নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
রবিবার বাগেরহাটের নতুন পুলিশ লাইনে একটি বিশেষ কমিউনিটি পুলিশিং সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির। এই আয়োজনে মাদকদ্রব্য, সন্ত্রাসবাদ, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, কিশোর গ্যাং এবং উগ্রবাদের তীব্র বিরোধিতা করে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য তুলে ধরা হয়। বিশেষ করে সরকারি প্রফুল্ল চন্দ্র কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক পারভীন আক্তার তাঁর বক্তব্যে মাদকের বিস্তার নিয়ে গভীর শঙ্কা প্রকাশ করেন এবং ক্ষতিকর কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করায় নিজে কীভাবে হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন, সে বিষয়টি সবার সামনে তুলে ধরেন।
অধ্যক্ষ পারভীন আক্তার তাঁর বক্তব্যে জানান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদকের আগ্রাসনের বিষয়টি তিনি মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে অবহিত করেছিলেন। এরপর তাদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়ে ক্যাম্পাসের নির্দিষ্ট কিছু সন্দেহভাজন এলাকা ঘুরে দেখা হয় এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাদকের কুফল সম্পর্কে সচেতন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
ছাত্রাবাস থেকে বহিষ্কার করার পরও অভিযুক্ত শিক্ষার্থীরা রাতের আঁধারে হলে ফিরে এসে নেশা করে বলে অভিযোগ করেন অধ্যক্ষ। তিনি জানান, আসন্ন পূজার ছুটির সময় তাঁর কাছে বেশ কিছু ফোন আসে এবং জানা যায় যে ওই তরুণেরা ক্যাম্পাসের পুকুরের মাছ চুরি করেছে। এই ঘটনার পর সকালে তিনি হল সুপারকে নির্দেশ দেন তাদের আবাসিক আসন বা সিট অবিলম্বে বাতিল করতে অথবা প্রথমে মৌখিকভাবে সতর্ক করে তারপর ব্যবস্থা নিতে।
এর জেরে অভিযুক্ত মাদকাসক্ত শিক্ষার্থীরা তাঁকে ভয়ভীতি ও হুমকি প্রদর্শন করেছে বলে উল্লেখ করেন অধ্যাপক পারভীন আক্তার। তিনি জানান, তাদের হুমকি ছিল যে আগের অধ্যক্ষকে যেভাবে তারা ফাঁসিয়েছিল, বর্তমান অধ্যক্ষ ম্যাডাম যদি কঠোর পদক্ষেপ নেন, তবে তাঁকেও একই কায়দায় বিপদে ফেলবে।
প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের সবাইকে বিষয়টি অবহিত করে অধ্যক্ষ প্রশ্ন তোলেন যে তাঁরা শেষ পর্যন্ত এসব অপরাধীর সঙ্গে পেরে উঠবেন কি না। নিজের ভয়ের কথা প্রকাশ করে তিনি বলেন, তাঁরা অত্যন্ত উদ্বেগজনক পরিস্থিতির মধ্যে বসবাস করছেন। তবে তিনি নিজের ক্ষমতার সর্বোচ্চ প্রয়োগ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিকে মাদকের করাল গ্রাস থেকে মুক্ত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানান।
সন্তানদের সঠিক পথে রাখতে অভিভাবকদের আরও বেশি মনোযোগী হওয়ার তাগিদ দেন এই শিক্ষাবিদ। তিনি মন্তব্য করেন যে নিজ সন্তান ভালো পথে আছে নাকি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, সে বিষয়ে একজন অভিভাবকই সবচেয়ে ভালো জানেন।
এই অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে আইজিপি আলী হোসেন ফকির জানান, গত দুই মাসের ব্যবধানে তিনি মাদক সংশ্লিষ্টতার অপরাধে মোট ২৭ জন পুলিশ সদস্যকে বরখাস্ত করে কারাগারে পাঠিয়েছেন। উপস্থিত জনগণের উদ্দেশ্যে তিনি প্রশ্ন রাখেন যে এরপরে তাদের আর কী প্রত্যাশা থাকতে পারে। তিনি পরামর্শ দেন যে আগে নিজেদের ঘর বা বিভাগ পরিষ্কার করা উচিত, এরপর অন্যদের পরিষ্কার হওয়ার প্রশ্ন আসে।
পুলিশের ভেতরের শৃঙ্খলা রক্ষা, মাদক উৎখাত, জনবল এবং গাড়ির ঘাটতিসহ সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আইজিপি জানান, একসময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে পরিকল্পিতভাবে অকেজো করে রাখা হয়েছিল। যারা এই বাহিনীগুলোকে দুর্বল করেছিল, তাদের বিরুদ্ধে বর্তমানে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।
সব ধরনের গুজব ও গভীর ষড়যন্ত্র সম্পর্কে দেশবাসীকে সজাগ থাকার আহ্বান জানান পুলিশ মহাপরিদর্শক। তিনি উল্লেখ করেন যে প্রতিটি পদক্ষেপে ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করা হয়েছে। তিনি নিজের দেশের প্রতি ভালোবাসার কথা পুনর্ব্যক্ত করে জানান যে তাঁর কাছে সবার আগে নিজের দেশ। প্রধানমন্ত্রী আসার পর বিভিন্ন পরিকল্পনা নেওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন রাখেন কেন মানুষ এগুলোতে অপ্রয়োজনীয় ষড়যন্ত্র খোঁজে, এবং প্রধানমন্ত্রী কোন কাজটি খারাপ করেছেন তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
আইজিপি আরও বলেন যে দেশের ব্যাংকগুলোর কোষাগার খালি করে দেওয়া হয়েছিল এবং সবকিছু শূন্য করা হয়েছিল। এরপরও একশ্রেণির মানুষ নিজেদের সাধু ও ফেরেশতা হিসেবে জাহির করে আর বর্তমান দায়িত্বশীলদের খারাপ হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা চালায়। দেশের স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না বলে স্পষ্ট জানিয়ে তিনি বলেন, যারা দেশের সার্বভৌমত্বকে দুর্বল করতে চায়, তাদের সহযোগীরা কখনোই প্রকৃত দেশপ্রেমিক হতে পারে না।
বাগেরহাটের পুলিশ সুপার মো. জামিলুর ইসলামের সভাপতিত্বে আয়োজিত এই সমাবেশে আরও উপস্থিত ছিলেন খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি মো. রেজাউল করিম, জেলার জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেনসহ প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তা, বিশিষ্ট নাগরিক সমাজ এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর