ঢাকা | বঙ্গাব্দ

এক জেনারেলের চোখে ১৯৭৫ সালের ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বরের নাটকীয়তা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Nov 7, 2026 ইং
এক জেনারেলের চোখে ১৯৭৫ সালের ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বরের নাটকীয়তা ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর তারিখটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অত্যন্ত নাটকীয় ও সুদূরপ্রসারী পরিবর্তনের একটি দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। সিপাহি ও জনতার সম্মিলিত অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক বিরাট রূপান্তর সাধিত হয়েছিল। সেসময়ের একজন প্রত্যক্ষ ও গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী তাঁর ‘এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য: স্বাধীনতার প্রথম দশক (১৯৭১-১৯৮১)’ নামক গ্রন্থে এই ঘটনাবহুল দিনটির পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা তুলে ধরেছেন। সেই ঐতিহাসিক দলিল থেকেই উল্লেখযোগ্য বিবরণ এখানে নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপন করা হলো।

রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সায়েমের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হওয়ার পরপরই লেখক দ্রুত আর্মি হেডকোয়ার্টারে ফিরে আসেন। সেখানে পৌঁছানোর পর তিনি তাঁর অধিনস্ত অফিসারদের সঙ্গে দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনায় বসেন। মূলত ৩ থেকে নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে কার্যকর কোনো সরকার ছিল না বললেই চলে এবং সেনাবাহিনীর মধ্যেও দৈনন্দিন কোনো কার্যক্রম চলেনি। পুরো সেনা সদরে এক ধরনের অচলাবস্থা বিরাজ করার পাশাপাশি পুরো সেনানিবাসের পরিবেশ ছিল অত্যন্ত অস্বাভাবিক ও থমথমে। সেখানে কেউ কোনো দাপ্তরিক কাজ না করে এদিক-সেদিক জটলা পাকিয়ে শুধু আলাপ-আলোচনা করেই সময় কাটাচ্ছিলেন।

অফিসের কাজকর্ম শেষে সবাই যখন চলে যান, তখন লেখকের দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত সহকারী সুবেদার আলিমুদ্দিন তাঁর সামনে একটি বাংলা প্রচারপত্র উপস্থাপন করেন। তিনি জানান যে এই প্রচারপত্রটি সেনানিবাসের বিভিন্ন স্থানে প্রচুর পরিমাণে বিলি করা হয়েছে। ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’র ব্যানারে মুদ্রিত এই প্রচারপত্রে বেশ কিছু উত্তেজক দাবি উত্থাপন করা হয়েছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি দাবির মধ্যে ছিল সেনাবাহিনীতে কোনো কর্মকর্তা বা অফিসার রাখা যাবে না, কারণ অফিসাররা সৈনিকদের নিজেদের ক্ষমতা অর্জনের স্বার্থে ব্যবহার করে থাকেন। এছাড়া সৈনিকদের জন্য অফিসারদের ‘ব্যাটমেন’ প্রথা চিরতরে বন্ধ করার মতো বিষয়গুলোও সেই প্রচারপত্রে অন্তর্ভুক্ত ছিল। অবসরপ্রাপ্ত সৈনিকেরাই মূলত এই প্রচারপত্রগুলো বিলি করছেন বলে তাঁকে অবহিত করা হয়।

বিকেলবেলা শারীরিক দুর্বলতা ও চরম ক্লান্তিবোধ করায় লেখক নিজ বাসভবনে ফিরে আসেন এবং এরপর আর বাড়ি থেকে বের হননি। কিন্তু মধ্যরাতের পর হঠাৎ করেই চারদিক থেকে প্রচণ্ড গোলাগুলির বিকট শব্দ তাঁর কানে ভেসে আসে। বর্তমান এয়ারপোর্ট রোডের পার্শ্ববর্তী অর্ডন্যান্স ডিপো থেকে এই গোলাগুলি সর্বপ্রথম শুরু হয় এবং পরবর্তীতে গ্যারিসন মসজিদের নিকট অবস্থিত সিগনাল ইউনিট থেকেও একই রকম শব্দ শোনা যায়। তিনি তৎক্ষণাৎ বিছানা ছেড়ে ইউনিফর্ম পরিধান করেন এবং বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি নেন। তবে তাঁর নিরাপত্তায় নিয়োজিত গার্ডরা রাতের এই চরম অন্ধকারের মধ্যে গোলাগুলির মুখে বাইরে যেতে কঠোরভাবে নিষেধ করেন এবং তাঁকে ঘরের ভেতরেই অবস্থান করার অনুরোধ জানান।

ঠিক সেই মুহূর্তে বিগত কয়েক দিন ধরে সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকা তাঁর বাসার টেলিফোনটি হঠাৎ সচল হয়ে বেজে ওঠে। সিগনাল সেন্টার থেকে ফোন করে তাঁকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয় যে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের বিরুদ্ধে একটি পাল্টা অভ্যুত্থান ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। এই সংবাদ পাওয়ার পর তিনি বাড়ির বারান্দায় এসে দেখতে পান যে কালো, খাকি এবং কিছু বেসামরিক পোশাকে সজ্জিত প্রায় শখানেক মানুষ আকাশ লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে ছুড়তে ‘জিয়াউর রহমান জিন্দাবাদ’ স্লোগান দিতে দিতে জেনারেল জিয়ার বাসার দিকে প্রবেশ করছে। তিনি নিজ চোখে জিয়াকে তাঁর সেই বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে পার্শ্ববর্তী দ্বিতীয় ফিল্ড আর্টিলারি ইউনিটের ভেতর নিয়ে যেতে দেখেন। সেই সময় জেনারেল জিয়ার পরিধানে ছিল একটি সাধারণ সাদা রঙের পাঞ্জাবি ও পায়জামা।

এর কিছু সময় পর একটি বেসামরিক জিপগাড়িতে চড়ে দুই-তিনজন ব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়ে অবসরপ্রাপ্ত লে. কর্নেল তাহের সেখানে এসে উপস্থিত হন। লে. কর্নেল তাহের আগস্ট মাসে মেজর মঞ্জুর ও জিয়াউদ্দিনের সঙ্গে পাকিস্তান থেকে পালিয়ে এসে মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে জিয়ার অধীনে সরাসরি যোগদান করেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি একটি সেক্টরের কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন এবং যুদ্ধের একপর্যায়ে গুরুতর আহত হন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি কিছুকাল সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন এবং চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর তৎকালীন সময়ে অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সংস্থায় চাকরি করছিলেন। সেখানে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই তিনি জেনারেল জিয়াকে দ্রুত রেডিও স্টেশনে যাওয়ার জন্য অনুরোধ জানান। তবে উপস্থিত অনেকেই তখন জিয়াকে রেডিও স্টেশনে যাওয়ার ব্যাপারে নিষেধ করতে থাকেন।

ঠিক তখনই লেখকের বাসার টেলিফোনটি পুনরায় বেজে ওঠে। চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের তৎকালীন সিও এবং বর্তমানের অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার লে. কর্নেল আমিনুল হক তাঁকে ফোনে জানান যে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের বিরুদ্ধে পাল্টা অভ্যুত্থানের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। উল্লেখ্য, ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের পর আমিনুল হককে চতুর্থ বেঙ্গলের অধিনায়কের পদ থেকে অপসারিত করে আর্মি হেডকোয়ার্টারে অ্যাটাচ করে রাখা হয়েছিল। এদিকে অভ্যুত্থানের সার্বিক গতিপ্রকৃতি বা সুনির্দিষ্টভাবে কোথায় কী ধরনের ঘটনা ঘটছে, তা তখনো সঠিকভাবে বুঝে ওঠা কারোর পক্ষেই সম্ভব হচ্ছিল না।

ভোরবেলা হঠাৎ করেই তিন-চারজন লোক তাঁর বাসায় জোরপূর্বক প্রবেশের চেষ্টা চালায়, তবে প্রহরীরা প্রধান গেটে তাদের বাধা দেন। তাঁরা জানান যে জিয়ার বাসসংলগ্ন দ্বিতীয় ফিল্ড আর্টিলারি ইউনিটে লেখকের উপস্থিত হওয়ার জন্য জেনারেল জিয়া বিশেষভাবে খবর পাঠিয়েছেন। এর কিছুক্ষণ পর বেসামরিক পোশাকে চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের লেফটেন্যান্ট মুনীর লেখকের বাসভবনে এসে উপস্থিত হন। এই লেফটেন্যান্ট মুনীর ছিলেন মরহুম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনের জামাতা এবং বর্তমানে তিনি অবসরপ্রাপ্ত লে. কর্নেল হিসেবে পরিচিত। তিনি লেখককে সমস্ত বিস্তারিত তথ্য জানান এবং জিয়া অবিলম্বে তাঁকে দ্বিতীয় ফিল্ড আর্টিলারি ইউনিটে যাওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন বলে বার্তা দেন। মুনীর আরও জানান যে ব্রিগেডিয়ার মীর শওকত আলীকে ধরে নিয়ে আসার জন্যও আর্মি ভিআইপি রুমে লোক পাঠানো হয়েছে। ব্রিগেডিয়ার শওকত মূলত মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফের আহবানে আয়োজিত সভায় অংশ নেওয়ার উদ্দেশ্যেই যশোর থেকে ঢাকায় এসেছিলেন। পরবর্তীতে লেখকের কান পর্যন্ত পৌঁছেছিল যে, মীর শওকত যে ভিআইপি রুমে অবস্থান করছিলেন, সেখানেও ক্ষুব্ধ সৈনিকেরা একপর্যায়ে গুলি চালিয়েছিল। সেখান থেকে বেরিয়ে তিনি কোনোমতে পাশেই তৎকালীন মেজর জেনারেল এরশাদের বাসভবনে গিয়ে নিরাপদ আশ্রয় গ্রহণ করেন এবং পরবর্তীতে সাজাপ্রাপ্ত খুনি মেজর মহিউদ্দীন তাঁকে সেখান থেকে ধরে নিয়ে আসে।

সবশেষে লেখক নিজের ইউনিফর্ম পরে এবং লাঠিতে ভর দিয়ে হেঁটে হেঁটে দ্বিতীয় ফিল্ড আর্টিলারি ইউনিটে গিয়ে পৌঁছান। তাঁর এবং জেনারেল জিয়ার বাসা থেকে মাত্র শদুয়েক গজ দূরে বর্তমান শহীদ সরণির পাশেই দ্বিতীয় ফিল্ড আর্টিলারি ইউনিটটি অবস্থিত ছিল। সেখানে গিয়ে তিনি দেখতে পান যে পুরো এলাকায় এক প্রকার হুলুস্থুল কাণ্ড ও বিশৃঙ্খল পরিবেশ বিরাজ করছে। অফিসের অত্যন্ত ছোট একটি কামরার ভেতরে জেনারেল জিয়া বসে ছিলেন এবং তাঁর সঙ্গে কর্নেল আমিনুল হক, দ্বিতীয় ফিল্ড আর্টিলারি ইউনিটের সুবেদার মেজর আনিসসহ আরও কয়েকজন অফিসার উপস্থিত ছিলেন। এর খানিকবাদে একটি বেসামরিক জিপে করে দুই-তিনজন লোককে সঙ্গে নিয়ে অবসরপ্রাপ্ত লে. কর্নেল তাহের পুনরায় সেখানে এসে উপস্থিত হন। তিনি এসেই আবার জেনারেল জিয়াকে রেডিও স্টেশনে যাওয়ার জন্য তীব্র তাগাদা ও অনুরোধ জানাতে থাকেন। কিন্তু উপস্থিত অন্যরা তখনো জিয়াকে রেডিও স্টেশনে যাওয়ার ব্যাপারে তীব্র নিষেধ করছিলেন। এই অবস্থাকে কেন্দ্র করে লে. কর্নেল আমিনুল হক এবং লে. কর্নেল তাহেরের মধ্যে একটি তুমুল ঝগড়া বা বাকবিতণ্ডা শুরু হয়ে যায়। একপর্যায়ে ক্ষুব্ধ আমিনুল হক তাহেরের উদ্দেশে বলে ওঠেন যে আপনারা অর্থাৎ জাসদ হলো ‘ভারতের বি টিম’। এই মন্তব্যে অত্যন্ত রাগান্বিত হয়ে লে. কর্নেল তাহের তাৎক্ষণিকভাবে সেখান থেকে প্রস্থান করেন।

সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
তারাগঞ্জে অবৈধ সার মজুত, ব্যবসায়ীকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা

তারাগঞ্জে অবৈধ সার মজুত, ব্যবসায়ীকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা