নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
স্মার্টফোনে ডিজিটাল জালিয়াতি প্রতিরোধ করতে অ্যান্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেম ও গুগল মেসেজেস প্ল্যাটফর্মে অত্যাধুনিক কিছু নিরাপত্তাগত ফিচার নিয়ে আসছে প্রযুক্তি জায়ান্ট গুগল। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির সহায়তায় ক্ষতিকর ও প্রতারণামূলক টেক্সট মেসেজ শনাক্ত করার পাশাপাশি ডিভাইস স্ক্রিন শেয়ারিংয়ের সময় ব্যবহারকারীর গোপন পাসওয়ার্ড, বিভিন্ন লগইন ক্রেডেনশিয়াল এবং ব্যাংক বা আর্থিক লেনদেনের সংবেদনশীল বিবরণগুলো সম্পূর্ণ সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হবে। পাশাপাশি, গ্রাহকের অলক্ষ্যে মোবাইল ফোনের কল ফরোয়ার্ডিং ফিচারটি সচল করে সাইবার অপরাধের পথ বন্ধ করতেও কড়াকড়ি আরোপ করছে এই নতুন প্রযুক্তিগত সুরক্ষা বলয়।
ডিজিটাল যুগে প্রতারণার নিত্যনতুন কৌশল মোকাবিলা করতে অ্যান্ড্রয়েড প্ল্যাটফর্মে আগে থেকেই কিছু সুরক্ষা টুল চালু রয়েছে, কিন্তু জালিয়াতির ধরন প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হওয়ায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরালো করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে গুগল। সম্প্রতি উন্মুক্ত করা এই ঘোষণা অনুযায়ী, গুগল মেসেজেস অ্যাপটিতে যুক্ত হচ্ছে একটি অপশনাল বা ঐচ্ছিক নিরাপত্তা ফিচার যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘এনহ্যান্সড প্রটেকশন’। এর মাধ্যমে সাধারণ বা গতানুগতিক উপায়ে ধরা যায় না এমন জটিল জালিয়াতির ফাঁদগুলোও অনায়াসে চিহ্নিত করা যাবে।
এই কাজে ক্লাউড সার্ভারে থাকা গুগলের অত্যন্ত শক্তিশালী জেমিনাই এআই মডেল ব্যবহার করা হচ্ছে, যা যেকোনো বার্তার মূল বিষয়বস্তু ও প্রেরকের অসৎ উদ্দেশ্য চুলচেরা বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য বিপদ আগে থেকেই বুঝতে পারে। এর ফলে কোনো ব্যবহারকারী সন্দেহজনক টেক্সট মেসেজের ফাঁদে পড়ার আগেই সতর্কবার্তা পেয়ে যাবেন। তথ্য বিশ্লেষণের এই পুরো প্রক্রিয়ায় ব্যবহারকারীর গোপনীয়তা বজায় রাখতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং গুগল জানিয়েছে যে এতে ‘প্রাইভেট এআই কম্পিউট’ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে।
এই বিশেষ প্রযুক্তির মাধ্যমেই সমস্ত ডেটা এনক্রিপ্ট করে একটি সম্পূর্ণ সুরক্ষিত পরিবেশে এআই দিয়ে যাচাই করা হয়, যেখানে খোদ গুগলের পক্ষেও ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্যে কোনো ধরনের প্রবেশাধিকার থাকে না। এর ফলে তথ্য গোপন রেখে নিখুঁতভাবে প্রতারণা শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে। একই সঙ্গে, গুগল মেসেজেসের ভেতরে অপরিচিত বা সন্দেহজনক লিংক যাচাই করার প্রক্রিয়াটিকেও আরও উন্নত করা হয়েছে, যেখানে জেমিনি ন্যানো মডেল ইন্টারনেটের লাইভ সিকিউরিটি সিগন্যাল বিশ্লেষণ করে লিংকের ঝুঁকি নির্ণয় করে।
ফলে কোনো ক্ষতিকর ওয়েবসাইটের লিংকে ক্লিক করার আগেই ব্যবহারকারী মারাত্মক ঝুঁকি থেকে সতর্ক হওয়ার সুযোগ পাবেন। কেবল মেসেজিং অ্যাপের গণ্ডির ভেতরেই এই সুরক্ষা সীমাবদ্ধ রাখছে না গুগল, বরং ফোনের নোটিফিকেশন বারেও সন্দেহজনক টেক্সট নিয়ে অ্যালার্ট দেখানোর পরিধি ব্যাপক আকারে বাড়ানো হচ্ছে। অতীতে এই সুবিধাটি কেবল গুগলের নিজস্ব পিক্সেল ব্রান্ডের স্মার্টফোনেই সীমাবদ্ধ ছিল।
তবে বর্তমান উদ্যোগের ফলে এখন থেকে অনার, ইনফিনিক্স, আইটেল, মটোরোলা, অপো, ওয়ানপ্লাস, রিয়েলমি, টেকনো, ভিভো এবং শাওমি সহ বাজারে প্রচলিত বিভিন্ন ব্র্যান্ডের অ্যান্ড্রয়েড ডিভাইসেও এই সুবিধাটি কার্যকর করা হবে। এর ফলে কোনো ব্যবহারকারীকে মেসেজিং অ্যাপে প্রবেশ না করেই ফোনের নোটিফিকেশন থেকেই কোনো বার্তা ঝুঁকিপূর্ণ কি না তা বুঝতে পারবেন।
গুগলের সদ্য ঘোষিত ফিচারগুলোর মধ্যে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি সংযোজন হলো স্ক্রিন শেয়ারিং চলাকালীন ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল তথ্য ঢেকে রাখা বা লুকিয়ে ফেলা। অ্যান্ড্রয়েডে এর আগে থেকেই স্ক্রিন শেয়ার করার সময় নির্দিষ্ট কিছু তথ্য নিরাপদ রাখার প্রাথমিক ব্যবস্থা ছিল। বর্তমান আপডেটটির মাধ্যমে সেই সুরক্ষা বলয়টিকে গুগল ক্রোম ব্রাউজার এবং অ্যান্ড্রয়েড ওয়েবভিউ পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হয়েছে।
নতুন এই প্রযুক্তির কল্যাণে স্ক্রিন শেয়ার চালু থাকা অবস্থায় ব্যবহারকারীর পাসওয়ার্ড, লগইন তথ্য এবং পেমেন্ট সংক্রান্ত যাবতীয় গোপনীয় বিবরণ সয়ংক্রিয়ভাবে অদৃশ্য বা আড়াল থাকবে। সাইবার অপরাধীরা প্রায়ই সাধারণ গ্রাহকদের নানা কৌশলে স্ক্রিন শেয়ার করতে রাজি করায় এবং পরে ব্যাংকিং অ্যাপ বা ওয়েবসাইট ব্রাউজ করিয়ে গোপন সব তথ্য হাতিয়ে নেয়। গুগলের নতুন এই উদ্ভাবন এ ধরনের জালিয়াতির ঝুঁকি উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে দেবে।
অন্যদিকে, মোবাইল ফোনের কল ফরোয়ার্ডিং অপশনের অপব্যবহার করে সংঘটিত প্রতারণা ঠেকাতে অ্যান্ড্রয়েড নতুন কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। অনেক সময় স্ক্যামাররা গ্রাহকের অজ্ঞাতে বা ব্যাকগ্রাউন্ডে ফোনের কল ফরোয়ার্ডিং চালু করে দেয়, যার ফলে ব্যবহারকারীর ফোনে আসা গুরুত্বপূর্ণ কল এবং একবার ব্যবহারযোগ্য ওটিপি বা ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড অন্য কোনো নাম্বারে চলে যায়। নতুন সুরক্ষা ব্যবস্থার ফলে কোনো থার্ড-পার্টি অ্যাপ ব্যবহারকারীর অজান্তে ব্যাকগ্রাউন্ডে কল ফরোয়ার্ডিং অ্যাক্টিভেট করতে পারবে না।
তাছাড়া, ফোনের ডায়াল প্যাডে কোনো বিশেষ এমএমআই কোড টাইপ করে কল ফরোয়ার্ডিং চালুর অপচেষ্টা করা হলে অ্যান্ড্রয়েড সিস্টেম নিজেই সম্ভাব্য বড় ধরনের ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্কবার্তা প্রদর্শন করবে। এর ফলে সাধারণ মানুষ কোনো প্রতারকের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে অসাবধানতাবশত এ ধরনের কোড ব্যবহার করার আগেই সাবধান হওয়ার সুযোগ পাবেন।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর