নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
খবর পরিবেশনের পাশাপাশি সমাজের মননশীলতা, মনস্তত্ত্ব এবং বুদ্ধিবৃত্তিক অগ্রযাত্রার পথ তৈরি করায় সংবাদমাধ্যমের গুরুত্ব অপরিসীম। সুনির্দিষ্ট কিছু মূল্যবোধ বজায় রেখে সত্য উন্মোচন, জনমনে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন এবং শুভ বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব পরিচয় গড়ে তুলেছে। পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে রাজনৈতিক অঙ্গনের সব পক্ষের বিরাগভাজন হওয়ার বিষয়টি প্রমাণ করে যে গণমাধ্যমটি সঠিক পথে রয়েছে। নানা জটিলতা ও প্রতিকূলতার মধ্যেও এই ধারা অব্যাহত রাখার জোরালো প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।
পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সৃজনশীলতার সঙ্গে দায়িত্বশীল পরিবেশনার প্রত্যয় নিয়ে ২৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্যাপন সম্পন্ন করেছে প্রথম আলোর সংবাদকর্মীরা। আজ বুধবার রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে আয়োজিত কর্মী সম্মেলনে সারাদেশের প্রতিনিধি ও রাজধানীতে কর্মরত সংবাদকর্মীরা অংশ নেন। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের দ্রুত প্রস্তুত করে নতুন যুগের উপযোগী হওয়া এবং সত্যের অনুসন্ধান থেকে সরে না আসার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই আয়োজনে সংবাদকর্মীদের পাশাপাশি বিশিষ্ট লেখক, গুণগ্রাহী ও শুভানুধ্যায়ীরা আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে চারজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বকে মঞ্চে আমন্ত্রণ জানান অনুষ্ঠানের সঞ্চালক ও সহযোগী সম্পাদক সুমনা শারমীন। আমন্ত্রিত এই অতিথিরা হলেন ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ম. তামিম, এসিআই লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরিফ দৌলা, মোহাম্মদী গ্রুপের চেয়ারপারসন রুবানা হক এবং জনপ্রিয় অভিনয়শিল্পী মোশাররফ করিম।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য ম. তামিম জানান, ১৯৯৫ সালে বিদেশ থেকে উচ্চশিক্ষা সমাপ্ত করে মাতৃভূমিতে প্রত্যাবর্তন করেন তিনি। এর তিন থেকে চার বছর পর প্রধান এই সংবাদমাধ্যমে তাঁর একটি সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে সেটি তাঁর জীবনের অন্যতম স্মরণীয় ঘটনা হয়ে থাকে। দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় এই সংবাদপত্রে নিজের উপস্থিতি তাঁকে গভীরভাবে আবেগাপ্লুত করেছিল।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, সংবাদমাধ্যমটি সূচনালগ্নে যে অঙ্গীকার করেছিল, সময়ের পরিক্রমায় তা কেবল পূরণই করেনি, বরং তার পরিধি ছাড়িয়ে গেছে। তিনি গভীর পর্যবেক্ষণে দেখেছেন যে পেশাগত কাজ করতে গিয়ে সরকারি এবং বিরোধী উভয় শিবিরেরই রোষানলে পড়তে হয়েছে এই প্রতিষ্ঠানটিকে। তবে এই বৈরিতা থেকেই স্পষ্ট হয় যে প্রতিষ্ঠানটি নির্ভুল পথে অগ্রসর হচ্ছে।
ম. তামিম স্মরণ করেন, নানা দিক থেকে চলমান বহুমুখী চাপের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল গত ডিসেম্বরের সংঘটিত হামলার মাধ্যমে। তা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটি ঘুরে দাঁড়িয়েছে এবং বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন অব্যাহত রেখেছে, যা সমাজবাসীর জন্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক এক বার্তা বহন করে।
এসিআই লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরিফ দৌলা তাঁর বক্তব্যে বলেন, পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সমাজকল্যাণমূলক বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে থাকে এই প্রতিষ্ঠানটি। বিশেষ করে দেশের গণ্ডিতে গণিত চর্চাকে ছড়িয়ে দিতে বেসরকারি পর্যায়ে নেওয়া উদ্যোগগুলো তাঁকে গভীরভাবে বিস্মিত করেছে।
তিনি আরও যোগ করেন, আমাদের সমাজে বর্তমান সময়ে বেশ দ্রুত গতিতে রূপান্তর ঘটছে। সনাতন তথ্যপ্রযুক্তির স্থান দখল করে নিয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই, যার সঙ্গে নতুন প্রজন্ম ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। সময়ের গতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এসব পরিবর্তনকে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে গ্রহণ করার পরামর্শ দেন তিনি।
মোহাম্মদী গ্রুপের চেয়ারপারসন ও এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের সাবেক উপাচার্য রুবানা হক বলেন, নানা রকম বাধা-বিপত্তি ও চাপের মুখেও সত্য ও ন্যায়পরায়ণতার ওপর ভর করে সাধারণ মানুষের মনে গভীর আস্থা অর্জন করেছে এই সংবাদমাধ্যম। এই অর্জিত বিশ্বাস যে কোনো মূল্যে রক্ষা করতে হবে। পাঠকদের কেবল সাধারণ গ্রাহক হিসেবে গণ্য না করে বরং প্রতিষ্ঠানের মূল অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করার তাগিদ দেন তিনি।
তিনি মন্তব্য করেন যে মানুষের বিশ্বাস কোনো অর্থ দিয়ে কেনা বা অন্য কোথা থেকে ধার করা সম্ভব নয়। তাই দ্রুত সংবাদ পরিবেশন কিংবা টিআরপির অসাড় মোহের পেছনে না ছুটে পাঠকের মন জয় করাটাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।
পাঠক সমাজ কী ধরনের বিষয়বস্তু পড়তে আগ্রহী, সে বিষয়ে আরও বেশি মনোযোগী হওয়ার পরামর্শ দেন এই নারী উদ্যোক্তা। পত্রিকার প্রথম পাতায় ইতিবাচক ও আশাজাগানিয়া বিষয়বস্তুকে প্রাধান্য দেওয়ার জন্য তিনি জোরালো আহ্বান জানান।
বিশেষ করে দেশের দূরদূরান্তের মানুষের সাফল্যের গল্প, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অসাধারণ অর্জন এবং নারী সমাজের ক্রীড়া নৈপুণ্যের খবরগুলো গুরুত্ব সহকারে তুলে ধরার অনুরোধ করেন। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে পাঠকের মানসিক চাহিদা অনুধাবন করার উদ্যোগ এবং দুর্নীতির অনুসন্ধানী খবরের জন্য আলাদা একটি পাতা সংযোজনের প্রস্তাব পেশ করেন।
অভিনেতা মোশাররফ করিম তাঁর বক্তব্যে জানান যে এই সংবাদমাধ্যমের প্রতি তাঁর আজীবন গভীর ব্যক্তিগত অনুরাগ রয়েছে। কর্মজীবনের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে বহুবার নিজের দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা সম্ভব হয়নি, তবুও প্রতিষ্ঠানটি কখনো তাঁর প্রতি কোনো বিরূপ মনোভাব পোষণ করেনি; বরং তাঁর সীমাবদ্ধতাগুলো অনুধাবন করে তাঁকে আপন করে নিয়েছে।
অভিনয় জীবনের শুরুর দিনগুলোতে প্রচারের আলোর চেয়ে কাজের মাধ্যমেই নিজের পরিচিতি গড়ে তুলতে চেয়েছিলেম বলে উল্লেখ করেন এই তারকা। মঞ্চে নাটকে অভিনয়ের সুবাদে প্রথম আলোর জরিপে সেরা অভিনেতার সম্মাননা লাভ করেন তিনি, আর সেই থেকেই শুরু হয় এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর পথচলা।
সহজ ভাষায় নিজের অনুভূতির প্রকাশ ঘটিয়ে তিনি বলেন যে এই প্রতিষ্ঠানটি তাঁকে ভালোবেসেছে এবং তিনিও এই প্রতিষ্ঠানটিকে ভালোবাসেন। অভিনয়ে বিশেষ খ্যাতি অর্জনের পাশাপাশি নিয়মিত কবিতার চর্চাও করে থাকেন এই অভিনেতা। সঞ্চালকের বিশেষভাবে অনুরোধ করার পর তিনি তাঁর রচিত ‘আড়িয়ালখাঁর জলস্রোত’ শীর্ষক কবিতাটি উপস্থিত দর্শকদের আবৃত্তি করে শোনান।
সবশেষে পত্রিকার সম্পাদক মতিউর রহমান মঞ্চে উপস্থিত বরেণ্য অতিথিদের নিজ হাতে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর