নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
একান্ত অবসরে হেডফোনে কোনো জনপ্রিয় সুরের আবেশে মজে যাওয়ার অভিজ্ঞতা সবারই আছে। কিন্তু ওই সুর বা বাণীর পেছনের কারিগর কোনো রক্তমাংসের মানুষ নয়, বরং একটি মেমোরি চিপ এবং বিশেষ কিছু গাণিতিক কোড—এমন ভাবনা কিছুটা বিস্ময় জাগাতে বাধ্য। শিল্প-সাহিত্য কিংবা সুর সৃষ্টির মতো সৃজনশীল কাজ কেবল মানুষের আবেগপ্রবণ হৃদয়েরই সৃষ্টি, এমন প্রথাগত ধারণায় বড়সড় নাড়া দিয়েছে সাম্প্রতিক প্রযুক্তির অগ্রগতি। বিজ্ঞানের পরিভাষায় এই নতুন ধারাকে জেনারেটিভ অডিও এআই নামে অভিহিত করা হচ্ছে।
বর্তমানে সুনো কিংবা উদোর মতো বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম বিস্ময়কর সব কাণ্ড ঘটিয়ে চলেছে। কম্পিউটারের স্ক্রিনে শুধু কিছু নির্দেশ লিখে দিলেই নিমিষেই আস্ত একটা গান তৈরি হয়ে যাচ্ছে। যেমন, বৃষ্টির দিনের বিষণ্নতা ফুটিয়ে তোলার অনুরোধ জানিয়ে সঙ্গে অ্যাকোস্টিক গিটার ও বাঁশির ব্যবহার চাইলে দুই থেকে তিন মিনিটের মধ্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি নতুন গান চলে আসে। শুধু বাদ্যযন্ত্রের সংমিশ্রণই নয়, তাতে থাকে মনজুড়ানো কথামালা, নির্দিষ্ট ছন্দ এবং কোনো কাল্পনিক কণ্ঠশিল্পীর নিখুঁত গাওয়া গলার সুর। এমনকি গাওয়ার সময় কোথায় শিল্পীর দম নেওয়ার প্রয়োজন কিংবা কোথায় স্বর কেঁপে উঠবে, তা এমন নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলে যে বোঝার উপায় থাকে না এটি কোনো যন্ত্রের তৈরি।
যন্ত্রের মাধ্যমে এমন মানবিক অনুভূতির প্রকাশ ঘটানোর নেপথ্যে কাজ করছে মূলত গণিত এবং নিখুঁত প্যাটার্ন অনুধাবনের অবিশ্বাস্য ক্ষমতা। কোনো ধরনের খাতা কলম ছাড়াই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তার কাজ চালিয়ে যায়, কারণ এর পেছনে রয়েছে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি গান শোনানোর দীর্ঘ প্রশিক্ষণ। এই প্রযুক্তির ভেতরে কাজ করা নিউরাল নেটওয়ার্ক বিপুল পরিমাণ সংগীত বিশ্লেষণ করে বুঝতে পারে কোন সুরের পর কোন নোট বসালে তা শ্রোতার কানে মধুর লাগবে। বিষণ্নতার সুরের সঙ্গে ড্রামসের বিট কেমন হওয়া বা আনন্দের আবহে কর্ড কীভাবে পরিবর্তন করা দরকার, তা সে খুব সহজেই বুঝে নেয়।
তবে এই প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসারের পর বিশ্বজুড়ে শিল্পী ও গবেষকদের মনে একটি বড় প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে যে যন্ত্র খুব দ্রুত গান তৈরি করলে মানবীয় সুরের মূল্যায়ন কি হারিয়ে যাবে। একটু গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এই শঙ্কা পুরোপুরি সঠিক নয়। প্রযুক্তি অসংখ্য সুরের বিন্যাস ঘটাতে পারলেও তার ভেতরে কোনো ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বা সত্যিকার অনুভূতি থাকে না। মানুষ যখন ব্যক্তিগত জীবনের কোনো প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি কিংবা সামাজিক অসঙ্গতির বিরুদ্ধে সুর তোলে, তখন তার পেছনে থাকে জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা। যন্ত্র কেবল সেই রূপের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে পারে, কিন্তু মানুষের ভেতরের খাঁটি আবেগের জোগান সে দিতে পারে না।
এ কারণে অনেক উদীয়মান সুরকার এই প্রযুক্তিকে প্রতিদ্বন্দ্বী না ভেবে বরং নিজেদের কাজের সঙ্গী হিসেবে বেছে নিচ্ছেন। মাথায় নতুন কোনো ভাবনা এলে তা দিয়ে দ্রুত একটি প্রাথমিক খসড়া বা ডেমো বানিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এরপর নিজস্ব মেধা ও অনুভূতি মিশিয়ে সেটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলছেন তাঁরা। প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের পরিধি কেবল গবেষণাগারে সীমাবদ্ধ নেই, তা আজ সংস্কৃতির ভেতরেও নিজের জায়গা করে নিয়েছে। যন্ত্র আমাদের দ্রুত কাজ করার উপায় বাতলে দিলেও তাতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করার কাজটি কেবল মানুষের পক্ষেই সম্ভব। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হয়তো হাজারো সুরের জোগান দিতে পারবে, কিন্তু কোনটি মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী দাগ কাটবে সেই অনুভূতি মানুষেরই অধিকারে থাকবে।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর