নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
রাজধানীর ওয়ারী এলাকায় নিজ ফ্ল্যাটের ভেতর আধুনিক ও বিশেষ ল্যাবরেটরি বানিয়ে সিনথেটিক ঘরানার মাদক 'কুশ' উৎপাদনের অভিযোগে এক তরুণকে আটক করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। অভিযুক্ত ২২ বছর বয়সী তৌসিফ হাসান দীর্ঘদিন ধরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নাগালের বাইরে ছিলেন এবং তিনি আমেরিকার নাগরিক হিসেবে পরিচিত। আমেরিকার মাটিতে থেকেও আধুনিক দূরনিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তির অপব্যবহার করে তিনি ওয়ারীর ওই নির্দিষ্ট ফ্ল্যাটের কুশ উৎপাদনের কার্যক্রম সচল রাখতেন বলে অনুসন্ধানে প্রকাশ পেয়েছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগীয় গোয়েন্দা ইউনিটের একটি দল গত রবিবার সকাল সাড়ে আটটা থেকে নয়টার মধ্যে ওয়ারী থানার র্যাংকিন স্ট্রিটের ওই আবাসিক ভবনে সাড়াশি অভিযান পরিচালনা করে তৌসিফকে পাকড়াও করে। সম্প্রতি তিনি আমেরিকা থেকে নিজের দেশে প্রত্যাবর্তন করেছেন বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর।
অধিদপ্তরের ভেতরের একটি সূত্র প্রকাশ করেছে যে, গত জানুয়ারি মাসে একটি আন্তর্জাতিক ডাক সেবার মাধ্যম ব্যবহার করে আমেরিকার দিকে ইয়াবা ট্যাবলেট পাঠানোর অপচেষ্টা সংক্রান্ত ঘটনা উদ্ঘাটন করতে গিয়েই মূলত এই তরুণ ও তাঁর গোপন ফ্ল্যাটের সন্ধান লাভ করে গোয়েন্দারা। পরবর্তীতে সেই ফ্ল্যাটে অভিযান পরিচালনা করে কৃত্রিম উপায়ে কুশ উৎপাদনের উদ্দেশ্যে বিশেষভাবে প্রস্তুত করা একটি গবেষণাগার বা ল্যাবের সন্ধান মেলে।
উক্ত ল্যাব থেকে আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্য থেকে সংগৃহীত কুশের বীজ, পরীক্ষামূলকভাবে চাষ করা উদ্ভিদ, সদ্য সংগ্রহ করা কুশ এবং উৎপাদনের নানা সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছিল। এর পাশাপাশি ফ্ল্যাট থেকে হুক্কা বা সিসা সেবনের নানা উপকরণ এবং বিদেশি মদের বোতলও উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল।
বাসাবাড়ির ছাদের ওপর টিন এবং ফয়েল শিট দিয়ে বিশেষভাবে তৈরি তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম এমন কক্ষেও একাধিক টবের মধ্যে কুশ উৎপাদনের পরিষ্কার প্রমাণ দেখতে পেয়েছিলেন তদন্তকারীরা।
তদন্ত কাজের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তারা জানান যে, অভিযুক্ত তৌসিফ আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে বসবাস করার সুবাদে সেখানে বসেই কুশ উৎপাদনের যাবতীয় কলাকৌশল রপ্ত করেছিলেন। পরবর্তীতে দেশে ফিরে এসে নিজের আবাসে বিশেষায়িত ল্যাব বানিয়ে এই অবৈধ চাষাবাদ শুরু করেন এবং সুদূর বিদেশে বসেও প্রযুক্তির সহায়তায় ল্যাবের ভেতরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণসহ সার্বিক কার্যক্রমের ওপর নজর রাখতেন। এই অপরাধমূলক কার্যক্রমে তাঁর পরিচিত এক তরুণী বান্ধবী তাকে নানাভাবে সহায়তা করে আসছিলেন।
গত জানুয়ারি মাসের দিকে ওই বান্ধবীর সহযোগিতায় জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে ৩২ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট আমেরিকার উদ্দেশ্যে পাঠানোর অপচেষ্টা চালানো হয়েছিল। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিচালিত অভিযানে সেই ইয়াবাগুলো জব্দ করা হয়েছিল এবং এই ঘটনায় ওই বান্ধবী ও ভবনের তত্ত্বাবধায়ককে আগেই গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তাঁদের বিরুদ্ধে পরবর্তীতে টঙ্গী পশ্চিম থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয় এবং সেই মামলায় তৌসিফকে এজাহারভুক্ত পলাতক আসামি হিসেবে দেখানো হয়েছিল।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর জানিয়েছে যে, দীর্ঘ সময় ধরে অভিযুক্ত তৌসিফের বর্তমান ভৌগোলিক অবস্থান নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাঁকে আটকের জন্য தீவிர চেষ্টা চালানো হচ্ছিল। অবশেষে গত রবিবার তাঁকে সফলভাবে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
গ্রেপ্তারের পরবর্তী সময়ে তাঁর শরীরে ডোপ টেস্ট সম্পন্ন করা হলে সেখানে মেথামফিটামিন এবং ক্যানাবিনয়েড নামের অত্যন্ত ক্ষতিকারক দুটি রাসায়নিক উপাদানের উপস্থিতি স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। এই সময় তাঁর কাছ থেকে ১০ পিস মেথামফিটামিনযুক্ত ইয়াবা ট্যাবলেট, ১০০ গ্রাম ওজনের গাঁজা এবং মাদক সেবন করার বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।
প্রাথমিক পর্যায়ের জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্ত তৌসিফ রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকার কুখ্যাত মাদক কারবারিদের নিকট নিয়মিতভাবে ইয়াবা ও কুশ সরবরাহ করার নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে নিজের জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছে নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। তাঁর এই মাদক সংগ্রহ করার উৎস এবং কার সাথে কী ধরনের সংযোগ রয়েছে, সেই সমস্ত বিষয় খতিয়ে দেখতে বর্তমানে নিবিড় অনুসন্ধান চলছে।
এদিকে নিজের কাছে অবৈধভাবে ইয়াবা ও গাঁজা নিজ হেফাজতে রাখার অপরাধে তৌসিফের বিরুদ্ধে প্রচলিত ২০১৮ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী ওয়ারী থানায় নতুন করে একটি মামলা রুজু করা হয়েছে। একই সঙ্গে কুশ উৎপাদনের ল্যাব সংক্রান্ত আগের পুরোনো মামলায় তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার দেখানো হবে বলে জানিয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর