নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
১৯৬৬ সালে নওরোজ কিতাবিস্তান থেকে প্রকাশিত হয় রোকাইয়া জাফরীর একটি বিশেষ বই, যার শিরোনাম ছিল ‘লেনিনের দেশে লালনের মেয়ে’। যদিও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এই প্রকাশের সাল নিয়ে ভুল তথ্য দিয়ে এটিকে ১৯৯১ সাল বলে দাবি করে। ততোদিনে লেখিকা দেশত্যাগ করে পাকিস্তানে পাড়ি জমান, বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন এবং পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য পদ লাভ করেন। এর আগেই তিনি ভ্রমণ করেন সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন। সিরাজগঞ্জে জন্ম নেওয়া এই নারী হোসেন শহীদ সোহওয়ার্দী, শেখ মুজিবুর রহমান ও আতাউর রহমান থেকে শুরু করে আইয়ুব খানের মতো ব্যক্তিত্বদের পরিচিত বৃত্তে ছিলেন।
১৯১৭ সালের ৭ নভেম্বর রাশিয়ার লেনিনের নেতৃত্বে সংঘটিত হয়েছিল ঐতিহাসিক বলশেভিক বিপ্লব, যা বিশ্বজুড়ে অক্টোবর বিপ্লব হিসেবে পরিচিত। এদিকে বাউল সাধক লালন সাঁইয়ের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় তিন দিনব্যাপী লালন স্মরণোৎসব-২০২৬ চলছে এবং আজ এর সমাপনী দিন। এই অক্টোবরের প্রেক্ষাপটে লালন ও লেনিনের সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নকে একত্রে স্মরণের মাধ্যম হতে পারে একটি গ্রন্থ। সেই একক বইটির আলোকেই আমরা লেখক ও তাঁর মনোজগৎকে উন্মোচনের প্রয়াস পাবো।
সাহিত্য গুরুকুল নামক একটি অনলাইন সূত্র থেকে জানা যায়, রোকাইয়া জাফরীর পিতার নাম সৈয়দ আকবর আলী। ওই সময়ে সিরাজগঞ্জ শহরে কোনো উচ্চবিদ্যালয় না থাকায় তিনি ১৯৪০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় অংশ নেন এবং রাজশাহী বিভাগের মুসলিম নারীদের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করেন। পরবর্তীতে কলকাতার লেডি ব্রাবোর্ন কলেজ থেকে বিএ ডিগ্রি অর্জনের পর ১৯৪৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই বাংলা সাহিত্যে মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। তাঁর বর্ণাঢ্য শিক্ষাজীবন ও রাজনৈতিক পথপরিক্রমার ফলশ্রুতিতেই আমরা লালন ও লেনিনকে কেন্দ্র করে রচিত এই ভ্রমণকাহিনিমূলক গ্রন্থটি হাতে পাই।
গত কয়েক বছর আগেও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি ছাড়াও লিটারেচার ডটকম এবং রকমারি ডটকমে বইটির সহজলভ্যতা ছিল। তবে সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে ইন্টারনেটে বইটির কোনো অস্তিত্ব বা লিংক খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, যা থেকে আশঙ্কা জাগে এটিকে হয়তো সচেতনভাবেই সরিয়ে ফেলা হয়েছে কি না। ২০০২ বা ২০০৩ সালের দিকে শাহবাগস্থিত কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরি থেকে বইটি পাঠ করেছিলেন বর্তমান আলোচক এবং সে সময়ে কিছু প্রয়োজনীয় নোটও টুকে রেখেছিলেন, যা সৌভাগ্যবশত এখনো তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহেই সুরক্ষিত রয়েছে।
ঐতিহাসিক সেই গ্রন্থটিতে কিছু ভারতবিরোধী মনোভাব এবং পাকিস্তানের রাজনীতির প্রতি স্পষ্ট পক্ষপাতিত্বের ছাপ দেখতে পাওয়া যায়। বর্তমান লেখকের মনে প্রশ্ন জাগে, এ ধরনের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই কি তবে বইটিকে ইন্টারনেট জগৎ থেকে পরিকল্পিতভাবে উধাও করে দেওয়া হলো? বাংলা একাডেমির সাহিত্য পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রাবন্ধিক ও গবেষক মোরশেদ শফিউল হাসানের সঙ্গে গত বছর রোকাইয়া জাফরীকে নিয়ে অনলাইনে একটি পোস্টের সুবাদে লেখকের আলাপ হয়েছিল। সেই কথোপকথনে গবেষক মহোদয়ও রোকাইয়া জাফরী সম্পর্কে বেশ কিছু ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক গোপনীয় তথ্য প্রদান করেছিলেন।
রোকাইয়া জাফরীর এই বিরল গ্রন্থটি নিয়ে নতুন করে আলোচনার অবতারণা করার মূল কারণ হলো, লেখিকা স্বয়ং এবং তাঁর সৃজনশীল এই কাজটি বর্তমানে প্রায় হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। নিজের ‘লেনিনের দেশে লালনের মেয়ে’ গ্রন্থ রচনা কালে রোকাইয়া জাফরী দাবি করেছিলেন যে তিনি একই সঙ্গে বাউল সাধক লালনের ভাবাদর্শের একনিষ্ঠ শিষ্যা এবং বিপ্লবী লেনিনের আদর্শের প্রতিও গভীর শ্রদ্ধাশীল। বইটির পাতায় পাতায় তিনি উল্লেখ করেছেন যে সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থাই হলো সর্বাপেক্ষা উন্নত এবং মানবতাবাদী।
লেখিকার মতে, ঠিক এ রকমই এক উদার মানবতাবাদী সমাজের কথাই তার গানে ও দর্শনে বলে গেছেন সাধক লালন। অথচ অবাক করার বিষয় হলো, বাস্তব জীবনে রোকাইয়া জাফরী আজীবন ডানপন্থী রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিলেন এবং বিলাসবহুল ভোগবিলাসে নিজের জীবন কাটিয়ে দিয়েছিলেন। এরপরেও নিজের আত্মপরিচয় দিতে গিয়ে তিনি এই ভ্রমণ বইটিতে নিজেকে গর্বের সঙ্গে ‘লালনকন্যা’ হিসেবেই অভিহিত করেছেন, যা তাঁর মানসিকতার এক ভিন্ন দ্বান্দ্বিক রূপ ফুটিয়ে তোলে।
সোভিয়েত ইউনিয়ন সফরের সেই বহুল আকাঙ্ক্ষিত নিমন্ত্রণ পাওয়ার রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে জাফরী তাঁর বইটিতে লিখেছেন যে, বিড়ালের ভাগ্যেও এভাবেই মাঝে মাঝে শিকে ছিঁড়ে যায়। বিমানে ওড়ার সময় মায়ের কোলে থাকা কোনো শিশু যখন চাঁদের সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হয়ে তা ধরার জন্য ছোট্ট হাত দুটো বাড়িয়ে দেয়, তখন শিশুর সেই মধুর ও অবুঝ অজ্ঞতা দেখে আমরা মনে মনে মৃদু হাসি। আজ বিনম্র শ্রদ্ধার সঙ্গে এই সত্য স্বীকার করতেই হচ্ছে যে, অদূর ভবিষ্যতে হয়তো চাঁদ আর মানুষের হাতের নাগালের সম্পূর্ণ বাইরে থাকবে না।
সে যুগের সবথেকে বড় কৃতিত্ব হলো এটি বহু দূরকে মানুষের নিকটবর্তী করে দিয়েছে এবং আকাশ ও মাটির মধ্যকার ব্যবধান চিরতরে মুছে দিয়েছে, যার ফলে আকাশের সঙ্গে মাটির এই অবিরাম কোলাকুলি লেগেই আছে। টানা প্রায় দুই ঘণ্টা সময় ধরে একই রকমভাবে উড়োজাহাজটি ভাসমান মেঘের ওপর দিয়ে আপন গতিতে উড়ে চলল। যাত্রাপথে মাঝে মাঝে মনে হলো সূর্য যেন মেঘের আড়ালে নিজের মুখ লুকিয়ে ফেলছে, যা দেখতে অবিকল মনে হয় কোনো নববধূর সখীদের দুষ্টু হাসির মুখে লজ্জায় রাঙা মুখখানি শাড়ির আঁচলে লুকিয়ে ফেলার মতো।
রোকাইয়া জাফরী তাঁর বইটিতে বারংবার নিজেকে লালনের ভাবাদর্শের অনুসারী দাবি করলেও তিনি যে আদতে একজন উচ্চবিত্ত বা ‘এলিট’ শ্রেণির প্রতিনিধি ছিলেন এবং জীবনের কোনো পর্যায়েই উপেক্ষা কিংবা অবহেলা সহ্য করতে পারতেন না, সে কথাটি জানাতেও এতটুকু কুণ্ঠাবোধ করেননি। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিভিন্ন বড় বড় শিল্পকারখানা সরাসরি পরিদর্শন করার সময় লেখিকা গভীর আবেগ ও ভালোবাসায় আপ্লুত হয়ে লিখেছিলেন যে, শুধুমাত্র উপযুক্ত সুযোগ ও পরিবেশের অভাবে কত তাজা মুকুল ঝরে যায় এবং কত সম্ভাবনাময় ফুল শেষ পর্যন্ত প্রস্ফুটিত হতে পারে না, তা ভাবলে মন সত্যি বিষণ্নতায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে।
বাইরে তখন অবিরাম গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি ঝরে চলেছে এবং রাশিয়ায় পা রাখার পর থেকে এ পর্যন্ত তিনি সূর্যের আসল চেহারাটা একবারের জন্যও দেখতে পাননি, যা তাঁর কাছে অন্যরকম এক ভিন্ন সৌন্দর্যের রূপ বলে মনে হয়েছে। চারপাশের আকাশ যেন সর্বদাই কান্নায় ভিজে ভারী হয়ে আছে এবং পার্কের নিঝুম পাতার ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় রাতের স্বাভাবিক নির্জনতায় নিওন বাতির মোহনীয় মাদকতার সঙ্গে ফোয়ারা থেকে ছিটকে পড়া পানির ঝিরঝির শব্দ মিলে এক মায়াবী পরিবেশের জন্ম দিয়েছিল। সুদূর অতীতে ফেলে আসা সেই ছোটবেলার নানি-দাদির মুখে শোনা কোনো রূপকথার পরীরাজ্যের গল্প হঠাৎ করেই তাঁর মানসপটে ভেসে ওঠে এবং তাঁর মনে হয়েছিল লালনের কন্যা হিসেবে লেনিনের দেশে আসার সৌভাগ্য তাঁর কম হয়নি। তবে বারংবার নিজেকে লালনের সন্তান বলে জাহির করলেও বইটির অন্য একটি অংশে ভারতের প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা ও বিশৃঙ্খলার চিত্র ফুটিয়ে তুলতে গিয়ে তিনি নিজের অভিজাত মেজাজের পরিচয় দিতে একটুও ভোলেননি।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর