নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের পাশাপাশি বর্তমানে দেশের অভ্যন্তরে সমাজ ও রাজনীতির বিভিন্ন স্তরে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প উদ্বেগজনকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যে অসাম্প্রদায়িক, বহুত্ববাদী এবং ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল, তাকে আজ সুপরিকল্পিতভাবে পদদলিত করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে।
সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে বিজ্ঞানমনস্কতা, সাংস্কৃতিক বিকাশ এবং মুক্তচিন্তার প্রবাহকে ইচ্ছাকৃতভাবে রুদ্ধ করা হচ্ছে। এর বদলে জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে বিভাজনের অন্ধকার কূপমণ্ডূকতা, যার অংশ হিসেবে এই বিনাশকালে সাম্প্রদায়িক অপশক্তি সরাসরি আক্রমণ করছে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ওপর।
আমাদের সামগ্রিক জাতীয় অস্তিত্ব, ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার অর্জনের লড়াই এবং মননচর্চার প্রধান বাতিঘর হিসেবে পরিচিত রবীন্দ্রনাথের ওপর বর্তমানে বারবার আঘাত হানা হচ্ছে। অথচ ১৯৬১ সালে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার রক্তচক্ষু ও দমনপীড়নকে উপেক্ষা করে এই বাংলার সাধারণ মানুষ নিজেদের লড়াইয়ের মাধ্যমেই রবীন্দ্রনাথকে বুকে টেনে নিয়েছিল।
সেকালে একষট্টির সেই ঐতিহাসিক লড়াই ছিল আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান সাংস্কৃতিক ভিত্তি। তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে রবীন্দ্রসংগীত প্রচার ও চর্চার ওপর জারিকৃত নিষেধাজ্ঞার সেই অন্যায় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলে বাংলার মানুষ প্রমাণ করেছিল যে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কেবল সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি গভীরভাবে রাজনৈতিক।
বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী দৃঢ়ভাবে এই বিশ্বাস ধারণ করে যে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিশীল রচনা এবং তাঁর সামগ্রিক দর্শন কেবল সাধারণ সাহিত্য বা শিল্পচর্চার বিষয় নয়; এটি এ দেশের মানুষের আত্মমর্যাদা এবং ধর্মনিরপেক্ষ জাতিসত্তা টিকিয়ে রাখার মৌলিক ও প্রধান সাংস্কৃতিক পরিচয়।
এই প্রেক্ষাপটেই নিজেদের সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষার এই দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক লড়াইয়ে উদীচী একমাত্র আদর্শ হিসেবে বেছে নিয়েছে একাত্তরের চেতনাকে। এ কারণেই দেশের যেখানেই রবীন্দ্রবিরোধিতা কিংবা প্রতিক্রিয়াশীল অন্ধকারের আস্ফালন দেখা যায়, সেখানেই উদীচীর নিবেদিতপ্রাণ কর্মীরা বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে যান কণ্ঠে প্রতিরোধের গান ও কবিতা নিয়ে।
সূত্র: আজকের পত্রিকা
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর