নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
হ্যালোইন উৎসবের আবহের মধ্যেই ফ্রান্সে আজ শনিবার টানা তৃতীয় সপ্তাহের মতো বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। দুই সপ্তাহ আগের সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও লুটপাটের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পুনরাবৃত্তি কোনোভাবেই হতে দিতে চায় না দেশটির প্রশাসন। সম্ভাব্য সব ধরনের সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলা এড়াতে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষ আজ সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরের দোকানপাটের সামনে ও প্রবেশদ্বারে কাঠের পাটাতন বসিয়ে তা ঢেকে দেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার লক্ষ্যে মাঠে নামানো হয়েছে প্রায় ৭০ হাজার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য।
আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে মাত্র ছয় মাস বাকি রয়েছে, যার ফলে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনের পরিবেশ দিন দিন আরও বেশি উত্তপ্ত হয়ে উঠ আসছে। সাম্প্রতিক জনমত জরিপগুলোর ফলাফলে দেখা যাচ্ছে যে, কট্টর ডানপন্থী নেত্রী মেরিন লো পেন বেশ ভালো ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছেন। এমন একটি স্পর্শকাতর পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ চলতি সপ্তাহে মন্তব্য করেছেন যে, জাতীয় নির্বাচনের এত কাছাকাছি সময়ে ফরাসি ভূখণ্ডে এমন মাত্রার রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেওয়াটা মোটেই স্বাভাবিক বিষয় নয়।
গত ১৭ অক্টোবরের সংঘটিত সহিংসতার যাতে কোনোমতেই পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সেই লক্ষ্যেই মূলত গত সপ্তাহের মতো আজকেও প্রায় ৭০ হাজার নিরাপত্তাকর্মীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। শনিবার সকালের দিকে রাজধানী প্যারিসের পূর্বাঞ্চলীয় এলাকাগুলোতে হেলিকপ্টারের একটানা গর্জন এবং মাঝে মাঝেই সাইরেনের তীব্র শব্দ শোনা গেছে। রাজধানীতে যাতায়াতকারী মানুষের সুরক্ষায় আজ চল্লিশটিরও বেশি মেট্রোস্টেশন সম্পূর্ণ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং এর পাশাপাশি ট্রাম চলাচলের ক্ষেত্রেও নানা ধরনের বিঘ্ন ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা লরাঁ নুনেজের একজন ঘনিষ্ট সহযোগী গণমাধ্যমের কাছে জানিয়েছেন যে, আজকেও দুই সপ্তাহ আগের সেই ভয়াবহ সহিংসতার অনুরূপ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। উল্লেখ্য, সেই নির্দিষ্ট সময়টিতে প্রকাশ্য সংঘর্ষ, বিভিন্ন দোকানপাটে নগ্ন লুটপাট এবং সরকারি স্থাপনায় অগ্নিসংযোগের যেসব চিত্র ধারণ করা হয়েছিল, তা পরবর্তীতে বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছিল।
মূলত জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ভার বৃদ্ধি, সামাজিক বৈষম্য এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পরিবেশের অবনতির তীব্র প্রতিবাদ জানানোর মাধ্যমেই এই আন্দোলন দানা বেঁধে উঠেছিল। ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের বিভিন্ন কর্মী, নানা শ্রমিক সংগঠন এবং স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা এই গণআন্দোলনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিচ্ছেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অত্যন্ত কঠোর অবস্থান এবং এই আন্দোলনের বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারী গুরুতরভাবে আহত হওয়ার পর মূলত এই আন্দোলনের দাবিদাওয়ার পরিধি আরও অনেক বেশি বিস্তৃত হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে আন্দোলনকারীরা কেবল নিজেদের দাবি নিয়েই ক্ষান্ত নন, বরং নাগরিক স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ প্রদর্শনের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার জোরালো দাবিও তুলে ধরেছেন।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ইউরোপ মহাদেশের অন্যান্য দেশের বিভিন্ন স্থানেও তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে অনুরূপ বিক্ষোভের ঢেউ দেখা যাচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় আজকের এই দিনে জার্মানির বিভিন্ন শহরেও বিক্ষোভের বিভিন্ন কর্মসূচি নির্ধারিত রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভেতরের দায়িত্বশীল মহলে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বেশ ভালো রকমের উদ্বেগ বিরাজ করছে বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের এক কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন যে, আজকের এই পুরো পরিস্থিতি যে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই সম্পূর্ণ নির্বিঘ্নে সমাপ্ত হবে, এমনটি ভেবে নেওয়ার পেছনে তাদের কাছে বিন্দুমাত্র যৌক্তিক কারণ নেই।
ফ্রান্সের চেম্বার অব কমার্সের সম্মানিত সভাপতি আলাঁ দি ক্রেসেনজো গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, দেশটির ব্যবসায়ী সমাজ চরম উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। দেশের বিশিষ্ট সম্প্রচারমাধ্যম ফ্রান্স ইন্টারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, ব্যবসায়ীরা মূলত এই শনিবারের দিনটি দ্রুত শেষ হওয়ার প্রতীক্ষায় তাকিয়ে আছেন।
ক্রেসেনজো আরও যোগ করে বলেন যে, তাদের কাছে বর্তমানে যে ধরনের তথ্য এসে পৌঁছাচ্ছে, তাতে হ্যালোইনের উপস্থিতি পুরো পরিস্থিতিকে আরও অনেক বেশি জটিল ও দুর্বোধ্য করে তুলছে। কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন যে, এই উৎসবে মানুষ সাধারণত নানা ধরনের মুখোশ পরে রাস্তাঘাটে বা বাইরে বেরিয়ে আসবে।
আজকের এই নির্ধারিত বিক্ষোভের ঠিক আগে ফ্রান্সের বিভিন্ন বড় বড় শহরের দোকান ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সামনের অংশগুলো কাঠের মজবুত পাটাতন দিয়ে ঢেকে ফেলা হয়েছে। বিশেষ করে প্যারিসের একটি দোকানের সামনের কাঠের পাটাতনের গায়ে কালো রঙের কালিতে একটি আবেগঘন বার্তা লিখে দেওয়া হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে যে, এই কাঠের প্রাচীরের আড়ালে কোনো ধরনের রাজনৈতিক ক্ষমতা বা কোনো শত্রু লুকিয়ে নেই, বরং এখানে শুধু একটি সাধারণ পরিবার ও তাদের পরিশ্রমের ফল রয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংবাদমাধ্যমের সামনে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে, জনশৃঙ্খলা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হওয়ার ঝুঁকি এই মুহূর্তে অত্যন্ত উঁচুতে অবস্থান করছে। যদিও আজকের এই বিক্ষোভের আনুষ্ঠানিক অনুমতি দেওয়া হয়েছে, তবে তা কোনো অবস্থাতেই শহরের একদম কেন্দ্রস্থলে করতে দেওয়া হবে না বলে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
প্যারিসের পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর ঠিক উপকণ্ঠের একটি নির্দিষ্ট এলাকায় মিছিল করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে এর বিপরীতে বিক্ষোভকারীরা দৃঢ়ভাবে চাচ্ছিলেন যে তারা যেন সরাসরি মধ্য প্যারিসের জনবহুল এলাকায় এসে জমায়েত ও সমাবেশ করতে পারেন।
বার্তা সংস্থা এএফপির সংবাদকর্মীদের হাতে একটি আদালতের রায়ের বিশদ বিবরণ এসে পৌঁছেছে। সেই নথিতে দেখা যায়, ফ্রান্সের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক আদালত কনসেই দেতা আজ নিম্ন আদালতের সেই পূর্ববর্তী রায়টি বাতিল করে দিয়েছে, যে রায়ের মাধ্যমে মূলত বিক্ষোভের আয়োজকদের প্রস্তাবিত মধ্য প্যারিসের নির্দিষ্ট মিছিলের পথটির অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ গণমাধ্যমকে অবহতি দিয়ে বলেছেন যে, আজকের সন্ধ্যার এই হ্যালোইন উৎসবকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে নানা ধরনের জমায়েতের ডাক দিয়ে বেশ কিছু সন্দেহজনক পোস্ট আপলোড করা হয়েছে, যা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ইতোমধ্যে শনাক্ত করেছে। এসব বিতর্কিত সামাজিক মাধ্যমের পোস্টে অংশ নেওয়া বিক্ষোভকারীদের সরাসরি ‘বিপ্লব’ সংঘটিত করার জোরালো আহ্বান জানানো হয়েছে। তাছাড়া কিছু কিছু পোস্টে ‘অন্ধকারের রাত’ উদযাপন করার জন্য নির্দিষ্ট সাজসজ্জা নিয়ে সবাইকে একত্রে জমায়েত হওয়ার কথা প্রচার করা হচ্ছে।
নুনেজ বিশেষভাবে সতর্ক করে বলেছেন যে, মুখের অর্ধাংশ বা পুরো মুখমণ্ডল সম্পূর্ণরূপে ঢেকে রাখে এমন কোনো ধরনের বিশেষ মুখোশ বা আবরণ পরে বর্তমানের এই বিক্ষোভে কেউ অংশ নিতে পারবে না।
গত গতকাল শুক্রবার রাজধানী প্যারিসের একটি বিশেষ পোশাকের দোকানে সাধারণ ক্রেতাদের প্রচণ্ড ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। ওই দোকানটির ব্যবস্থাপক দিদিয়ের জারসালে সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, দোকানে আসা প্রতিটি ক্রেতা ঠিক কী নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে পোশাক ক্রয় করছেন, তা তাদের পক্ষে প্রত্যেককে আলাদাভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা কিছুতেই সম্ভব নয়। তিনি খুব স্পষ্ট করেই বলেছেন যে, তারা এখানে পুলিশের দায়িত্ব পালন করার জন্য আসেননি।
গত ১৭ অক্টোবরের সেই বড় ধরনের সংঘর্ষ, ব্যাপক লুটপাট এবং ধ্বংসাত্মক ভাঙচুরের সম্পূর্ণ ঘটনার পেছনে মূলত নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা কাঠামোর চরম ব্যর্থতা দায়ী ছিল বলে ফরাসি কর্তৃপক্ষ নিঃসংকোচে স্বীকার করে নিয়েছে। ওই ঘটনার পর থেকেই মূলত বিক্ষোবের ওপর নানান ধরনের কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে এবং দেশের কয়েকটি প্রধান শহরে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কারফিউ জারির মাধ্যমে সামগ্রিক পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনার নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
আজ শনিবার এবং আগামী রোববার—এই দুই দিন প্রতিদিন রাত ১১টা থেকে পরের দিন সকাল ৬টা পর্যন্ত প্যারিসের ঐতিহাসিক রিপাবলিক এবং শাতলে-লে-আল এলাকায় কঠোর কারফিউ বলবৎ থাকবে।
উন্নত মানের ও আধুনিক শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবিতে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ কয়েক সপ্তাহের ধারাবাহিক বিক্ষোভের ঠিক পরপরই বর্তমানের এই তীব্র রাজনৈতিক অস্থিরতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। জীবনযাত্রার আকাশচুমী ব্যয়ভার নিয়ে সাধারণ মানুষের চলমান প্রতিবাদের পাশাপাশি, ঠিক গত সপ্তাহে প্যারিসের ঠিক বাইরে সংঘটিত একটি আকস্মিক গুলির ঘটনায় একজন নির্মমভাবে নিহত হয়েছেন এবং আরও সাতজন গুরুতর আহত হয়েছেন। আহত হওয়া এই ব্যক্তিদের মধ্যে এগারো বছর বয়সি একটি ছোট মেয়েও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। মর্মান্তিক এই ঘটনায় যারা নিহত ও আহত হয়েছেন, তাদের একটি বড় অংশই অভিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ। ওই সশস্ত্র হামলার ঘটনার পরপরই মূলত সমাজের বিভিন্ন স্তরে বর্ণবাদী বিদ্বেষের স্বাভাবিকীকরণের অপচেষ্টার বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ ও বিক্ষোভ প্রদর্শিত হয়েছে।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর