নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
সাধারণত মানুষের ধারণায় ক্যাকটাস মানেই ছোট আকৃতির কাঁটায় পূর্ণ একটি ইনডোর প্লান্ট, যা ঘরের কোণে বা বারান্দার টবে রাখা হয়। তবে এই প্রচলিত ধারণাকে পুরোপুরি বদলে দিয়ে রাজধানীর মিরপুরের জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে এক দানবাকৃতি ক্যাকটাস। উদ্যানের অন্দরে অবস্থিত এই ব্যতিক্রমী গাছটির উচ্চতা এতটাই বেশি যে তা পাশের একটি দোতলা ভবনকেও ছাড়িয়ে গেছে। বিশাল এই উদ্ভিদটিকে সোজা ও সুরক্ষিত রাখতে এর গায়ে জড়িয়ে দেওয়া হয়েছে মোট ছয়টি লোহার বেড়ি।
মিরপুরের বোটানিক্যাল গার্ডেনে প্রবেশ করার পর সোজা পথ ধরে সামনে এগোলে পরিচালকের কার্যালয় পাওয়া যায়। সেই কার্যালয়ের ঠিক বাম দিকে অতিথি ভবনের পাশেই গাছটির অবস্থান বলে জানিয়েছে উদ্যান কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে ক্যাকটাসটির উচ্চতা প্রায় ২৫ ফুট পর্যন্ত পৌঁছেছে। উদ্ভিদ বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, গাছটির ইংরেজি নাম ‘সিরিয়াস ক্যাকটাস’ এবং এর বৈজ্ঞানিক নাম ‘cereus hexogenus’।
মার্কিন কৃষি বিভাগের উদ্ভিদবিষয়ক ডাটাবেজ জিআরআইএন-গ্লোবালের দেওয়া বিবরণী থেকে জানা যায়, এই প্রজাতির ক্যাকটাসের মূল আদিবাস হলো দক্ষিণ আমেরিকার উত্তরাঞ্চল ও ক্যারিবীয় অঞ্চল। এছাড়া দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ব্রাজিলের পারা ও রোরাইমা রাজ্যেও প্রাকৃতিকভাবে এই গাছ জন্মে থাকে। স্তম্ভের মতো লম্বা আকৃতির এই উদ্ভিদটি ‘ব্লু সিরিয়াস’ কিংবা ‘টল কলামনার ক্যাকটাস’ নামেও বেশ পরিচিত।
উদ্যানের কর্মকর্তা ও প্রবীণ মালিদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, আজ থেকে প্রায় সাত-আট বছর আগের ঘটনা সেটি। মোহাম্মদপুরের এক বাসিন্দা তাঁর শখের গাছটি নিয়ে উদ্যান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ওই ব্যক্তি জানিয়েছিলেন, তাঁর মা অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে গাছটির পরিচর্যা করতেন। কিন্তু তাঁর মায়ের মৃত্যুর পর তিনি বিদেশ চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং বাড়িতে গাছটির দেখভাল করার মতো কেউ আর ছিল না।
প্রিয় মায়ের স্মৃতিবিজড়িত গাছটিকে এভাবে ফেলে না দিয়ে তিনি জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে হস্তান্তর করার সিদ্ধান্ত নেন। পরবর্তীতে উদ্যান কর্তৃপক্ষের পাঠানো গাড়িতে করেই গাছটি নিরাপদে এনে এখানে রোপণ করা হয়। মাটি বদল ও নতুন পরিবেশে আসার মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে গাছটির বুক চিরে নতুন কাণ্ড গজাতে শুরু করে। তবে তৎকালীন সময়ে উদ্যান কর্তৃপক্ষ কোনো লিখিত সংরক্ষণ না করায় গাছটি প্রদানকারী সেই ব্যক্তির সুনির্দিষ্ট নাম ও পরিচয় আর জানা যায়নি।
গাছটি যখন প্রথম উদ্যানে রোপণ করা হয়েছিল, তখন কর্মরত কর্মচারীদের মধ্যে একজন ছিলেন মালি আবদুল আলিম। দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে তিনি জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে মালির দায়িত্ব পালন করে আসছেন। গত ১৩ অক্টোবর মালি আবদুল আলিম গণমাধ্যমকে জানান, যিনি এই গাছটি দান করেছিলেন, তাঁর মায়ের এটি অত্যন্ত আদরের ও শখের গাছ ছিল। মায়ের প্রয়াণের পর তাঁর স্মৃতিকে চিরদিন বাঁচিয়ে রাখতেই মূলত গাছটি তারা উদ্যানে দান করেছিলেন।
এদিকে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্যাকটাসের জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমান সময়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষ নিজ বাসার ছাদে, জানালার পাশে, বারান্দায় কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলের টেবিলে শখ করে ক্যাকটাস চাষ করছেন। ঘরের অন্দরমহলের সৌন্দর্য বহুগুণ বাড়িয়ে তোলার জন্যই মূলত এগুলো রোপণ করা হয়। এমনকি অনেকে এখন বাণিজ্যিকভাবে ক্যাকটাস উৎপাদন ও বিক্রি করে আর্থিক লাভের মুখও দেখছেন।
রাজধানীর এই জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের ভেতরে ক্যাকটাসের জন্য সম্পূর্ণ আলাদা একটি স্বতন্ত্র বাগান গড়ে তোলা হয়েছে, যা ‘ক্যাকটাস হাউস’ নামে পরিচিত। এই বিশেষ বাগানটিতে বর্তমানে ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ৭২ প্রজাতির ক্যাকটাস সংরক্ষিত রয়েছে। উল্লেখযোগ্য প্রজাতির মধ্যে এখানে মেলোক্যাকটাস, ম্যামেলারিয়া ক্যাকটাস, নটো ক্যাকটাস, জিমনো ক্যালাইসিয়াম এবং ফেরোক্যাকটাস শোভা পাচ্ছে।
এছাড়াও এই সংগ্রহশালায় রয়েছে গোল্ডেন ব্যারেল, ওল্ড ম্যান, ডিসকো ক্যাকটাস, জিমনোক্যালিসিয়াম ও ক্লিস্টোক্যাকটাসের মতো আকর্ষণীয় সব প্রজাতি। এই বিশাল সংগ্রহশালার মধ্যে সবচেয়ে প্রবীণ বা পুরোনো ক্যাকটাসটি হলো গোল্ডেন ব্যারেল প্রজাতির। উদ্ভিদ বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী, এই প্রাচীন ক্যাকটাসটির বয়স প্রায় ৩০ বছরের কাছাকাছি।
উদ্যানের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ক্যাকটাসের এই সমৃদ্ধ বাগানটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৯২ সালে। বর্তমানে এখানে থাকা ক্যাকটাসগুলোর অধিকাংশই প্রতিবেশী দেশ নেপাল, ভারত এবং থাইল্যান্ড থেকে সংগ্রহ করে আনা হয়েছে। ক্যাকটাস পরিবারের অন্তর্ভুক্ত সমস্ত উদ্ভিদের বাহ্যিক গঠন হুবহু এক রকম নয়।
পরিবারটির কিছু প্রজাতি আকৃতিতে খুবই ছোট ও পুরোপুরি গোল, আবার কিছু রয়েছে বেশ চ্যাপ্টা ধরনের। অন্যদিকে কিছু নির্দিষ্ট প্রজাতি একদম সোজা স্তম্ভের মতো আকাশচুম্বী হয়ে ওপরের দিকে বাড়তে থাকে। এই উদ্ভিদের কাণ্ডের ভেতরে পানি জমিয়ে রাখার বিশেষ প্রাকৃতিক ক্ষমতা রয়েছে, যা চরম শুষ্ক ও খরা আবহাওয়াতেও এদের বেঁচে থাকতে সহায়তা করে।
প্রতিদিনই দেশের নানা প্রান্ত থেকে বিভিন্ন বয়সি ও শ্রেণি-পেশার মানুষ এই ক্যাকটাস হাউসটি দেখতে ছুটে আসেন। সাধারণ দর্শনার্থীদের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গবেষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও তাদের নির্ধারিত একাডেমিক পড়াশোনার অংশ হিসেবে এখানে মাঠ সফরে আসেন।
গত ১৩ অক্টোবর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ৫৪তম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা এই উদ্যানে আসেন। তাঁদের শিক্ষা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে নির্ধারিত ‘সার্ভেয়িং অ্যান্ড স্টাডি ট্যুর’ কোর্সের ব্যবহারিক ক্লাসের জন্য এই ফিল্ড ট্রিপের আয়োজন করা হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট বিভাগের কতিপয় সম্মানিত শিক্ষকও শিক্ষার্থীদের এই শিক্ষাসফরে সরাসরি উপস্থিত ছিলেন।
শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের এই দলটি উদ্যানের চারপাশের বিভিন্ন বিভাগ ঘুরে ঘুরে দেখেন। এই মাঠ সফরের অংশ হিসেবে তাঁরা উদ্ভিদ উদ্যানের ভেতরের এই ক্যাকটাস-বাগানটিও অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে পরিদর্শন করেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সাদিয়া তাসনীম গত ১৩ অক্টোবর প্রথম আলোকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় জানান, এর আগে কখনো এত বিশাল পরিমাণ ক্যাকটাস তিনি একসঙ্গে দেখেননি। এখানে এসে তিনি একসঙ্গে বহু প্রজাতির ব্যতিক্রমী ক্যাকটাস দেখতে পেয়েছেন এবং অপরিচিত এই গাছগুলোর বাহারি রং ও গড়ন তাঁর মন কেড়েছে।
উদ্দ্যানে সংরক্ষিত এই ক্যাকটাসগুলো মূলত বিভিন্ন ধরনের উচ্চতর গবেষণা এবং শিক্ষামূলক কাজে নিয়মিত ব্যবহার করা হয়। এই বিষয়ে জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের পরিচালক শওকত ইমরান আরাফাত গণমাধ্যমকে জানান, দেশের বিভিন্ন নামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও গবেষকেরা নিয়মিত এখানে এসে তাদের একাডেমিক গবেষণা পরিচালনা করেন। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি গবেষকদের আগমনই প্রমাণ করে যে বাগানটির গুরুত্ব কতটা অপরিসীম।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর