ঢাকা | বঙ্গাব্দ

নেটফ্লিক্সে রাজত্ব করছে হুমা কুরেশির বেবি ডু ডাই ডু

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 22, 2026 ইং
নেটফ্লিক্সে রাজত্ব করছে হুমা কুরেশির বেবি ডু ডাই ডু ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

বাকশক্তিহীন এবং শ্রবণপ্রতিবন্ধী এক তরুণী পেশাদার ঘাতক হিসেবে কাজ করে। এই নির্মম চরিত্রের ভেতরে লুকিয়ে রয়েছে শৈশবের গভীরে প্রোথিত বেদনা, চরম একাকী জীবন এবং ভালোবাসা অর্জনের তীব্র খোদা। পরস্পরবিরোধী এই সমস্ত বৈশিষ্ট্যকে একত্রিত করে হিন্দি ভাষার চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেছেন নচিকেত সামন্ত এবং মূল ভূমিকায় রূপদান করেছেন হুমা কুরেশি। গত জুলাই মাসে সিনেমাটি প্রেক্ষাগৃহগুলোতে মুক্তি পাওয়ার পর সম্প্রতি ওটিটি প্ল্যাটফর্ম নেটফ্লিক্সে পা রেখেছে। মুক্তির পর থেকেই ডিজিটাল মাধ্যমটির বাংলাদেশি দর্শকদের পছন্দের তালিকার একেবারে শীর্ষে অবস্থান করছে এই ক্রাইম-থ্রিলার ঘরানার চলচ্চিত্রটি।

তথ্যভিত্তিক পরিচিতিতে দেখা যায়, সিনেমাটির নাম রাখা হয়েছে ‘বেবি ডু ডাই ডু’। অপরাধমূলক এই থ্রিলারটির পরিচালনায় রয়েছেন নচিকেত সামন্ত। পর্দায় বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন হুমা কুরেশি, চাঙ্কি পান্ডে এবং সিকান্দার খের। আন্তর্জাতিক এই স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মটিতে প্রদর্শিত ছবিটির মোট স্থায়িত্বকাল হলো দুই ঘণ্টা তিন মিনিট।

একজন ভাড়াটে খুনিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা গল্পের বুনন দর্শকের কাছে খুব বেশি নতুন মনে নাও হতে পারে। বিশ্বজুড়ে এই ধরনের প্লট নিয়ে বহু কাজ অতীতে সম্পন্ন হয়েছে। এখানে একমাত্র অভিনব দিক হলো রহস্যজনক ঘাতক একজন নারী, যিনি কথা বলতে বা শুনতে অক্ষম। বাকি সব উপাদান বেশ চেনা জানা। অতীতের এক মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি বেবি কারমারকরকে রূপান্তর করেছে এক ঠান্ডা মাথার ঘাতকে। পাপা নামক এক অভিভাবকসুলভ ব্যক্তির নির্দেশে সে যাবতীয় মিশন সম্পন্ন করে। নিজের কাজে সে অত্যন্ত পারদর্শী এবং তার প্রধান অস্ত্র হলো একটি বিশেষ ছাতা, যার আড়াল থেকে সে নির্ভুল নিশানায় গুলি ছুড়তে সক্ষম হয়।

একটা সময়ে বেবির জীবনে ভালোবাসার আগমন ঘটে। রচিত সিং অভিনীত এই যুবকের সঙ্গে সম্পৃক্ততা তৈরি হওয়ার পর নিজের গোপন পেশা লুকিয়ে রাখা তার জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। বেবি অপরাধের এই দুনিয়া চিরতরে ত্যাগ করে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা শুরু করতে চায়। কিন্তু অন্ধকার জগতের শিকড় এত গভীরে যে সেখান থেকে সহজে পলায়ন অসম্ভব। তার সামনে অনিবার্যভাবে নেমে আসে রক্তাক্ত সংঘাতের দিনগুলো।

এমন চেনাজানা কাহিনিকে উপভোগ্য করে তুলতে পরিচালক বিশেষ জোর দিয়েছেন দৃশ্যশৈলী এবং পরিবেশনার ওপরে। এই প্রচেষ্টার প্রতিফলন ঘটেছে ছবির নামকরণেই। মারাঠি ভাষার নাম ‘বেবি কারমারকর’-এর ইংরেজি রূপান্তর হলো ‘বেবি ডু ডাই ডু’। নামের দুটি অংশের ধ্বনিগত সাদৃশ্য বিষয়টিকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে।

বেবির অক্ষমতার কারণে চারপাশের দৃশ্যপট এবং শব্দের জগৎ বিশেষ গুরুত্ব লাভ করেছে। সাদাকালো ফ্ল্যাশব্যাক দৃশ্য, নির্বাক চলচ্চিত্রের বিভিন্ন কৌশল, অদ্ভুত ধরনের মিউজিক এবং বৃষ্টিস্নাত নিয়ন আলোর ছাদ মিলেমিশে তৈরি করেছে এক অস্বস্তিকর ও রহস্যঘেরা পরিবেশ। লাল রঙের ব্যবহারও খুব স্পষ্ট। বিশেষ কিছু দৃশ্যে এই রংটি যেন আলাদা একটি জীবন্ত চরিত্রের রূপ ধারণ করে।

বর্ণনার কৌশলেও কিছু ভিন্নতা চোখে পড়ে। ক্লোজড সারকিট ক্যামেরার ফুটেজ উল্টো চালিয়ে হত্যাকাণ্ড প্রদর্শন, খুদে বার্তা, স্ক্রিন বিভাজন, ভয়েস মেসেজ এবং সাবটাইটেল ব্যবহারের মাধ্যমে প্রথাগত উপস্থাপন থেকে ছবিটিকে আলাদা করা হয়েছে। পরিচালকের সূক্ষ্ম রসবোধ মাঝেমধ্যে বেশ কার্যকর প্রমাণিত হয়।

সংগীতের নির্বাচনেও নির্মাতার রসবোধের পরিচয় পাওয়া যায়। সমকামীদের ক্লাবে বাজানো গান থেকে শুরু করে বিয়ের দৃশ্যে মিউচুয়াল ফান্ডের ঝুঁকির কথা বলা গানগুলোর ব্যবহার গল্পের পরিবেশের সঙ্গে দারুণভাবে মানিয়ে গেছে।

তবে পরিচালনার এই নান্দনিক চমকগুলো সবসময় গল্পকে সঠিকভাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেনি। ছবিটির সবথেকে বড় ত্রুটি হলো এর অগোছালো ভাব। একসঙ্গে বহু চরিত্রকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে পরিচালক মূল চরিত্রের মূল সুর থেকে ট্র্যাকচ্যুত হয়েছেন। বেবির প্রেমিক, রহস্যময় আইনজীবী, কাজে ভুল করা পুরুষ সহকর্মী, দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা, মেন্টর, বস্তির প্রতিবেশী এবং খলনায়ক ও তার ভাইসহ নানা চরিত্রের ভিড়ে মূল মনোযোগ বারবার ভিন্ন দিকে চলে যায়।

দ্বিতীয়ার্ধে এই সমস্যাটি আরও প্রকট আকার ধারণ করে। একের পর এক কাকতালীয় ঘটনা ঘটতেই থাকে। বেবি যাদের নিধন করতে যায়, তাদের পারিপার্শ্বিক অবস্থা কোনো না কোনোভাবে তার নিজের ব্যক্তিগত জীবনেও প্রভাব ফেলে। চরিত্রগুলোর পারস্পরিক সমীকরণ এবং কার প্রতি কে অনুগত, তা হিসাব করা কঠিন হয়ে পড়ে। শেষ পর্যায়ে এসে অনেকগুলো সূত্র একসাথে মেলানোর কসরত করা হয়। কিছু প্রশ্নের উত্তর মিললেও নির্দিষ্ট কিছু চরিত্রের পরিণতি নিয়ে লেখকের পরিকল্পনা কতটা স্পষ্ট ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।

উপসংহারের দিকে একটি বড় চমক অপেক্ষা করছে। এটি কেবল কাহিনির মোড়ই বদলায় না, বরং সিনেমার নামকরণের অর্থকেও নতুনভাবে ফুটিয়ে তোলে। প্রারম্ভে শিশুর অদ্ভুত কণ্ঠে যে বিবরণ শোনা যায়, শেষ মুহূর্তের ঘটনা সেই বয়ানকেও অর্থবহ করে তোলে। যদিও এই চমক আগের সমস্ত ত্রুটি পুরোপুরি ঢাকতে পারে না, তবুও শেষ অব্দি দর্শকের আগ্রহ ধরে রাখতে সক্ষম হয়।

অভিনয়ের ক্ষেত্রে হুমা কুরেশি এই চলচ্চিত্রের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক। বেবিকে তিনি এমন এক নির্বিকার ঘাতক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন যাকে গতানুগতিক অ্যাকশন তারকা বলা যায় না। তার চেহারায় বা আচরণে খুনি হিসেবে সহজে সন্দেহ করার অবকাশ থাকে না। নারী হওয়া এবং বাকপ্রতিবন্ধকতার বিষয়টি তার জন্য এক ধরনের সুরক্ষা হিসেবে কাজ করে। আবেগের প্রকাশের সুযোগ সীমিত থাকলেও হুমা তার উপস্থিতির মাধ্যমে একাকিত্ব ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ফুটিয়ে তুলেছেন।

রচিত সিংও প্রেমিকের ভূমিকায় বেশ ভালো অভিনয় করেছেন। তার চরিত্রটি নিয়ন্ত্রণকামী নয়, আবার প্রেমিকার আসল রূপের মুখোমুখি হওয়ার মানসিক প্রস্তুতিও তার নেই। চাঙ্কি পান্ডে নিয়োগকর্তার চরিত্রে উপযুক্ত। সিকান্দার খের খলনায়কের চরিত্রে নতুন কিছু উপহার দিয়ে দর্শকদের চমকে দিয়েছেন।

কিছু ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও এই ছবি দেখা উপভোগ্য। কারণ এটি কেবল ভাড়াটে খুনির গল্পে সীমাবদ্ধ থাকেনি। মুম্বাই শহরকে কেবল ব্যাকগ্রাউন্ড হিসেবে ব্যবহার না করে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শহরটিকে নিজেই একটি প্রধান চরিত্র বানিয়ে তুলেছেন নির্মাতা।

যমজ ভাইবোন, বংশপরম্পরায় চলা শত্রুতা, নিষ্ঠুর রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী, লোকাল ট্রেন, বিশাল হোর্ডিং, ঘিঞ্জি বস্তি কিংবা পরিত্যক্ত হোটেল—বলিউডের চেনা উপাদান সবই এখানে উপস্থিত। তবে সেগুলোর ব্যবহার গতানুগতিক নয়, বরং বদলে যাওয়া নগরজীবনের সঙ্গে মিশে গেছে।

অতীতে মুম্বাইকে সাদাকালো ছবির মতো দেখানো হয়েছে। পরবর্তী সময়ে তা রূপান্তরিত হয় বৃষ্টিভেজা এক ভিন্ন দৃশ্যে। চারপাশে নির্মাণকাজের মাঝে নৈতিক অবক্ষয় বৃদ্ধি পায়। সবকিছু যেন নির্মাণাধীন অবস্থায় থাকে।

বেবি এমন এক অন্ধকার আবাসন ব্যবসার হয়ে কাজ করে যা শহরের ঐতিহ্যকে ধ্বংস করে এগিয়ে চলেছে। ফলে ছবিটি দুই সংস্কৃতির সংঘাতের গল্পে পরিণত হয়। একদিকে বহুত্ববাদী ইতিহাস, অন্যদিকে নিষ্ঠুর আধুনিক নগরজগৎ। এই প্রতিযোগিতায় মানুষের মানবিকতা সংকুচিত হয়ে পড়ে।

অনুরাগ কাশ্যপের সিনেমার সঙ্গে এই কাজের কিছু মিল রয়েছে। দুই ছবিতেই অপরাধ ও বিচ্ছিন্নতা প্রধান হয়ে উঠেছে। তবে এই চলচ্চিত্রটি ততটা বিক্ষিপ্ত হয়নি, বরং পরিচিত কাঠামোর ভেতর শহরের রূপ তুলে ধরেছে।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
কুরিয়ার ওয়্যারহাউসে হামলা চালিয়ে ৩১ লাখ টাকার প্রযুক্তিপণ্য

কুরিয়ার ওয়্যারহাউসে হামলা চালিয়ে ৩১ লাখ টাকার প্রযুক্তিপণ্য