটার বা ৫০ মাইল। এভারেস্টের উচ্চতা প্রায় ৮ হাজার ৮৪৯ মিটার হিসেব করলে দেখা যায়, এই শিলাস্তরের মাত্র চৌদ্দ শতাংশ অংশ মাটির ওপরে দৃশ্যমান রয়েছে।
একটি নির্দিষ্ট সীমার বেশি উঁচু হওয়া পর্বতগুলোর পক্ষে সম্ভব নয়। অতিরিক্ত উচ্চতায় পৌঁছানোর পর পাহাড়গুলো নিজেদের ভারেই ধসে পড়তে শুরু করে। চার থেকে পাঁচ কোটি বছর পূর্বে ভারতীয় ও ইউরেশীয় প্লেটের সংঘর্ষের ফলে হিমালয়ের উৎপত্তি ঘটে। ভূতাত্ত্বিক বিচারে নবীন হওয়ার কারণে এটি এখনও উঁচুতে টিকে আছে। সাধারণত প্রাকৃতিক ক্ষয়কার্যের ফলে পর্বত ছোট হয়ে যায়, কিন্তু প্লেটের ধাক্কা অব্যাহত থাকায় হিমালয় প্রতিবছর সামান্য করে ওপরে উঠছে।
পৃথিবীর ইতিহাসে অতীতে বহুবার মহাদেশীয় প্লেটের এমন সংঘর্ষ ঘটেছে। এমন একটি প্রাচীন সুপারমাউন্টেন হলো ট্রান্স-গন্ডওয়ানান সুপারমাউন্টেন, যা বর্তমান পূর্ব আফ্রিকা অঞ্চলে অবস্থিত ছিল। প্রায় ৬৫ কোটি বছর পূর্বে বেশ কয়েকটি মহাদেশের সংঘর্ষে গন্ডওয়ানা নামক অতিমহাদেশ গঠিত হওয়ার সময় এই পর্বতমালা তৈরি হয়েছিল। গন্ডওয়ানা ভেঙে গেলেও দক্ষিণ ভারত, শ্রীলঙ্কা, কেনিয়া ও তানজানিয়ায় এর পাথরের অস্তিত্ব মিলেছে।
বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে এই পর্বতমালা দৈর্ঘ্যের দিক থেকে হিমালয়ের প্রায় তিন গুণ বড় ছিল। বিজ্ঞানীদের ধারণা অনুযায়ী, উচ্চতার দিক থেকেও এটি হিমালয়ের সমান কিংবা তার চেয়েও বেশি বিশাল ছিল। হিমালয়ের সর্বোচ্চ অংশগুলো তিব্বত মালভূমির প্রান্তে অবস্থিত, যা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার উঁচুতে ছড়ানো। গবেষক কলিন্সের মতে, প্রাচীন গন্ডওয়ানা পর্বতমালার ক্ষেত্রেও এমন একটি সুবিশাল মালভূমি থাকতে পারে।
সবচেয়ে উঁচু পর্বতের সম্ভাব্য তালিকার আরেকটি প্রাচীন নাম হলো গ্রেনভিল ওরোজেনি। প্রায় ১৩০ কোটি বছর আগে রোডিনিয়া অতিমহাদেশ গঠনের সময় এর সৃষ্টি হয়েছিল। এর কিছু অবশিষ্টাংশ বর্তমানে দক্ষিণ-পূর্ব অন্টারিও এবং উত্তর-পশ্চিম ভার্মন্টে দেখা যায়। তবে অধ্যাপক কলিন্সের মতে, এই বিলুপ্ত পর্বতমালা নিয়ে পর্যাপ্ত তথ্য বিজ্ঞানীদের হাতে নেই। কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এগুলো ট্রান্সগন্ডওয়ানা বা হিমালয়ের মতো অতটা উঁচু ছিল না।
প্রায় ২০০ কোটি বছর পূর্বে নুনা বা কলম্বিয়া নামের আরেকটি অতিমহাদেশ তৈরির সময়ও বিশাল পর্বত গড়ে উঠেছিল। বিজ্ঞানী ঝু তাঁর গবেষণায় এই অতিপর্বতমালার অস্তিত্বের প্রমাণ পেয়েছেন। বিলুপ্ত এসব পর্বতের ভূত্বকের ভেতর থেকে সংগৃহীত জিরকন স্ফটিকের গঠন পরীক্ষা করে তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন।
তবে আরও প্রাচীন সময়ের কথা চিন্তা করলে পরিস্থিতি বেশ ঘোলাটে হয়ে যায়। অধ্যাপক কলিন্স উল্লেখ করেন, আদিযুগে পৃথিবী অনেক বেশি উত্তপ্ত থাকায় পর্বতগুলো অধিক উঁচুতে উঠতে পারত না, কারণ উষ্ণ ভূত্বক বেশি ভার বহন করতে অক্ষম। তাছাড়া প্রায় চার শ কোটি বছর পর স্থিতিশীল মহাদেশীয় পাত গঠিত হয় এবং বড় বড় মহাদেশ গড় উঠতে আরও সময় লাগে।
বিজ্ঞানী ঝুর মতে, বর্তমানের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী নুনা, ট্রান্সগন্ডওয়ানা এবং হিমালয় পর্বতমালাগুলোই পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বোচ্চ পর্বত ধারণকারী অঞ্চল হতে পারে। তবে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করেও সুনির্দিষ্টভাবে ঠিক কোন পর্বতটি ইতিহাসের সবচেয়ে উঁচু ছিল তা নিশ্চিত করা প্রায় অসম্ভব। বিজ্ঞানী ঝুর ভাষায়, এটি এখনও একটি অমীমাংসিত প্রশ্ন হিসেবেই রয়ে গেছে।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর