ঢাকা | বঙ্গাব্দ

কষ্টের সাগরেও সন্তানের মুখ চেয়ে বেঁচে থাকার লড়াই বীণার

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Nov 6, 2026 ইং
কষ্টের সাগরেও সন্তানের মুখ চেয়ে বেঁচে থাকার লড়াই বীণার ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

গত ২৪ অক্টোবর পূজার ছুটির শেষ দিনের অলস দুপুরে মসজিদ পেরিয়ে পাশের হাঁটাপথ দিয়ে ধানমন্ডি লেক প্রাঙ্গণে প্রবেশ করা হয়। সেখানে লোকজন ইতস্তত হেঁটে বেড়াচ্ছিলেন এবং কিছুটা এগিয়ে গিয়ে সেতুর পাশের বৃত্তাকার বসার জায়গায় অনেকে জোড়ায় কিংবা একা ছড়িয়ে–ছিটিয়ে বসে ছিলেন। ঠিক সেই জায়গায় চারকোনা একটি টুকরি ও ব্যাগ নিয়ে একা বসেছিলেন এক নারী, যাঁর টুকরিতে ছিল সামান্য কিছু প্লাস্টিকের খেলনা, ক্লিপ এবং গোল টুপি।

সামান্য সেই জিনিসগুলো বিক্রির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি মাথা নেড়ে হ্যাঁ সূচক উত্তর দেন এবং দীর্ঘ জবাবে জানান যে তিনি প্রতিদিন এই নির্দিষ্ট স্থানে বসেন না, বরং ঘুরে ঘুরে জিনিস বিক্রি করেন। বিশেষ করে ধানমন্ডির ১১ নম্বর ও ২৮ নম্বরে তাঁর যাতায়াত বেশি এবং তাঁর সঙ্গে তাঁর ছেলেমেয়েরাও থাকে। ছুটির দিনে লেকের এই অংশে একটি সংগঠন পথশিশুদের পড়ানোর কারণে তিনি তাঁর সন্তানদেরও সেখানে পড়াশোনার জন্য নিয়ে এসেছিলেন। স্কুল শেষ হওয়ার পর শিক্ষকেরা শিশুশিক্ষার্থীদের খাওয়ানোর জন্য বাইরে নিয়ে যাওয়ায় তিনি তখন তাদের ফিরে আসার অপেক্ষায় বসেছিলেন।

কথার একপর্যায়ে তাঁর কোলে একটি পোষা বিড়ালছানা উঠে পড়তে দেখা যায় এবং কিছুক্ষণ পর তাঁর ছেলেমেয়েরা ফিরে এলে হাসির অপেক্ষার পালা শেষ হয়। তিনি তখন তাদের সঙ্গে নিয়ে তাঁর টুকরির জিনিসপত্র ফেরি করার উদ্দেশ্যে ধানমন্ডির ২৮ নম্বরের দিকে রওনা হন এবং সে সময় তাঁর সঙ্গে পথ চলা হয়।

কথোপকথনে তাঁর নাম জানা যায় বীণা আক্তার হাসি (৩০), যিনি ১৩ বছরের ছেলে মোহাম্মদ হাসান ও ৫ বছরের মেয়ে মারিয়াম জান্নাতকে নিয়ে রাজধানীর হাজারীবাগে বসবাস করেন। তিনি জানান যে ছোটবেলা থেকেই কাজ করে বড় হয়েছেন এবং চার বছর বয়স থেকে হাঁড়িপাতিল মাজা শুরু করে আজ পর্যন্ত কাজ করেই খেয়ে বেঁচে আছেন, আর দুনিয়ার খাতা-কলম শেষ হয়ে গেলেও তাঁর জীবনের সংগ্রামের কিচ্ছা শেষ হবে না কারণ তিনি পরিমিত পরিমাণে চরম কষ্ট সহ্য করেছেন।

হাসির মা–বাবা, ভাই-বোন কারও নাম কিংবা নিজের বাড়ির নির্দিষ্ট কোনো ঠিকানা তাঁর মনে নেই, কেবল মনে আছে যে তাঁরা গ্রামে ছিলেন এবং নৌকা থেকে নেমে রিকশায় চড়ে তাঁদের বাড়ি পৌঁছানো যেত। বাবা দ্বিতীয়বার বিয়ে করার পর মা তাঁদের ঢাকায় নিয়ে এসে একটি বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ শুরু করেন এবং পরবর্তীতে চার বছর বয়সী হাসিকে একটি পরিবারে কাজের জন্য দিয়ে দেন। একদিন মাকে খোঁজার জন্য সেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে তিনি পথ হারিয়ে ফেলেন এবং কোনো কারণে নিজের নাম পর্যন্ত ভুলে যান, কেবল মনে হয়েছিল তাঁর নাম হয়তো বীণা। এরপর পুরান ঢাকার এক শিক্ষকের বাড়িতে তাঁর আশ্রয় মিললে ওই শিক্ষক তাঁর নাম রাখেন ‘হাসি’ এবং কিশোরী বয়স পর্যন্ত তিনি সেখানেই কাটিয়ে পরে কামরাঙ্গীরচরের এক নারীর বাসায় আশ্রয় পান।

কামরাঙ্গীরচরে একটি প্লাস্টিকের কারখানায় কাজ নেওয়ার পর যে নারীর কাছে তিনি আশ্রয় পেয়েছিলেন, তিনিই তাঁকে বিল্লাল নামের এক এতিম তরুণ বৈদ্যুতিক মিস্ত্রির সঙ্গে বিয়ে দেন। বিয়ের পর তাঁর কষ্ট কিছুটা দূর হওয়ায় তিনি ভেবেছিলেন আল্লাহ বুঝি তাঁর ভাঙা কপাল জোড়া লাগিয়ে দিয়েছেন, কিন্তু বিয়ের পর ভালোই কাটলেও একদিন কাজ করতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে স্বামী বিল্লাল মারা যান এবং তাঁর কপালে পুনরায় দুঃখ নেমে আসে।

স্বামীর মৃত্যুর সময় তাঁর ছেলের বয়স ছিল ৭ বছর এবং মেয়ের বয়স ছিল মাত্র দেড় মাস, আর বিয়ের পর তাঁকে বাইরে কাজ করতে না হলেও স্বামীর মৃত্যুর পর দুধের শিশুটিকে সামর্থ্যহীন ছেলের কাছে রেখে তিনি বাসাবাড়িতে কাজে যাওয়া শুরু করেন। ছোট ছেলে দুধের শিশুটিকে ঠিকমতো সামলাতে না পারায় তিনি মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে কাজে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, কিন্তু শিশুটি যখন-তখন প্রস্রাব করে দেওয়ায় কেউ আর তাঁকে কাজে রাখতে রাজি হয়নি।

সাহায্য পাওয়ার আশায় হাসি ওই সময়ে প্রতিবেশীদের সঙ্গে ধানমন্ডিতে আসা শুরু করেন এবং একপর্যায়ে শিশু হকারদের দেখে তিনি লুছনি বিক্রি করার পেশা বেছে নেন। চকবাজার থেকে তিনশ টাকার লুছনি ও মাজুনি কিনে তিনি ও তাঁর ছেলে মিলে ঘুরে ঘুরে তা বিক্রি করা শুরু করেন।

লুছনি বিক্রির পাশাপাশি হাসি কিছুদিন নির্মাণকাজে অংশ নেন, ফ্লাস্কে করে চা বিক্রি করেন এবং পরবর্তীতে রায়েরবাজারের একটি কারখানায় কাজ নেন, তবে করোনা সংক্রমণের সময় কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তিনি কাজ হারান। হাসি কথা বলার সময় তাঁর কোলে বারবার পোষা বিড়ালছানাটি উঠে আসছিল এবং তাঁর ছেলেমেয়েরাও সেখানে এসে পৌঁছায়।

পরিবারটির সঙ্গে প্রায় আড়াই ঘণ্টা সময় কাটানোর সময়ে কোনো পণ্য বিক্রি হতে না দেখলেও হাসি জানান যে তাঁদের দিনে গড়ে তিনশ টাকার পণ্য বিক্রি হয়ে থাকে এবং পুঁজি কম হওয়ার কারণে বিক্রিও কম হয়। এর মধ্যে হাসি নিজেও অসুস্থ থাকায় আগের মতো আর ছোটাছুটি করতে পারেন না, ফলে তাঁর ছেলেই হেঁটে হেঁটে জিনিসগুলো বিক্রি করে।

চলতি মাস থেকে তাঁদের ঘরভাড়া বেড়ে চার হাজার টাকা হয়েছে কিন্তু হাসি কোনো মাসেই পুরো ভাড়া পরিশোধ করতে পারেন না, তবে শুরুতে তাঁর কাছ থেকে লুছনি কিনে নেওয়া ধানমন্ডির এক দম্পতি এখনো তাঁকে নানাভাবে সাহায্য করে যাচ্ছেন। হাসি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে জানান যে ওই স্যার ও ম্যাডাম তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে চিকিৎসা পর্যন্ত করিয়েছেন।

কথা বলতে বলতে হাসি বেশ কয়েকবার আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এবং জানান যে মানুষ বড়জোর এক দিন কিংবা দুই দিন কষ্ট করে, অথচ তাঁর নিজের কষ্ট শুরু হয়েছে জন্ম থেকেই এবং তাঁর ছোট বাচ্চারাও খুব কষ্ট করছে, তিনি শুধু চান তার সন্তানরা যেন একটু ভালোমন্দ খেয়ে বেঁচে থাকতে পারে।

সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
আন্তর্জাতিক সংগীত জোটে হামিন আহমেদের ঐতিহাসিক অর্জন ও ভবিষ্য

আন্তর্জাতিক সংগীত জোটে হামিন আহমেদের ঐতিহাসিক অর্জন ও ভবিষ্য