নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
ইন্দোনেশিয়ার মাটিতে অনুষ্ঠিত মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান ও উদ্ভাবন মেলায় প্রথম স্থান অধিকার করে স্বর্ণপদক অর্জন করেছে লাতিন আমেরিকার দেশ মেক্সিকো। দেশটির মাত্র ১৭ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী এমন একটি বিশেষ প্রোটোটাইপ বা মূল মডেল উদ্ভাবন করেছেন, যা নিম্ন কম্পাঙ্কের শব্দতরঙ্গ প্রয়োগ করে মাত্র কয়েক মুহূর্তের ভেতরে যেকোনো আগুন নিভিয়ে ফেলতে পুরোপুরি সক্ষম। 'ভোরটেক্স টেক' নামের এই যুগান্তকারী যন্ত্রটি তৈরি করেছেন মেক্সিকোর তামাউলিপাস রাজ্যের আলতামিরা শহরের সরকারি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সিইটিআইএস-৭৮-এর কৃতি শিক্ষার্থী আনহেলা কারিমে ভেনেগাস এরনান্দেস।
গত ১৪ থেকে ১৬ অক্টোবর ইন্দোনেশিয়ার মাটিতে এই আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান প্রতিযোগিতাটি সফলভাবে সম্পন্ন হয়। একটি ভিডিও ইন্টারভিউতে তরুণী উদ্ভাবক ভেনেগাস গণমাধ্যমকে জানান যে, মার্কিন প্রতিরক্ষা খাতের গবেষণা সংস্থা ডারপার একটি প্রকল্পের ভিডিও ক্লিপ অবলোকন করেই তিনি সর্বপ্রথম এই অভিনব ধারণাটি লাভ করেছিলেন। মূলত ডারপা সংস্থাটি চার মিটার দীর্ঘ একটি 'সনিক ক্যানন' বা শব্দ-কামান ব্যবহার করে শক্তিশালী শব্দতরঙ্গের ধাক্কার সাহায্যে আগুন নেভানোর বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা চালিয়েছিল। সেখান থেকেই গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হয়ে এই মেধাবী কিশোরী সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রযুক্তির একটি অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র তৈরির কঠিন কাজটিতে হাত দেন।
ভেনেগাস ও তাঁর পুরো গবেষণা দলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় নির্মিত এই 'অ্যাকোস্টিক এক্সটিংগুইশার' বা শব্দভিত্তিক বিশেষ অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রটি কয়েকটি নির্দিষ্ট উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত। এর মধ্যে রয়েছে একটি ১২ ভোল্টের ব্যাটারি, একটি ফ্রিকোয়েন্সি জেনারেটর, সাউন্ড অ্যাম্পলিফায়ার, একটি বিশেষ হর্ন এবং রূপান্তরিত ব্যারেল।
যন্ত্রটির কার্যপদ্ধতি সম্পর্কে জানা যায় যে, এটি প্রথমে ৩০ হার্টজের অর্থাৎ প্রতি সেকেন্ডে ৩০টি স্পন্দনের একটি নিম্ন কম্পাঙ্ক বা ফ্রিকোয়েন্সি তৈরি করে থাকে। এরপর একটি বিশেষায়িত হর্ন বা লাউডস্পিকার সেই কম্পাঙ্ককে অত্যন্ত শক্তিশালী শব্দতরঙ্গে রূপান্তরিত করে ব্যারেলের একেবারে শেষ প্রান্তে পাঠিয়ে দেয়। ব্যারেলের গোলাকার মুখ দিয়ে বাইরে বের হওয়ার সময় ওই শব্দতরঙ্গ বাতাসের সঙ্গে মিলে একটি ঘূর্ণি বা 'ভোরটেক্স রিং' তৈরি করে। এই ঘূর্ণায়মান বাতাসের তীব্র প্রবাহ অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এগিয়ে গিয়ে ঠিক আগুনের চারপাশ থেকে অক্সিজেন সরিয়ে দেয়। বাতাসে অক্সিজেনের অনুপস্থিতির কারণে আগুন এক পলকের মধ্যে নিভে যায়।
তবে এই অভাবনীয় সাফল্য একদিনে ধরা দেয়নি বলে জানান ভেনেগাস। তিনি উল্লেখ করেন যে, সূচনালগ্নে একটি ছোট্ট মোমবাতির শিখা নেভাতেই তাঁদের চরম হিমশিম খেতে হয়েছিল। একটানা দুই মাসের গবেষণা ও একের পর এক বিফলতার মুখ দেখার পর পঞ্চম প্রোটোটাইপ বা মডেলে গিয়ে তাঁরা তাঁদের কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করেন। এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি নিখুঁতভাবে শেষ করতে তাঁদের প্রায় পুরো এক বছর সময় লেগে গেছে।
এই উদ্ভাবনী পথচলায় তরুণী ভেনেগাসের প্রধান মেন্টর বা উপদেষ্টা হিসেবে পাশে ছিলেন তাঁর আপন মামা হোসে আর্তুরো এরনান্দেস মুনিওস। তিনি নিজেও এর আগে মেক্সিকোর একাধিক বিজ্ঞান মেলায় দেশের প্রতিনিধিত্ব করার গৌরব অর্জন করেছেন। নিজের মামাকে নিয়ে ভেনেগাস বলেন, তাঁর মামার ধৈর্য, অক্লান্ত পরিশ্রম এবং সার্বিক দিকনির্দেশনা না থাকলে এই অবস্থানে পৌঁছানো কোনোভাবেই সম্ভব হতো না।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ইনস্টাগ্রামে নিজের অর্জিত মেডেল এবং সনদপত্রের ছবি আনুষ্ঠানিকভাবে শেয়ার করে ভেনেগাস ক্যাপশনে লেখেন যে, এই গোল্ড মেডেল কেবল একটি সাধারণ স্বীকৃতি নয়; বরং এটি কখনো হাল ছেড়ে না দেওয়া, নিজের ধারণার ওপর পূর্ণ বিশ্বাস রাখা এবং তা বাস্তবে রূপায়িত করার সুফল।
ইলেকট্রনিকস বিষয়ে পড়াশোনা করা তরুণী ভেনেগাস ভবিষ্যতে মেকাট্রনিক্স কিংবা ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয় নিয়ে উচ্চশিক্ষা অর্জনের গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। ইন্দোনেশিয়ার মাটিতে অনুষ্ঠিত এই আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় তিনি মেক্সিকোর ঐতিহ্যবাহী এবং সুপরিচিত পোশাক 'চিনা পোবলানা' পরে নিজের দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন।
যদিও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশ ও জাতির জন্য এতো বড় গৌরব বয়ে এনেছেন, তবুও এই উদ্ভাবনটিকে বাণিজ্যিকভাবে বাজারে নিয়ে আসা কিংবা আরও উন্নত করার জন্য এখনো পর্যন্ত কোনো বেসরকারি সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা পাননি বলে আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন ভেনেগাস। আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান মেলায় ব্যক্তিগতভাবে অংশ নেওয়ার জন্য আলতামিরার মেয়র আরমান্দো মার্তিনেস মানরিকেস এবং স্থানীয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কেবল যাতায়াত ও প্রাথমিক কিছু আর্থিক সহায়তা তিনি পেয়েছিলেন বলে উল্লেখ করেছেন।
সূত্র: আজকের পত্রিকা
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর