নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
যুক্তরাষ্ট্রের আইনসভার নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে পুনরায় বিজয়ী হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন সোমালিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আসা ইলহান ওমর। মিনেসোটা রাজ্যের মিনিয়াপলিসের ৫ নম্বর সংসদীয় এলাকা থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি মার্কিন কংগ্রেসে নিজের দ্বিতীয় মেয়াদ নিশ্চিত করেছেন।
প্রখ্যাত সংবাদ সংস্থা এপির সরবরাহ করা তথ্য অনুযায়ী, মোট প্রদত্ত ভোটের নিরানব্বই শতাংশ গণনা শেষে এই ফলাফল সামনে এসেছে। বয়স আটত্রিশ বছর পূর্ণ করা ইলহান ওমর এই নির্বাচনী লড়াইয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে পেয়েছিলেন আফ্রিকান বংশোদ্ভূত মার্কিন উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী লেসি জনসনকে, যিনি রিপাবলিকান পার্টির টিকিটে লড়ছিলেন।
নির্বাচনী ফলাফলে দেখা গেছে যে ইলহান ওমর একাই অর্জন করেছেন চৌষট্টি দশমিক ছয় শতাংশ ভোট। অন্যদিকে তাঁর ঠিক পরেই অবস্থান করা রিপাবলিকান প্রার্থী লেসি জনসনের ঝুলিতে গেছে মাত্র পঁচিশ দশমিক নয় শতাংশ ভোট, যা বিজয়ীর চেয়ে বহু পেছনে রয়েছে।
বিজয়ের আনুষ্ঠানিকতা নিশ্চিত হওয়ার পরপরই নিজের ভেরিফাইড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্টে একটি বার্তা প্রকাশ করেন ইলহান। সেখানে তিনি মিনেসোটা অঞ্চলের সকল ভোটারদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে একটি পোস্ট শেয়ার করেন।
ওই পোস্টে তিনি আরও উল্লেখ করেন যে সাধারণ মানুষের এই ‘জনগণের প্রতিনিধি পরিষদে’ আরও একবার এত বিশাল পরিমাণ জনরায় ও সমর্থন নিয়ে এলাকার মানুষের সেবা করার সুযোগ পাওয়া তাঁর জন্য অত্যন্ত সম্মানের বিষয়।
জনগণের উদ্দেশ্যে দেওয়া ওই বার্তার অন্য অংশে ইলহান ওমর দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে লেখেন যে তারা কোনো অবস্থাতেই ডোনাল্ড ট্রাম্পকে তাদের স্বাধীন কণ্ঠস্বর স্তব্ধ বা রোধ করে দিতে দেবেন না।
ইতিহাসের পাতায় মার্কিন কংগ্রেসের প্রথম সোমালীয় বংশোদ্ভূত নাগরিক হিসেবে নাম লিখিয়েছেন ইলহান ওমর। তাছাড়া তিনি ২০১৮ সালের সেই ঐতিহাসিক নির্বাচনে জয়ী প্রথম দুই মুসলিম নারীর একজন হিসেবেও পরিচিত।
আমেরিকান রাজনীতির প্রগতিশীল নারী ডেমোক্রেটিক কংগ্রেস সদস্যদের জনপ্রিয় চার সদস্যের একটি দল রয়েছে, যাকে সাধারণত ‘স্কোয়াড’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। ইলহান ওমর এই প্রভাবশালী দলেরই একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য।
উল্লেখিত চারজন নারী সদস্যের বাকিদের মধ্যে রয়েছেন ডেট্রয়েট অঞ্চলের প্রতিনিধি রাশিদা তালিব, নিউইয়র্ক সিটির জনপ্রিয় মুখ আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্তেজ এবং বোস্টন শহরের আয়ানা প্রেসলি।
এই চারজন তরুণ ও প্রগতিশীল নারী রাজনীতিবিদ বর্তমানে আমেরিকার রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি নতুন উদীয়মান শক্তির প্রতিনিধিত্ব করছেন। তাঁদের হাত ধরেই ডেমোক্রেটিক পার্টির হাউস নেতৃত্ব নতুন ও আধুনিক ধারায় পরিচালিত হচ্ছে।
একসময় সোমালিয়া থেকে শরণার্থী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় নেওয়া ইলহান ২০১৬ সালে মিনেসোটা রাজ্যের আইনসভায় বিজয়ী হন। এরপর থেকেই তিনি ধীরে ধীরে জাতীয় পর্যায়ে নিজের একটি শক্ত রাজনৈতিক পরিচিতি ও অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হন।
আমেরিকান উদারপন্থী বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যুতে ইলহানের অত্যন্ত জোরালো অবস্থান রয়েছে। পাশাপাশি ইসরায়েল রাষ্ট্রের বিরোধিতাকারী নানা মন্তব্য এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি মুখোমুখি হওয়ার সাহসিকতা তাঁকে নিয়মিতভাবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রেখেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট এবং অন্যান্য রিপাবলিকান দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের ধারাবাহিক সমালোচনা ও রাজনৈতিক আক্রমণের কারণে ইলহান ওমর প্রায়শই অবমাননাকর নানা মন্তব্যের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন।
চলতি মাসের আগের এক সময়ে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইলহান ওমরের বিরুদ্ধে তীব্র অবমাননাকর ও আক্রমণাত্মক মন্তব্য করেন। তিনি ইলহানকে মার্কিন নাগরিক নন বলে অভিযোগ তোলেন এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে তাঁকে জোরপূর্বক বের করে দেওয়ার প্রকাশ্যে হুমকি প্রদান করেন।
প্রেসিডেন্টের এই হুমকির ঘটনার ঠিক পরপরই দেশটির আইনশঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে ইলহানের ব্যক্তিগত বাসভবনে তল্লাশি অভিযান চালানো হয়। তবে এই পুরো পরিস্থিতির মুখেও পিছপা হননি ইলহান, বরং তিনি ট্রাম্পের ওই বক্তব্যের অত্যন্ত কড়া ও কঠোর ভাষায় জবাব দেন এবং তাঁকে প্রকাশ্যে ‘বর্ণবাদী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
আন্তর্জাতিক কূটনীতির ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী দেশ সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে মার্কিন প্রশাসনের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কসহ অন্যান্য বৈদেশিক জোটের তীব্র বিরোধিতা করার ক্ষেত্রেও ইলহান অত্যন্ত সোচ্চার ভূমিকা পালন করে আসছেন।
গত বছর বিশিষ্ট সংবাদমাধ্যম আল–জাজিরার কাছে দেওয়া একটি বিশেষ সাক্ষাৎকারে ইলহান ওমর মন্তব্য করেছিলেন যে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে ওয়াশিংটনের যে মৈত্রী রয়েছে, তা সম্পূর্ণ নীতিবিবর্জিত।
তিনি আরও যোগ করেছিলেন যে তাঁর দৃষ্টিতে এটি বিশ্বের অন্যতম অদ্ভুত একটি রাজনৈতিক জোট, যা আমেরিকার কোনো ধরনের মৌলিক মূল্যবোধের সঙ্গেই কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
অন্যদিকে, ইলহান ওমরের বিপরীতে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী রিপাবলিকান প্রার্থী লেসি জনসন মূলত এই প্রথম বারের মতো কংগ্রেসের কোনো নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অভিজ্ঞতা অর্জন করলেন।
বয়সে পঁয়ষট্টি বছরের প্রবীণ এই উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীর ইতিপূর্বে তথ্যপ্রযুক্তি বা আইটি খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করার বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর