ঢাকা | বঙ্গাব্দ

সৌদিতে ২০ বাংলাদেশির সুনির্দিষ্ট শাস্তি নিয়ে ধোঁয়াশা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 22, 2026 ইং
সৌদিতে ২০ বাংলাদেশির সুনির্দিষ্ট শাস্তি নিয়ে ধোঁয়াশা ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

সৌদি আরবের বিভিন্ন কারাগারে বন্দি থাকা আরও ২০ জন বাংলাদেশির ভাগ্যে ঠিক কী ধরনের শাস্তি জুটেছে, সে বিষয়ে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তার নামের দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার খবর দেশজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল। ঠিক তাঁদের মতোই আরও ২০ জন বন্দীর নামের পাশে সৌদি কর্তৃপক্ষের পাঠানো নথিতে কেবল ‘দণ্ডপ্রাপ্ত’ শব্দটি লেখা থাকলেও সুনির্দিষ্ট কোনো সাজার কথা উল্লেখ নেই।

এই ধোঁয়াশা দূর করতে এবং বন্দিদের সঠিক আইনি ও দাপ্তরিক অবস্থা জানতে সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি পাঠিয়েছে জেদ্দায় অবস্থিত বাংলাদেশ কনস্যুলেট। গত ১৯ অক্টোবর জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেটের পক্ষ থেকে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মক্কা অঞ্চল তথা জেদ্দা শাখায় এই বিশেষ চিঠিটি পাঠানো হয়।

এর আগে গত ৩০ সেপ্টেম্বর সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জেদ্দা কনস্যুলেটের এখতিয়ারভুক্ত কারাগারগুলোতে থাকা মোট ২ হাজার ৪৬১ জন বাংলাদেশি বন্দীর একটি দীর্ঘ তালিকা হাতে পায় মিশন। ওই তালিকার বন্দীদের কেউ বিচারাধীন আবার কারও বা আদালতের বিচার সম্পন্ন হয়েছে। তালিকাটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করতে গিয়ে কনস্যুলেট কর্মকর্তারা দেখতে পান যে, বেশ কয়েকজন বন্দীর ‘অবস্থা’ কলামে ‘দণ্ডপ্রাপ্ত’ উল্লেখ থাকলেও ‘রায়ের সারসংক্ষেপ’ অংশটি পুরোপুরি ফাঁকা রাখা হয়েছে।

তালিকায় থাকা ওই ২২ জন বন্দীর সুনির্দিষ্ট শাস্তির ধরন কিংবা কারাদণ্ডের মেয়াদের বিষয়ে কোনো তথ্যই বিন্দুমাত্র উল্লেখ করা হয়নি। গত ১৯ অক্টোবর পাঠানো চিঠিতে কনস্যুলেটের পক্ষ থেকে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জেদ্দা শাখাকে অনুরোধ জানানো হয়েছে যেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ ও সমন্বয় করে রায়ের সারসংক্ষেপ অবিলম্বে পাঠানো হয়।

কনস্যুলার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন এবং বন্দিদের সঠিক আইনি সহায়তা নিশ্চিত করার স্বার্থেই এই তথ্য অত্যন্ত জরুরি বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। ৯ পাতার ওই সংযুক্ত তালিকায় দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দীদের বিস্তারিত বিবরণ থাকলেও ঠিক কতটি কলাম ফাঁকা রয়েছে, চিঠিতে তা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। তবে কনস্যুলেটের তালিকাটি আলাদাভাবে গণনা করে মোট ২২ জন বন্দীর ক্ষেত্রে এমন তথ্য ঘাটতির বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেটের দায়িত্বশীল সূত্রগুলোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সৌদি কর্তৃপক্ষের পাঠানো ওই তালিকা অনুযায়ী চিহ্নিত ২২ জনের মধ্যে ৮ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা পরিচালিত হয়েছে। এ ছাড়া পাঁচজনের বিরুদ্ধে মাদক পাচারের অভিযোগ রয়েছে এবং আরও পাঁচজন জড়িয়ে পড়েছেন তথাকথিত ‘ব্যক্তিগত অধিকার’–সংক্রান্ত মামলার সঙ্গে।

বাকি বন্দীদের মধ্যে দুজনের বিরুদ্ধে রয়েছে রাষ্ট্রীয় আইন লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ এবং একজনের বিরুদ্ধে সাইবার অপরাধ ও অপর একজনের বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অভিযোগ আনা হয়েছে। এই বন্দীদের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে জানা গেছে যে, তাঁদের মধ্যে ছয়জন বন্দিকে রাখা হয়েছে জেদ্দার জাহবান কারাগারে।

এছাড়াও শুমাইসি কারাগারে বন্দি রয়েছেন আরও ছয়জন এবং জেদ্দা জেনারেল কারাগারে আটক আছেন চারজন বাংলাদেশি। বাকি ছয়জন বন্দি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কারাগারে দিন কাটাচ্ছেন, যার মধ্যে রয়েছে নাজরান, খামিস, আল-বাহা, হাদ্দাহ এবং জেদ্দার নির্ধারিত নারী কারাগার।

উল্লেখযোগ্য একটি দিক হলো, ‘ব্যক্তিগত অধিকার’–সংক্রান্ত মামলার আওতায় থাকা পাঁচজন বাংলাদেশিই বর্তমানে শুমাইসি কারাগারে আটক রয়েছেন। সাধারণত এ ধরনের আইনি মামলাগুলো ব্যক্তিগত দাবিদাওয়া কিংবা আর্থিক ক্ষতিপূরণ আদায়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকে। তবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ কী ছিল, মামলার মূল নথি হাতে না পেলে তা কোনোভাবেই নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

শুধু মামলার সাধারণ প্রকৃতি দেখে কোনো বন্দীর চূড়ান্ত শাস্তি কেমন হতে পারে, তা আগেভাগে অনুমান করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। সৌদি আরবের প্রচলিত আইন অনুযায়ী হত্যা মামলার বিচারে যেমন কিসাস বা মৃত্যুদণ্ড হতে পারে, তেমনি রক্তপণ প্রদান কিংবা নির্দিষ্ট মেয়াদের কারাদণ্ড দিয়েও মামলার নিষ্পত্তি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

ফলস্বরূপ, তালিকার অন্তর্ভুক্ত কোনো বন্দীর ক্ষেত্রেই নিশ্চিত করে মৃত্যুদণ্ডের কথা যেমন বলা যাচ্ছে না, তেমনি সেই আশঙ্কা পুরোপুরি বাতিলও করা যাচ্ছে না। সৌদি আরবের মতো দেশে গুরুতর কোনো অপরাধের বিচার সম্পন্ন হওয়ার পর রায়ের বিবরণ না জানার পরিণতি কতটা মারাত্মক হতে পারে, তার সাম্প্রতিকতম দৃষ্টান্ত হলো নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া।

সংশ্লিষ্ট রায়ের কোনো ধরনের সারসংক্ষেপ হাতে না থাকলে কনস্যুলেটের পক্ষে জানা সম্ভব হয় না যে সংশ্লিষ্ট বন্দীর সামনে আইনি লড়াইয়ের আর কী কী পথ খোলা রয়েছে। আপিল করার কোনো সুযোগ অবশিষ্ট আছে কি না, দক্ষ কোনো আইনজীবী নিয়োগের ব্যবস্থা করা যাবে কি না কিংবা রক্তপণের মাধ্যমে মীমাংসা বা সাধারণ ক্ষমার কোনো উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব কি না, তার পুরোটাই নির্ভর করে মূল রায়ের ওপর।

এদিকে সুদূর প্রবাসে থাকা স্বজনদের অনুপস্থিতিতে দেশের বাড়িতে থাকা পরিবারগুলোও দীর্ঘদিন ধরে একই রকম চরম মানসিক অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। নজরুল ও সুইটির ফাঁসি কার্যকর হওয়ার মর্মান্তিক খবরটি সামনে আসার পরই মূলত এই জটিল বিষয়টি নিয়ে নড়েচড়ে বসেছে জেদ্দার বাংলাদেশ কনস্যুলেট।

সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে পাঠানো কনস্যুলেটের চিঠিতে পরিষ্কার ভাষায় জানানো হয়েছে যে, দণ্ডিত ব্যক্তিদের সাজার বিস্তারিত তথ্য চেয়ে এই যে আবেদন করা হয়েছে, তা তাদের নিজেদের তথ্যভান্ডার হালনাগাদ করার কাজের একটি অংশ। একই সঙ্গে এর মূল উদ্দেশ্য হলো প্রবাসী বাংলাদেশি নাগরিকদের সর্বোচ্চ ও মানসম্মত কনস্যুলার সেবা নিশ্চিত করার নিরন্তর প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা।

সুতরাং, তালিকার এই বড় ঘাটতি যদি দ্রুত পূরণ না হয়, তবে বাংলাদেশ কনস্যুলেটের নিজস্ব দাপ্তরিক রেকর্ডও অসম্পূর্ণ এবং ত্রুটিপূর্ণ থেকে যাবে। এখন প্রধান দেখার বিষয় হলো, সৌদি কর্তৃপক্ষ কত দ্রুত এই রায়ের বিস্তারিত তথ্য সরবরাহ করে এবং সেই তথ্যের ভিত্তিতে কার ভাগ্যে ঠিক কী ধরনের শাস্তি নির্ধারিত রয়েছে তা প্রকাশ্যে আসে।

গত ১৯ অক্টোবর জেদ্দা কনস্যুলেট আরও একটি পৃথক চিঠির মাধ্যমে মোট ২ হাজার ৪৬১ জন বন্দীকে মোট পাঁচটি ভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত করে বিশেষ কিছু অনুরোধ জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সাজার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া বন্দীদের দ্রুত কারামুক্তি দিয়ে দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করা।

পাশাপাশি কারাগারে ভালো আচরণ প্রদর্শনকারী বন্দীদের রাজকীয় ক্ষমার তালিকার অন্তর্ভুক্ত করার অনুরোধও জানানো হয়েছে। প্রথমবার আটক হয়েছেন এবং তুলনামূলকভাবে ছোট অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের অবশিষ্ট সাজা মওকুফ করার বিষয়েও জোর দেওয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা বিচারাধীন মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি করার কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার জোরালো অনুরোধ জানানো হয়েছে চিঠিতে। কনস্যুলেটের পক্ষ থেকে এর বাইরেও আরও দুজন বাংলাদেশির বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে জানতে চেয়ে সৌদি মন্ত্রণালয়কে আলাদা চিঠি দেওয়া হয়েছে।

গ্রেপ্তার হওয়া ওই দুই প্রবাসীর পরিবার কনস্যুলেটকে জানিয়েছে যে, স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাঁদের আটক করে নিয়ে গেলেও ঠিক কী কারণে বা সুনির্দিষ্ট কোন স্থান থেকে তাঁদের তুলে নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে পরিবারগুলো সম্পূর্ণ অন্ধকার রয়েছে। কনস্যুলেটের পাঠানো এই সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ চিঠিপত্রের বিপরীতে সৌদি কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া বা জবাব এখনো পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
সেভিয়ার মুখোমুখি হওয়ার আগে সেই ফাইনাল হার ভুলছেন না মরিনহো

সেভিয়ার মুখোমুখি হওয়ার আগে সেই ফাইনাল হার ভুলছেন না মরিনহো