ঢাকা | বঙ্গাব্দ

নবীজির মেষ চরানোর স্মৃতি বিজড়িত আজয়াদ ভূমি

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 27, 2026 ইং
নবীজির মেষ চরানোর স্মৃতি বিজড়িত আজয়াদ ভূমি ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

পবিত্র মদিনায় থাকাকালীন সময়ের একটি বিশেষ মুহূর্ত স্মরণ করে বিশ্বনবী বলেছিলেন যে তিনি নিজ পরিবারের ছাগল দেখাশোনা করতেন জিয়াদ নামক উপত্যকায়। হাদিসগ্রন্থ মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত এই তথ্যটির বর্ণনাকারী সাহাবি আবু সাইদ খুদরি মক্কায় ইসলাম গ্রহণের পর ইয়েমেনে চলে গিয়েছিলেন। পরবর্তীতে মদিনায় হিজরতের সংবাদ পেয়ে তিনি ইশ বন্দরের উদ্দেশ্যে সমুদ্রপথে রওনা হন।

প্রবল প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখে পড়ে সেই সমুদ্রযাত্রা তাকে ইথিওপিয়ার উপকূলে নিয়ে গিয়েছিল। সেখানে প্রায় চতুর্বৎসরের মতো সময় তিনি জাফর ইবনে আবি তালিবের সঙ্গে অতিবাহিত করেন। সপ্তম হিজরির খাইবার জয়ের সময় হাবশার সেই প্রবাসী দলটি মদিনায় এসে পৌঁছায়।

হিজরতকারী দলটি মদিনায় পৌঁছানোর পর মহানবী কার জন্য অধিক আনন্দ প্রকাশ করবেন তা ঠিক করতে পারছিলেন না। আবু সাইদ খুদরি উল্লেখ করেন যে উট ও ছাগলের মালিকরা তখন রাসুলের সামনে নিজেদের বড়াই প্রকাশ করছিলেন। এই পরিস্থিতিতে আল্লাহর রাসুল ঘোষণা করেন যে অহংকার হলো উটের মালিকদের আর প্রশান্তিপূর্ণ উচ্চমর্যাদা হলো ছাগলের মালিকদের প্রাপ্য।

তিনি আরও বলেন যে মুসা আলাইহিস সালাম প্রেরিত হয়েছিলেন এবং তিনিও তাঁর ঘরের ছাগলের দায়িত্বে ছিলেন। একই সঙ্গে তিনি জানান যে তাঁকেও পাঠানো হয়েছে এবং তিনিও জিয়াদ এলাকায় নিজের পরিবারের ছাগল দেখাশোনা করতেন। আবু হোরাইরা থেকে বর্ণিত বুখারির অন্য হাদিসে এসেছে যে আল্লাহ এমন কোনো নবী পাঠাননি যিনি ছাগল চরাননি।

সাহাবিদের প্রশ্নের উত্তরে রাসুল নিশ্চিত করেন যে তিনিও মক্কার কারারিত নামক স্থানে ছাগল চরানোর কাজটি করেছিলেন। এই বর্ণনার মাধ্যমেই স্পষ্ট হয় যে সাহাবিরা রাসুলের এই রাখাল জীবন সম্পর্কে পূর্বে অবগত ছিলেন না। হাদিস বিশারদদের মতে কারারিত শব্দটি মূলত কিরাত শব্দের বহুবচন হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

এই শব্দের দুটি সম্ভাব্য অর্থের একটি হলো এটি কোনো নির্দিষ্ট মুদ্রার নাম যার বিনিময়ে তিনি মক্কাবাসীদের ভেড়া ও ছাগল দেখাশোনা করতেন। দ্বিতীয় অর্থটি হলো এটি মক্কারই একটি নির্ধারিত অঞ্চলের নাম। সহিহ বুখারির প্রখ্যাত ভাষ্যকার মুস্তফা আল বুগা এটিকে মক্কার কাছাকাছি অবস্থিত জিয়াদ স্থান বলেই চিহ্নিত করেছেন।

নবীজির শৈশবের সেই রাখাল জীবনের বিবরণ আরেকটি অত্যন্ত সুন্দর হাদিস থেকে বিস্তারিতভাবে জানা সম্ভব হয়। আলি ইবনে আবি তালিবের বর্ণনায় জানা যায় রাসুলুল্লাহ কখনো জাহিলি যুগের মানুষদের মতো কোনো মন্দ কাজে লিপ্ত হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেননি। তবে তাঁর জীবনে এমন ঘটনা দুবার ঘটেছিল এবং প্রতিবারই মহান আল্লাহ তাঁকে সকল অন্যায় থেকে রক্ষা করেছিলেন।

ঘটনার বিবরণ দিয়ে রাসুল জানান যে মক্কার ওপরের অংশে কোরাইশ বংশের এক যুবকের সঙ্গে তাঁর মোলাকাত হয়েছিল যিনি তখন নিজের পরিবারের মেষ চরাচ্ছিলেন। তিনি সেই যুবককে মেষগুলোর দেখভাল করার অনুরোধ জানিয়ে জানান যে আজকের রাতটি তিনি অন্য যুবকদের মতো সাধারণ আড্ডায় কাটাতে চান। যুবকটি তাঁর সেই অনুরোধ সানন্দে রক্ষা করেছিলেন।

অতঃপর মক্কার জনপদের নিকটবর্তী হতেই গান বাদ্যযন্ত্র ও বাঁশির আওয়াজ তাঁর কানে এসে পৌঁছায়। সেখানে উপস্থিত মানুষের কাছে কারণ জানতে চাইলে তারা জানায় যে এক কোরাইশ পুরুষ আরেক কোরাইশ নারীকে বিয়ে করছে। বাদ্যযন্ত্রের সেই কোলাহলে তাঁর মনোযোগ নষ্ট হয়ে যায় এবং গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন।

পরদিন সকালে সূর্যের প্রখর তাপে তাঁর ঘুম ভেঙে যায় এবং তিনি নিজের সঙ্গীর কাছে ফিরে আসেন। সঙ্গী তাঁকে জিজ্ঞেস করলে তিনি ঘটে যাওয়া সমস্ত ঘটনা তাকে খুলে বলেন। পরবর্তীতে অন্য আরেকটি রাতেও তিনি ঠিক একইভাবে নিজের সঙ্গীকে একই অনুরোধ জানান এবং সঙ্গী তাতে সম্মতি দেন।

আগের রাতের মতো আজও তিনি একই স্থান থেকে বাদ্যের আওয়াজ শুনতে পান এবং আগের মতো সেটির কারণ সম্পর্কে অবগত হন। সেই কোলাহলে আবারও তাঁর মনোযোগ বিচ্ছিন্ন হয় এবং তিনি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। পরের দিন ভোরে সূর্যের আলোয় ঘুম ভাঙার পর তিনি আবারও নিজের সঙ্গীর কাছে ফিরে যান।

সঙ্গী তখন তাঁকে প্রশ্ন করলে তিনি জানান যে তিনি মূলত কিছুই করেননি। আল্লাহর রাসুল কসম করে বলেছেন যে এরপর থেকে জাহিলি যুগের মানুষেরা যেসব অন্যায় কাজের ইচ্ছা পোষণ করত তিনি আর কখনো সেরকম কোনো কাজের প্রতি আগ্রহ দেখাননি। পরিশেষে আল্লাহ তাআলা তাঁকে নবুয়তের মহামান্বিত মর্যাদায় ভূষিত করেন।

এই স্মৃতিচারণ থেকে পরিষ্কারভাবে বোঝা যায় যে তাঁর সেই রাখাল জীবন কেটেছিল মক্কার উঁচু ও নিচু এলাকার সংযোগস্থলে। জিয়াদের ভূখণ্ডই যে সেই ঐতিহাসিক স্থান সে বিষয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই কারণ জিয়াদ হলো মক্কার উঁচু এবং নিচু ভূমির মিলনস্থল। নবীজি যখন যুবক বয়সের অধিকারী ছিলেন তখন কোরাইশরা কাবা ঘর পুনর্নির্মাণের কাজ পরিচালনা করছিল।

কাবার সেই সংস্কার কাজের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি কমপক্ষে দুবার আজয়াদ শব্দটির উল্লেখ করেছিলেন যা মূলত জিয়াদেরই আরেকটি রূপ। কাবা ঘর ভাঙার কাজ চলাকালীন হঠাৎ করেই তারা দেখতে পায় যে দেয়ালের ওপর একটি বিশালাকার সাপ বসে আছে। সাপটির পিঠের অংশ কালো রঙের এবং পেটটি সম্পূর্ণ সাদা বর্ণেরও ছিল।

ভাঙার উদ্দেশ্যে কেউ কাবার কাছে গেলেই সেই সাপটি মুখ হা করে তার দিকে তেড়ে আসত। ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে কোরাইশরা মাকামে ইবরাহিমে সমবেত হয়ে আল্লাহর দরবারে আর্তনাদ করে ফরিয়াদ জানায়। তারা প্রার্থনা করে বলে যে তারা তো ঘরের সম্মান রক্ষা করতে চায় তাই আল্লাহ যেন তাদের আর ভয় না দেখান।

তাদের এই প্রার্থনার পর আকাশ থেকে একটি বিশেষ আওয়াজ শোনা যায় এবং তারা দেখতে পায় বিশাল আকৃতির একটি পাখি উড়ে আসছে। কালো পিঠ এবং সাদা পেট ও পা বিশিষ্ট সেই পাখিটি এসে সাপের মাথার ওপর নিজের থাবা বসিয়ে দেয়। এরপর সেই পাখিটি সাপটিকে নিজের লেজে পেঁচিয়ে আজয়াদ এলাকার দিকে টেনে নিয়ে চলে যায়।

সাপের উপদ্রব দূর হওয়ার পর কোরাইশরা কাবা ঘর ভেঙে ফেলে এবং উপত্যকা থেকে পাথর বহন করে এনে তা নতুন করে নির্মাণ করতে শুরু করে। এভাবেই তারা কাবা ঘরটিকে বিশ গজ উচ্চতাবিশিষ্ট করে পুনর্নির্মাণ সম্পন্ন করে। মহানবী এই নির্মাণকাজের সময় আজয়াদ থেকে পাথর কাঁধে করে বহন করে নিয়ে আসছিলেন।

সেই সময় তাঁর পরনে একটিমাত্র সেলাইহীন ছোট বস্ত্র থাকায় কাজ করতে কিছুটা অসুবিধা হচ্ছিল বিধায় তিনি সেটি কাঁধের ওপর তুলে রাখেন। ছোট আকৃতির সেই কাপড়ের কারণে তাঁর দেহের সংবেদনশীল অংশ উন্মুক্ত হয়ে পড়ে এবং তখনই অদৃশ্য থেকে সতর্কতা আসে। সেই ঘটনার পর তাঁকে আর কখনো প্রকাশ্যে উন্মুক্ত অবস্থায় দেখা যায়নি।

ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী কাবার পুনর্নির্মাণের কাজ এবং মহানবীর ওপর ওহি নাজিল হওয়ার মাঝে প্রায় পাঁচ বছরের ব্যবধান ছিল। আর মদিনায় হিজরত করার সঙ্গে কাবা পুনর্নির্মাণের সময়ের ব্যবধান ছিল মোট পনেরো বছর। এই সকল বিবরণ থেকে এটি প্রমাণিত হয় যে জিয়াদ বা আজয়াদ হলো কাবার একদম সংলগ্ন একটি বিশেষ এলাকা।

উভয় শব্দের মূল বর্ণ জাইদ থেকেই এগুলোর উৎপত্তি হয়েছে যার মূল অর্থ হলো উত্তম বা সর্বোত্তম। তবে কেন এই বিশেষ ভূখণ্ডটির নাম জিয়াদ রাখা হয়েছিল তা নিয়ে নানা ধরনের ঐতিহাসিক পর্যালোচনা রয়েছে।

সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
কুষ্টিয়ায় লালন আখড়াবাড়ি থেকে টাইম বোমা ও পেট্রল উদ্ধার

কুষ্টিয়ায় লালন আখড়াবাড়ি থেকে টাইম বোমা ও পেট্রল উদ্ধার