নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার একটি রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে গভীর রাতে সশস্ত্র ব্যক্তিদের নিয়োগ করা হয় এক রোমহর্ষক অভিযানের মাধ্যমে। সেখানে ঘুমন্ত অবস্থায় অস্ত্রের মুখে দুজনকে জোরপূর্বক ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরবর্তী সময়ে তাদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হলে একজন নিহত হন এবং গুরুতর আহত অবস্থায় অপরজনকে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রাখা হয়।
গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে উখিয়ার জামতলী আশ্রয়শিবিরের (ক্যাম্প-১৫) ডি-৩ ব্লকে এই অপরাধ সংঘটিত হয়। স্থানীয় বিভিন্ন সূত্র জানায়, এই মর্মান্তিক ঘটনার শিকার মৃত যুবকের নাম মো. আয়াছ (২০) এবং আহত ব্যক্তির নাম সৈয়দ মোহাম্মদ (২৪)। তারা দুজনেই ওই রাতে একটি নির্দিষ্ট ঘরে ঘুমাচ্ছিলেন এবং পরিচয় সূত্রে তারা সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্থমেশনের (আরএসও) সদস্য বলে জানা গেছে।
রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের দায়িত্বশীল একাধিক নেতার দাবি অনুযায়ী, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) ক্যাডাররা সরাসরি জড়িত রয়েছে। ঘটনার দিন গভীর রাতে আরসার একজন ক্যাম্প কমান্ডারের নেতৃত্বে আনুমানিক ১০ থেকে ১২ জনের একটি সশস্ত্র দল জামতলী ক্যাম্পের ডি ব্লকের ওই ঘরটিতে হানা দেয় এবং ঘুমন্ত আয়াছ ও সৈয়দ মোহাম্মদকে জিম্মি করে বাইরে নিয়ে যায়।
অপহরণের পর ত্রাস সৃষ্টির মাধ্যমে অপরাধীরা অপহৃতদের মুক্তির জন্য তিন লাখ টাকা চাঁদা বা মুক্তিপণ দাবি করে বলে জানা যায়। এরপর শুক্রবার ভোর ছয়টার দিকে উভয়কে আরসার নির্দিষ্ট এক কমান্ডারের বাসভবনে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাদের হাত ও পা নির্দয়ভাবে বেঁধে শারীরিক নির্যাতন চালানো হয় এবং একপর্যায়ে আয়াছ নিস্তেজ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন ও ঘটনাস্থলেই তার প্রাণহানি ঘটে।
খবর পেয়ে সকাল আটটার দিকে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন-৮) একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয় এবং নিহতের মরদেহ উদ্ধার করে। একই সঙ্গে গুরুতর জখম হওয়া সৈয়দ মোহাম্মদকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে ক্যাম্পের ভেতরের এমএসএফ হাসপাতালে পাঠানো হয়, যেখানে তিনি বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
এ বিষয়ে উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান গণমাধ্যমকে জানান যে, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত সব অপরাধীকে আইনের আওতায় আনতে পুলিশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, উদ্ধারকৃত মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে এবং এই বিষয়ে থানায় নিয়মিত মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
উখিয়ার এই রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে খুন, অপহরণ ও টার্গেট কিলিংয়ের ঘটনা নতুন কোনো বিষয় নয় এবং এর আগেও এমন বহু নৃশংসতা ঘটেছে। ক্যাম্পের অভ্যন্তরীণ সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি রক্ষা ও নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের তথ্যভান্ডার পর্যালোচনা করলে এমন অপরাধের দীর্ঘ ইতিহাস দেখতে পাওয়া যায়।
চলতি বছরের ১০ অক্টোবর ঠিক এই ১৫ নম্বর জামতলী আশ্রয়শিবির থেকেই নিখোঁজ হওয়ার মাত্র দুই দিন পর মো. ওমাইর (৪) নামের এক অবুঝ শিশুর বস্তাবন্দী মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। ওই শিশুটির পরিবার জানিয়েছিল যে অপহরণকারীরা মুক্তিপণ হিসেবে তার পিতার কাছে ৫০ হাজার টাকা দাবি করেছিল এবং এই ন্যক্কারজনক ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আবদুর রহমান ও তার স্ত্রী আনসার বেগমকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছিল।
এ ছাড়া গত জুনে উখিয়ার অপর একটি অর্থাৎ বালুখালী আশ্রয়শিবিরের (ক্যাম্প-৯) পাঁচ বছর বয়সী শিশু আলহামকে একইভাবে অপহরণ করা হয়েছিল। অপহরণকারীরা শিশুটির পরিবারের কাছ থেকে তিন লাখ ৮০ হাজার টাকা মুক্তিপণ আদায় করার পরও তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে।
এরও আগে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে উখিয়ার ১৯ নম্বর ক্যাম্প থেকে শিশু আরাকানকে অপহরণের পর দুর্বৃত্তরা তার শরীরের গলা পর্যন্ত মাটিচাপা দিয়ে অমানবিক নির্যাতন চালায়। সেই সময় মুক্তিপণ আদায়ের উদ্দেশ্যে শিশুটির একটি ভিডিওচিত্রও ধারণ করা হয়েছিল এবং পরবর্তীতে নানা দেনদরবার ও মুক্তিপণের বিনিময়ে তাকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর