ঢাকা | বঙ্গাব্দ

মার্কিন মধ্যস্থতায় শান্তি সংলাপে রাজি পুতিন

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 22, 2026 ইং
মার্কিন মধ্যস্থতায় শান্তি সংলাপে রাজি পুতিন ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

মার্কিন প্রশাসনের মধ্যস্থতায় ইউক্রেনের চলমান সংঘাত থামানোর লক্ষ্যে নতুন করে শান্তি সংলাপ শুরু করতে সম্মত হয়েছেন রুশ রাষ্ট্রপ্রধান ভ্লাদিমির পুতিন। আগামী মাসের যেকোনো সময় এই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা শুরু হতে পারে বলে জানিয়েছে রুশ প্রেসিডেন্টের কার্যালয় ক্রেমলিন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ইউরোপের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী এই সংকট নিরসনে ওয়াশিংটনের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

গতকাল বুধবার ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়। এর আগে মস্কো সফরকালে পুতিনের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। ঐতিহাসিক সেন্ট পিটার্সবারের একটি রাজকীয় প্রাসাদে দুই পক্ষের মধ্যে এই সরাসরি বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। যা ছিল পুতিন ও উইটকফের মধ্যে অনুষ্ঠিত নবম মুখোমুখি বৈঠক।

আলোচনার শুভসূচনা হিসেবে সদিচ্ছার প্রতীকস্বরূপ মস্কো যুক্তরাষ্ট্রের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক স্টিফেন হাবার্ডকে মুক্তি দেয়। রাশিয়ায় কারাভোগরত এই মার্কিন নাগরিককে মুক্ত করার জন্য বিশেষ অনুরোধ জানিয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন বিশেষ দূতের এই সফরের সময় ইউক্রেন ও তাদের পশ্চিমা মিত্রদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ বিরাজ করছিল যে ওয়াশিংটন হয়তো কিয়েভকে একা ছেড়ে দিচ্ছে।

কখনো কখনো ইউক্রেনকে রুশ আক্রমণের রিয়েল-টাইম গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ বন্ধ রাখা হচ্ছে বলে গুঞ্জন রয়েছে। একই সঙ্গে দেশটির সামরিক যোগাযোগব্যবস্থাও বর্তমানে নানাভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে বিভিন্ন সূত্র থেকে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। নির্বাচনী প্রচারণাকালে ডোনাল্ড ট্রাম্প জোরালো প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তিনি রাষ্ট্রক্ষমতা অর্জনের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ইউক্রেন যুদ্ধ থামিয়ে দেবেন।

সেই প্রতিশ্রুত সময়ের দুই বছরের বেশি সময় অতিক্রান্ত হলেও সংঘাতের অবসান ঘটেনি, বরং নতুন করে শান্তি আলোচনার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ক্রেমলিনের তথ্য অনুযায়ী, আসন্ন নতুন ত্রিপক্ষীয় এই আলোচনাটি মূলত কারিগরি পর্যায়ে পরিচালিত হতে পারে। যুদ্ধাবস্থার অবসান ঘটলে কীভাবে ইউক্রেন ও রাশিয়ার দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব, তা নিয়ে বিস্তারিত আলাপ চলবে।

আসন্ন ১০ নভেম্বর কিংবা তার অব্যবহিত পরেই এই বৈঠক শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। মার্কিন মধ্যস্থতায় এর আগের সর্বশেষ শান্তি বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে। এর পরপরই অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ বা যুদ্ধ শুরু করে।

এদিকে উইটকফের সঙ্গে ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি, ফিনল্যান্ড ও নরওয়ের শীর্ষনেতাসহ ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ন্যাটোর প্রতিনিধিদের বৈঠক নিয়ে ক্রেমলিন খুব বেশি আশাবাদী নয়। মার্কিন দূত পুতিনকে জানিয়েছেন যে এই বহুমুখী আলোচনা প্রক্রিয়ায় ইতোমধ্যে কিছুটা অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। অপর এক মার্কিন কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, কিয়েভ কর্তৃপক্ষ নাকি বেশ কিছু নতুন ধারণা ও প্রস্তাব টেবিলে উত্থাপন করেছে।

শান্তিচুক্তির শর্তাবলি নিয়ে বর্তমান যুদ্ধরত রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয়পক্ষই এখনো পরস্পর থেকে অনেক দূরত্বে অবস্থান করছে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ইউক্রেনের ওপর একটি সমঝোতায় উপনীত হওয়ার জন্য প্রচণ্ড রাজনৈতিক চাপ বৃদ্ধি করেছেন। গত মঙ্গলবার এক বক্তব্যে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান যে কিয়েভের জন্য এখন এই লড়াই শেষ করার মোক্ষম সময় উপস্থিত হয়েছে।

নতুবা দেশটির কপালে অত্যন্ত শোচনীয় পরিণতি বা ‘খুব খারাপ কিছু’ অপেক্ষা করছে বলেও তিনি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। এদিকে সেন্ট পিটার্সবার্গে প্রায় তিন ঘণ্টাব্যাপী দীর্ঘ বৈঠক শেষে ক্রেমলিনের শীর্ষ কর্মকর্তা ইউরি উশাকভ গণমাধ্যমকে নিজেদের অবস্থান জানান। তিনি মন্তব্য করেন যে এই সূক্ষ্ম বিষয়গুলো সামগ্রিকভাবে তাদের পুরোপুরি সন্তুষ্ট করতে পারেনি।

ইউক্রেন যুদ্ধ ছাড়াও মার্কিন প্রেসিডেন্ট, রুশ প্রেসিডেন্ট এবং চীনা প্রেসিডেন্টের সম্ভাব্য ত্রিদেশীয় বৈঠক নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। শান্তিচুক্তির শর্ত নিয়ে মতপার্থক্য থাকলেও ট্রাম্প সম্প্রতি কিয়েভকে দ্রুত সমঝোতায় আসার জন্য চাপ সৃষ্টি করছেন। গত মঙ্গলবার তিনি হুশিয়ারি দিয়ে বলেন যে যুদ্ধ শেষ না করলে দেশটির জন্য খারাপ ফল অপেক্ষা করছে।

গতকালের এই বৈঠকে রুশ নেতা পুতিন চলমান ইরান সংকট মোকাবিলায় ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করার প্রস্তাব পেশ করেছেন। ক্রেমলিন সূত্রে জানা যায়, উইটকফকে পুতিন জানিয়েছেন তেহরানের সঙ্গে মস্কোর বিগত কয়েক দশকের সুদৃঢ় সম্পর্ক রয়েছে। ইরানের বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের উদ্বেগ নিরসনে এই পারস্পরিক সম্পর্ক কাজে লাগানোর প্রস্তাব এর আগেও দেওয়া হয়েছিল।

ক্রেমলিনের আনুষ্ঠানিক ভাষ্য অনুযায়ী, পুতিন স্পষ্ট করে বলেছেন যে তেহরানের সঙ্গে একটি কূটনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছানো সম্পূর্ণ সম্ভব এবং সেটি অত্যন্ত জরুরিও বটে। পাশাপাশি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি খাতের কৃষকদের সার্বিক সহায়তার জন্য রাশিয়া বিশাল পরিমাণে রাসায়নিক সার সরবরাহ করতে পারে বলেও উইটকফকে আশ্বস্ত করেছেন পুতিন।

আসন্ন মাসে চীনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট এবং দেশটির রাষ্ট্রপ্রধান সি চিন পিংয়ের মধ্যে একটি সম্ভাব্য বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। গতকালের দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় এই সম্ভাব্য শীর্ষ বৈঠকটি নিয়েও বিশেষভাবে আলোচনা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে ক্রেমলিন। বেইজিং ইতোমধ্যে এর যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে বলে তাদের দাবি।

মস্কোর দাবি অনুযায়ী, বিশ্বমঞ্চে এ ধরনের একটি ত্রিপক্ষীয় বা শীর্ষ বৈঠক ইতিহাসে এই প্রথমবার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। তবে রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন তার ইউক্রেন অভিযಾನের মূল কৌশলগত লক্ষ্যগুলো থেকে সরে আসার বিন্দুমাত্র ইঙ্গিত প্রদান করেননি। এই মূল লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে পূর্ব ইউক্রেনের দোনেৎস্ক অঞ্চলের ভূখণ্ডের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের মুঠোয় নেওয়া।

একই সঙ্গে ইউক্রেনকে কোনো অবস্থাতেই পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর সদস্যপদ লাভ করতে না দেওয়া এবং সাময়িক যুদ্ধবিরতির পরিবর্তে একটি পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তি করা। মার্কিন দূতের সঙ্গে এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে পুতিনের বিশেষ বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা কিরিল দিমিত্রিয়েভও সশরীরে উপস্থিত ছিলেন। ক্রেমলিন জানিয়েছে, বৈঠকে অত্যন্ত বড় ধরনের কিছু যৌথ অর্থনৈতিক প্রকল্প নিয়ে সুনির্দিষ্ট আলোচনা হয়েছে।

এর মধ্যে বেশ কয়েকটি বাণিজ্যিক প্রকল্প বর্তমানে বাস্তবায়নের একদম শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে জানা গেছে। মার্কিন দূত উইটকফ সাংবাদিকদের জানান যে সম্ভাব্য শান্তিচুক্তির রূপরেখা সংবলিত কিছু নতুন ধারণার নথি তিনি পুতিনের মূল্যায়নের জন্য সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্টের জামাতা এবং ঊর্ধ্বতন উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনারও পুতিনের কাছে নিজ থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ধারণা তুলে ধরতে গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

পরবর্তীতে টেলিফোনের মাধ্যমে মার্কিন উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনারও সরাসরি এই বৈঠকে যুক্ত হয়ে নিজের মতামত ব্যক্ত করেন। অন্য একটি অগ্রগতির বিষয়ে ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে কীভাবে এই যুদ্ধ চিরতরে শেষ করা যায়, তা নিয়ে তিনি আলোচনা চান। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়গুলো নিয়ে তিনি পুতিন ও ট্রাম্পের সঙ্গে একটি ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নিতে প্রবলভাবে আগ্রহী।

তবে ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে বারবার অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে পুতিন ও জেলেনস্কির মধ্যে যদি সরাসরি কোনো বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তবে তা সফল ও ফলপ্রসূ করতে হলে দুই দেশের উচ্চপদস্থ সহযোগীদের আগে থেকেই পুঙ্খানুপুঙ্খ প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হবে।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
দেশের বাজারে আবারও কমল স্বর্ণের দাম, ভরিতে কমেছে ৭,৬৪০ টাকা

দেশের বাজারে আবারও কমল স্বর্ণের দাম, ভরিতে কমেছে ৭,৬৪০ টাকা