নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
যেকোনো শহর ছেড়ে আসার সময় হৃদয়ের ভেতর এক অদ্ভুত শূন্যতা তৈরি হয়। গ্রিসের পূর্ব প্রান্তের দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর থেসালোনিকির নিকটবর্তী ছোট্ট জনপদ জান্থি ত্যাগ করার কালেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। জীবন তো আসলে অত্যন্ত ক্ষুদ্র, আর সেই ক্ষুদ্র জীবনের তুচ্ছাতিতুচ্ছ মুহূর্তগুলোর গুরুত্বই বা কম কিসে?
উঁচু-নিচু পাহাড় পেছনে ফেলে বিমান যখন মেঘের একের পর এক স্তর ভেদ করে আকাশে ওপরে উঠতে ব্যস্ত, তখন অলস মন ভাবতে বসে এমন কেন হয়। কোনো উত্তর নেই জেনেও চিন্তার পালে হাওয়া লাগে। মনে প্রশ্ন জাগে, এই অদ্ভুত শূন্যতাবোধের আসল উৎস কোথায় লুকিয়ে আছে?
হৃদয় তখন বারবার প্রশ্ন করে, এই শহরে কি আর কখনো ফিরে আসা হবে? সম্ভবত হবে না। জীবনের বেশিরভাগ জায়গাতেই তো বারবার যাওয়া হয় না, কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে। কিছুদিন বাদে যখন আবার সেই চিরচেনা পুরোনো জীবনে ফিরে যাওয়া হবে, তখন হয়তো ভুলেও যাওয়া হবে, ফিকে হয়ে যাবে একই শহর পুনরায় দেখার সুপ্ত আকাঙ্ক্ষা। তবুও নিজের ভেতরে কোনো না কোনোভাবে 'কিছু একটা' অবিকল থেকে যায়, যুগের পর যুগ রয়ে যাবে। নিছক 'অভিজ্ঞতা' নামক মামুলি শব্দটি দিয়ে সেই গভীর অনুভূতিকে সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। আর এইরকম বিশেষ কিছু বোধ ও উপলব্ধিকে আঁকড়ে ধরেই মানুষ বড় হয়, বয়সের ভারে বুড়ো হয়, এবং একদিন পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চিরতরে চলে যায়।
সেখানে চিরকাল স্থায়ীভাবে বসবাস করতে যাওয়া হয়নি, তবুও শত বছরের পুরোনো সব সরু রাস্তাঘাট, প্রাচীন গির্জা, উন্মুক্ত চত্বর, স্থির ও শান্ত জীবনযাত্রা, কিছুটা কর্মব্যস্ত কফি শপ ও বেকারি, কিংবা রাস্তার মোড়ে মোড়ে নিজ দেশের মতো অলস সময় কাটানো কৌতূহলী মানুষগুলোর উষ্ণ উপস্থিতি—সব মিলিয়ে তাদের অসাধারণ আতিথেয়তা আর কিছু নতুন বন্ধুত্বের মায়ায় পড়ে যাওয়া কি খুব বেশি অস্বাভাবিক কিছু ছিল? প্রাচীন পরিব্রাজক মুনিরা কোনো নির্দিষ্ট স্থানে তিন দিনের বেশি অবস্থান করতেন না, পাছে কোনো গভীর মায়া পড়ে যায় সেই আশঙ্কায়। আর লেখক নিজেকে সাধারণ একজন মানুষ হিসেবে উল্লেখ করে জানান যে তিনি সেখানে কাটিয়েছেন মোটে চার দিন।
আবার এমনও হতে পারে যে, এই ক্ষুদ্র ও সামান্য বিচ্ছেদের অপ্রত্যাশিত ঘটনাটি মানুষের জীবনের ছোট-বড় সব বিচ্ছেদের বিশাল ভাণ্ডারে টান ফেলে।
বাসে করে শহর ছেড়ে ফিরে যাওয়ার সময় জীবনের পকেটে কিছু মধুর স্মৃতি সঞ্চয় করে নেওয়ার এই বিদায় তো একরকম কাঙ্ক্ষিত ও অনুমিতই ছিল। অথচ বাস্তব জীবনে কত শত বিচ্ছেদ একদম হুট করে চলে আসে, কোনো ধরনের পূর্বসংকেত বা জানান না দিয়ে, আর তছনছ করে দিয়ে যায় মানুষের ভেতরটা। কত অজস্র মানুষের সঙ্গে কথা হয়, অথচ তখন কেউ জানে না যে এই জীবনে তার সঙ্গে আর কখনো কোনো দিন কথাই হবে না। ভীষণ গুরুত্বহীন কোনো এক দিনে একেবারেই সাধারণ কোনো বেলায় হয়তো কিছুটা অবহেলাতেই উচ্চারিত হয়েছিল সেই শেষ কথাগুলো। ওই পর্যন্তই শেষ। মানুষ তখন বোকার মতো বসে ভাবে, যদি আগে থেকেই জানা থাকত যে ওই কথাটিই হতে চলেছে জীবনের শেষ কথা, তবে কি আরও কিছুটা সময় বেশি কথা বলা যেত? কিংবা ভিডিও কলের ছোট্ট স্ক্রিনের ওপারে মানুষটাকে আরও অন্তত দুটি মিনিট আটকে রাখা যেত? ফোনের ওপার থেকে বিদায়বেলায় ঠিক কী বলে শেষ করা উচিত ছিল?
এই সমস্ত প্রশ্নের কোনো উত্তর কারো জানা নেই, হয়তো ভবিষ্যতে কেউ কোনোদিন জানবেও না—আর মূলত ঠিক এই কারণেই জীবনের প্রতিটি বিদায়ের অধ্যায়ে কোনো নির্দিষ্ট বা সুনির্দিষ্ট উপসংহার থাকে না।
সবশেষে জান্থি শহরের স্মৃতিচারণ দিয়েই ইতি টানা যাক। একটি বিশেষ সম্মেলনে যোগ দেওয়ার সুবাদে সেখানকার আয়োজক এবং বহু অংশগ্রহণকারীর সঙ্গে চমৎকার ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিচয় হয়েছে। গ্রিকদের যে দারুণ আতিথেয়তা রয়েছে, সে সম্পর্কে আগে কোনো ধারণাই ছিল না, ফলে তাদের ব্যবহার দেখে রীতিমতো বিস্মিত হতে হয়েছে। সম্মেলনে ঠিক কতটুকু জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব হয়েছে তা জানা নেই, তবে সেখানকার আন্তরিক মানুষগুলোর সান্নিধ্যে এসে অত্যন্ত অসাধারণ এক অভিজ্ঞতা হয়েছে। বিশেষ করে গ্রিক খাবার, কফি সহ নানা পদের খুঁটিনাটি বিষয় থেকে শুরু করে গাড়ি ভাড়া করা, গাড়িতে তেল নেওয়া এবং ভ্রমণের পরিকল্পনা করা পর্যন্ত সবকিছু তারা যেন একদম হাতে ধরে শিখিয়ে দিয়েছে। এই চমৎকার মানুষগুলোর প্রতি হৃদয়ের গভীর থেকেই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন লেখক।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর