নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
বিখ্যাত ব্যক্তিত্বদের জীবনাবসান ঘটলেও তাঁদের শিল্পকর্মের জনপ্রিয়তা চিরকাল বেঁচে থাকে। গান, চলচ্চিত্র, সাহিত্য এবং নানা বিনোদন মাধ্যমের স্বত্ব থেকে মৃত্যুর পরও তাঁদের বিপুল পরিমাণ অর্থ আয় হতে থাকে। এই বিপুল উপার্জনের সুফল ভোগ করে থাকেন তাঁদের মনোনীত উত্তরাধিকারীগণ।
বিশ্বখ্যাত ফোর্বস ম্যাগাজিনের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মৃত তারকাদের মধ্যে সর্বোচ্চ আয় অর্জন করেছেন মার্কিন সংগীত প্রণেতা কুইন্সি জোন্স। গত মার্চ মাসে তাঁর উত্তরাধিকারীরা সংগীত ও বিনোদন খাতের অধিকাংশ সম্পদের মালিকানা হস্তান্তর করেন। হারবারভিউ ইক্যুইটি পার্টনার্স নামক সংগীতস্বত্ব ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানের নিকট এসব স্বত্ব বিক্রি করা হয়। ফোর্বসের হিসাব বিবরণী প্রকাশ করে জানায় যে, ওই চুক্তির আনুমানিক মূল্য ছিল প্রায় ১৫ কোটি মার্কিন ডলার।
এই আয়ের তালিকায় ১৪ কোটি ডলার উপার্জন নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন পপসম্রাট মাইকেল জ্যাকসন। শিশুসাহিত্যিক ড. সিউস ৮ কোটি ডলার সংগ্রহ করে এই ক্রমতালিকার তৃতীয় স্থান অধিকার করেছেন। জনপ্রিয় সংগীত ব্যক্তিত্ব এলভিস প্রিসলি ৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার আয় নিয়ে চতুর্থ অবস্থানে রয়েছেন। পঞ্চম স্থানে নাম রয়েছে মার্কিন অঙ্গরাজ্য টেনেসির সংগীত মহাতারকা ডলি পার্টনের, যাঁর আয় ৪ কোটি ৬০ লাখ ডলার। মূলত তাঁদের উত্তরাধিকারীগণ মেধাস্বত্ব থেকে এই অর্থ লাভ করেছেন। গত বছরের ১ অক্টোবর থেকে চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ের আর্থিক অর্জনের ওপর ভিত্তি করে এই তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে।
গত বছরের শেষ প্রান্তিকে ৯১ বছর বয়সে অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন কুইন্সি জোন্স। তাঁর উত্তরাধিকারীরা কেবল বিনোদন জগতের সম্পদই নয়, বরং শিল্পী হিসেবে তাঁর ব্যক্তিগত গানের স্বত্ব এবং 'সোল বোসা নোভা'র মতো বিখ্যাত গানের প্রকাশনা স্বত্বও পুরোপুরি বিক্রি করে দিয়েছেন।
কুইন্সি জোন্সের মতো এমন বর্ণিল ও বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী সংগীত প্রযোজক বিশ্বমঞ্চে অত্যন্ত বিরল। মাইকেল জ্যাকসনের ঐতিহাসিক 'থ্রিলার' থেকে শুরু করে ফ্র্যাঙ্ক সিনাত্রার 'ফ্লাই মি টু দ্য মুন' পর্যন্ত বিভিন্ন ধারার অসংখ্য জনপ্রিয় সৃষ্টির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন তিনি। এছাড়া রে চার্লস, ডোনা সামার, মাইলস ডেভিস, কাউন্ট বেসি এবং অ্যারেথা ফ্র্যাঙ্কলিনের মতো কিংবদন্তি শিল্পীদের সংগীতজীবন গড়ে তোলার পেছনে জোন্সের ভূমিকা ছিল অপরিসীম।
তিনি স্বনামধন্য 'ভিব ম্যাগাজিন'-এর অন্যতম সহপ্রতিষ্ঠাতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। জনপ্রিয় টেলিভিশন ধারাবাহিক 'দ্য ফ্রেশ প্রিন্স অব বেল-এয়ার'-এর নির্বাহী প্রযোজক হিসেবেও তাঁর কাজের সুখ্যাতি রয়েছে। ১৯৮৫ সালে তিনি বিখ্যাত 'উই আর দ্য ওয়ার্ল্ড' গানটির সংগীত পরিচালনা সম্পন্ন করেন। একই বছরে মুক্তি পাওয়া স্টিভেন স্পিলবার্গের চলচ্চিত্র 'দ্য কালার পার্পল'-এর সুর ও সংগীত পরিচালনার সুবাদে তিনি অস্কারে দুটি মর্যাদাপূর্ণ মনোনয়ন লাভ করেছিলেন।
এদিকে ফোর্বস ম্যাগাজিন সর্বপ্রথম ২০০১ সালে মৃত তারকাদের আয়ের বাৎসরিক তালিকা প্রকাশ করেছিল। সেই অভিষেক তালিকার শীর্ষে অবস্থান করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সংগীত কিংবদন্তি এলভিস প্রিসলি। পরবর্তী সময়ে দেখা যায় যে, বিগত ২৫ বছরের দীর্ঘ পরিসংখ্যানে শীর্ষ দশের তালিকা থেকে কখনো বাইরে যাননি রক অ্যান্ড রোলের এই অবিসংবাদিত সম্রাট।
২০০১ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত টানা পাঁচ বছর এই তালিকার চূড়ায় ছিলেন রক অ্যান্ড রোলের এই সম্রাট। এই নির্দিষ্ট সময়সীমায় তাঁর উত্তরাধিকারীরা সর্বমোট ১২০ কোটি ডলার আয় করেছিলেন। উল্লেখ্য যে, তিনি ১৯৭৭ সালে না ফেরার দেশে চলে যান।
চলতি ২০২৬ সালেও নিজের সেই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা সফলভাবে বজায় রেখেছেন এলভিস প্রিসলি। ফোর্বস প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, মৃত্যুর দীর্ঘ কয়েক দশক অতিক্রান্ত হওয়ার পরও সংগীতের বাইরেও এলভিসের আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা বিদ্যমান। প্রতিবছর শত শত দর্শক তাঁর বিখ্যাত গ্রেসল্যান্ডের প্রাসাদ পরিদর্শনে আসেন। পাশাপাশি তাঁর নাম ও প্রতিকৃতি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া বিভিন্ন পণ্যসামগ্রী বিক্রি করেও কোটি কোটি ডলার অর্জিত হচ্ছে।
গ্রেসল্যান্ড ও নানা পণ্যের রয়্যালটির পাশাপাশি চলতি বছর চলচ্চিত্র খাত থেকেও মোটা অঙ্কের আয় এসেছে এলভিসের ফান্ডে। বাজ লুরম্যানের পরিচালনায় নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র 'ইপিক: এলভিস প্রিসলি ইন কনসার্ট' বিশ্বব্যাপী মুক্তি পাওয়ার পর বক্স অফিসে ২ কোটি ৩৫ লাখ ডলার আয় করতে সক্ষম হয়।
তাছাড়া লাস ভেগাসে এলভিসের একটি আকর্ষণীয় হলোগ্রাম শো আয়োজনের পরিকল্পনা চলছে বলেও ফোর্বসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি এলভিসের সংগীতের স্বত্বাধিকারী পক্ষ গত ২৩ অক্টোবর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিকের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেছেন। সংশ্লিষ্ট মহলের অভিযোগ, ওই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানটি তাদের স্বত্ব বা কপিরাইট আইন লঙ্ঘন করেছে।
ফোর্বস পত্রিকার তথ্য অনুযায়ী, ২০০৩ সালের পর এই ২০২৬ সালেই এলভিসের উত্তরাধিকারীরা সবচেয়ে বেশি অর্থ উপার্জন করেছেন। তৎকালীন ২০০৩ সালে ১০ কোটি ডলার আয় নিয়ে তিনি দ্বিতীয় অবস্থানে ছিলেন। ধারণা করা হয় যে, তার আগের বছর বাজ লুরম্যানের পরিচালনায় এলভিসের জীবনভিত্তিক চলচ্চিত্র মুক্তি পাওয়ার কারণে মৃত্যুর বহু পরেও তাঁর আয়ের পরিমাণ বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালে প্রায় ৫ কোটি ডলার আয় করার সুবাদে ফোর্বসের তালিকায় চতুর্থ স্থানে নেমে এসেছিলেন এলভিস। এরপর ২০২৫ সালে ১ কোটি ৭০ লাখ ডলার মাত্র আয় করায় তাঁর অবনমন ঘটে এবং তিনি সপ্তম অবস্থান গ্রহণ করেন।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর