নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট দিনক্ষণ নির্ধারিত না হলেও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কাউন্সিলর পদে তাদের নির্বাচনী প্রস্তুতি এগিয়ে রাখছে। রাজধানীর দুই সিটিতে মোট ১২৯টি ওয়ার্ড রয়েছে, যার মধ্যে ১১২টিতে দলটির অভ্যন্তরীণ বৈঠকের মাধ্যমে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম প্রকাশ করা হয়েছে। এসব প্রার্থী বর্তমানে নিজ নিজ ওয়ার্ডে জনসংযোগ চালাচ্ছেন, স্থানীয় জনগণের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন এবং বিভিন্ন ধরনের সামাজিক উদ্যোগে সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছেন।
দলীয় অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অন্তর্ভুক্ত ৫৪টি ওয়ার্ডের মধ্যে ইতিমধ্যে ৪৩টিতে এবং দক্ষিণ সিটির ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৬৯টিতে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাকি ১৭টি ওয়ার্ডে প্রার্থী নির্বাচনের প্রক্রিয়া এখনো চলমান রয়েছে। তবে দলটির পক্ষ থেকে নাম ঘোষণা করা হলেও এসব প্রার্থীর মনোনয়ন এখনো চূড়ান্ত রূপ লাভ করেনি।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি দেশের স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল জামায়াতে ইসলামীর। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকেই দলটি স্থানীয় সরকার নির্বাচন দ্রুত আয়োজনের জোরালো দাবি জানিয়ে আসছিল। তবে জাতীয় সংসদের আগেই সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হওয়ায় জামায়াতের সেই নির্বাচনী প্রস্তুতি থমকে থাকেনি।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গে সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে বিভিন্ন সময়ে নানা কথা বলা হলেও সিটি করপোরেশন নির্বাচনের কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সূচি এখনো স্পষ্ট করেনি নির্বাচন কমিশন।
গত ১২ অক্টোবর নির্বাচন কমিশন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের পাঁচটি ধাপে ভোট গ্রহণের সময়সূচি চূড়ান্ত করেছে। ইসির ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, প্রথম ধাপের ভোট আগামী বছরের ২১ জানুয়ারি, দ্বিতীয় ধাপে ৪ ফেব্রুয়ারি, তৃতীয় ধাপে ২৯ এপ্রিল, চতুর্থ ধাপে ১৩ মে এবং পঞ্চম ও শেষ ধাপে আগামী ২৭ মে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। অথচ সিটি করপোরেশন নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে কমিশন এখনো কোনো ধরনের তারিখ ঘোষণা করেনি।
কাউন্সিলর পদের পাশাপাশি ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মেয়র পদেও শক্তিশালী সম্ভাব্য প্রার্থী ঠিক করে রেখেছে জামায়াত। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটিতে দলের মহানগর শাখার আমির ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন এবং দক্ষিণ সিটিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সাবেক সহসভাপতি (ভিপি) মো. আবু সাদিক (সাদিক কায়েম) সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে ময়দানে কাজ করে যাচ্ছেন।
সংগঠনের দায়িত্বশীল বৈঠকে তাঁদের প্রার্থী হিসেবে নাম উল্লেখ করা হলেও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে তা ঘোষণা করা হয়নি। তবে সম্প্রতি আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান তাঁদের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে উপস্থিত সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন।
দলের বিভিন্ন স্তরের দায়িত্বশীল নেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য কাউন্সিলর পদপ্রার্থীদেরও নিজ নিজ ওয়ার্ডে সাংগঠনিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তাঁদের অনেকেই নিজেদের কাউন্সিলর প্রার্থী হিসেবে উল্লেখ করে বিভিন্ন এলাকায় ব্যানার ও ফেস্টুন সাঁটিয়েছে। বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার সময়ও তাঁদের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
ঢাকা মহানগর উত্তর জামায়াতের সূত্র জানায়, উত্তরের ৯, ১০, ১২, ৩৫, ৩৮, ৩৯, ৪১, ৪২, ৪৩, ৪৪ এবং ৫০ নম্বর ওয়ার্ডে এখনো কোনো সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়নি। এসব নির্দিষ্ট ওয়ার্ডে আরও চুলচেরা বিশ্লেষণ ও যাচাই-বাছাই করে প্রার্থী নির্বাচন করা হবে। অন্যদিকে, ঢাকা দক্ষিণ সিটির ৮, ১৫, ৪০, ৪৩, ৪৫ এবং ৬৪ নম্বর ওয়ার্ডেও প্রার্থী বাছাইয়ের প্রক্রিয়া এখনো চলমান রয়েছে।
ঢাকা উত্তর সিটির ২৬ নম্বর ওয়ার্ডে সম্ভাব্য কাউন্সিলর প্রার্থী হিসেবে নিয়মিত প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন নোমান আহমদী। কারওয়ান বাজার, কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউ, গ্রিন রোড, তেজতুরী বাজারের পূর্ব ও পশ্চিম অংশ, স্টেশন রোড এবং তেজকুনিপাড়া এলাকা নিয়ে এই ওয়ার্ড গঠিত। নোমান আহমদী ঢাকা মহানগর জামায়াতের শুরা ও কর্মপরিষদ সদস্য এবং তেজগাঁও থানা জামায়াতের আমির হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
গত ১৩ অক্টোবর প্রথম আলোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নোমান আহমদী জানান, প্রায় দুই বছর আগে কাউন্সিলর প্রার্থী হিসেবে তাঁর নাম ঘোষণা করা হয়েছিল। এরপর থেকেই প্রচারের অংশ হিসেবে ব্যানার ও ফেস্টুন লাগানো, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া এবং দৈনিক নামাজের পর স্থানীয় ভোটার ও বাসিন্দাদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করে চলেছেন তিনি।
তবে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করা হলেও তা যে চূড়ান্ত নয়, সে বিষয়ে স্পষ্ট করে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর উত্তরের নেতারা। মহানগর উত্তর জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি ইয়াসিন আরাফাত গত ১৩ অক্টোবর প্রথম আলোকে বলেন, এখন পর্যন্ত কোনো প্রার্থীকেই চূড়ান্ত করা হয়নি। যাঁদের নিজ নিজ ওয়ার্ডে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তাঁদের মধ্য থেকে পারফরম্যান্স বা অন্য কারণে কারও কারও নাম বাদও পড়তে পারে। সেখানে প্রয়োজনে নতুন বিকল্প প্রার্থী দেওয়া হবে।
বেইলি রোড, ইস্কাটন, মন্ত্রিপাড়া, বাংলামোটর, সিদ্ধেশ্বরী, পশ্চিম মালিবাগ, কাকরাইল, মিন্টো রোড এবং সেগুনবাগিচার কিছু অংশ নিয়ে গঠিত ঢাকা দক্ষিণ সিটির ১৯ নম্বর ওয়ার্ড। এই এলাকায় সম্ভাব্য কাউন্সিলর প্রার্থী হিসেবে মাঠে কাজ করছেন আবদুস সাত্তার সুমন। তিনি ঢাকা দক্ষিণ জামায়াতের শুরা সদস্য ও সহপ্রচার সম্পাদকের দায়িত্বে রয়েছেন।
আবদুস সাত্তার প্রথম আলোকে বলেন, প্রার্থী হিসেবে নাম ঘোষণার পর থেকেই তিনি এলাকার গণ্যমান্য ও স্থানীয় নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করছেন, সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে কুশলবিনিময় চালিয়ে যাচ্ছেন এবং বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছেন। এ ছাড়া তিনি নিজ উদ্যোগে ফ্রি মেডিক্যাল ক্যাম্প ও মশকনিধন কার্যক্রমের মতো জনকল্যাণমূলক নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। স্থানীয় সাধারণ মানুষ যেসব সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন, সেগুলো সমাধানেরও আন্তরিক চেষ্টা চালাচ্ছেন তিনি।
জামায়াতের প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এহসানুল মাহবুব জুবায়ের গত ১৫ অক্টোবর প্রথম আলোকে জানান, ঢাকার দুই সিটির মেয়র পদের প্রার্থীদের নাম দলীয় কেন্দ্র থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে। তবে কাউন্সিলর পদপ্রার্থীদের নাম ঘোষণা করবে সংশ্লিষ্ট মহানগর শাখা। তিনি আরও জানান, নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য মহানগর পর্যায়ে সম্পূর্ণ আলাদা একটি কমিটি রয়েছে। সেই কমিটি এখনো প্রার্থীদের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেনি, তবে সম্ভাব্য প্রার্থীদের মাঠে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং তাঁরা সে অনুযায়ী কাজ করে যাচ্ছেন।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর