নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
বিশ্বখ্যাত প্রাচীন রোমান নগরী পম্পেইয়ের ‘ভিলা অব দ্য মিস্ট্রিজ’-এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ে যে প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজ চালানো হয়েছে, তাতে সমাজের উঁচুস্তরের বিত্তবানদের বিলাসবহুল আবাসস্থলের চেয়ে খেটে খাওয়া সাধারণ দাস-দাসীদের কোয়ার্টার এবং রান্নার জায়গার ওপর অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমেই মূলত অতীতের সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা এবং তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে সম্পূর্ণ নতুন ও চমকপ্রদ সব তথ্য উন্মোচিত হচ্ছে।
বর্তমানে পরিচালিত এই খনন অভিযানগুলো যেন একেকটি জীবন্ত টাইম ক্যাপসুল হিসেবে কাজ করছে। এর বিভিন্ন এলাকায় কোথাও আবিষ্কৃত হয়েছে পশুর মতো অমানবিক কায়দায় আটকে রেখে রুটি উৎপাদনের প্রাচীন বেকারি ও দাসদের বন্দিশালা, আবার কোথাও খুঁজে পাওয়া গেছে গ্রিক পুরাণভিত্তিক অত্যন্ত রঙিন সব দেওয়ালচিত্র বা ফ্রেস্কো।
ইতিহাসের এই অনন্য উপাদানগুলোকে বর্তমানের মানুষের কাছে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে সম্প্রতি সুইজারল্যান্ডের লৌজানে পম্পেইয়ের সুপ্রাচীন ইতিহাসকে ৩৬০ ডিগ্রি ভিআর বা ভার্চুয়াল রিয়েলিটি প্রজেকশনের মাধ্যমে জীবন্ত রূপ দেওয়া হয়েছে। সেখানে আসা দর্শনার্থীরা প্রাচীন গ্ল্যাডিয়েটরদের রোমাঞ্চকর লড়াই কিংবা ঐতিহাসিক ভিলার আঁকাবাঁকা অলিগলি বাস্তবে ঘুরে দেখার এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা লাভ করছেন।
গত কছরগুলোতে এই প্রাচীন নগরীর বিভিন্ন প্রকোষ্ঠ থেকে চমৎকার সব রঙিন ফ্রেস্কো বা দেওয়ালচিত্র উদ্ধার করা হয়েছে। পাশাপাশি, গ্রিক মিথলজির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র এবং আধুনিক পিৎজার প্রাচীন পূর্বসূরি তথা সুস্বাদু ফ্যাটব্রেডের মতো খাবারের চিত্র আঁকা নানা ধরনের ট্রে ও রান্নার পাত্রের সন্ধান পাওয়া গেছে, যা তাদের অত্যন্ত উন্নত জীবনধারা এবং সুসমৃদ্ধ খাদ্যাভ্যাসের পরিচয় বহন করে।
উনিশ শতকের শেষভাগে বিশিষ্ট প্রত্নতাত্ত্বিক জুসেপ্পে ফিওরেল্লী এক যুগান্তকারী ও অভিনব পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছিলেন। তিনি গভীরভাবে লক্ষ্য করেন যে, আগ্নেয়গিরির ছাইয়ের নিচে ঢাকা পড়ে যাওয়া মৃতদেহগুলো দীর্ঘ শত শত বছর ধরে পচে কঙ্কাল হয়ে গেলেও ছাইয়ের শক্ত স্তরের ভেতরে অবিকল ফাঁপা অবয়ব বা গহ্বর রয়ে গেছে।
ওই প্রত্নতাত্ত্বিক সেই ফাঁপা স্থানগুলোতে তরল প্লাস্টার ঢেলে দেওয়ার এক অভিনব কৌশল বের করেন, যার ফলে মৃত্যুকালীন সময়ে মানুষের শেষ মুহূর্তের নিখুঁত ভঙ্গি ও মুখের অবয়ব হুবহু ফুটে ওঠে। বর্তমানেও পম্পেইয়ের বিভিন্ন প্রদর্শনীতে রাখা এই প্লাস্টার কাস্টগুলো দেখে দর্শনার্থীরা আজও একইভাবে স্তব্ধ ও বিস্ময়াভিভূত হয়ে যান।
গত কয়েক দশক ধরে প্রচলিত সনাতন খনন পদ্ধতির পাশাপাশি অত্যন্ত আধুনিক সব প্রযুক্তি প্রয়োগ করে পম্পেইয়ের অন্ধকারের লুকিয়ে থাকা ইতিহাস বের করে আনা হচ্ছে। এসব প্রযুক্তির মধ্যে ড্রোন স্ক্যানিং, থ্রিডি লেজার ম্যাপিং, গ্রাউন্ড পেনিট্রেটিং রাডার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
ভেসুভিয়াস আগ্নেয়গিরির উত্তপ্ত ছাই কেবল একটি সমৃদ্ধশালী শহরকেই চিরতরে গ্রাস করেনি, বরং এটি বিগত দুই হাজার বছর ধরে তৎকালীন মানুষের হাসি-কান্না, সাজসজ্জা এবং তাদের বেঁচে থাকার ছোটখাটো স্মৃতির অমূল্য গল্পগুলোকে অত্যন্ত যত্নে আগলে রেখেছিল।
সূত্র: আজকের পত্রিকা
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর