নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
ভারতের ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) লোকসভার সদস্য নিশিকান্ত দুবে অত্যন্ত বিস্ফোরক এক মন্তব্য করে জানিয়েছেন যে, কেবল পাকিস্তাননিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরই নয়, বরং বর্তমান সময়টি বাংলাদেশের অধীনস্থ নোয়াখালী, সিলেট এবং চট্টগ্রাম বন্দর নিজেদের দখলে ফিরিয়ে আনার উপযুক্ত সময়। তিনি ভারতের স্বাধীনতাপরবর্তী প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও নীতিকে সম্পূর্ণভাবে এজন্য দায়ী সাব্যস্ত করে গণমাধ্যমে অভিযোগ করেছেন যে, তৎকালীন সময়ে কাশ্মীরের বিভিন্ন অঞ্চলের পাশাপাশি নোয়াখালী, সিলেট ও গুরুত্বপূর্ণ চট্টগ্রাম বন্দর জবরদস্তি করে পাকিস্তানকে দিয়ে দিয়েছিলেন জওহরলাল নেহরু।
তৎকালীন সময়ে এই নির্দিষ্ট অঞ্চল তিনটি প্রাচীন ত্রিপুরা রাজ্যের ভৌগোলিক সীমানার অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে দৃঢ় দাবি করেছেন ঝাড়খন্ড রাজ্যের গোড্ডা আসন থেকে নির্বাচিত এই সংসদ সদস্য। উল্লেখ্য যে, নিশিকান্ত দুবের এই গোড্ডা লোকসভা Constituency-র ভেতরেই রয়েছে দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পপতি আদানির মালিকানাধীন সেই বিতর্কিত তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি, যেখান থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ নিয়মিতভাবে বাংলাদেশে সরবরাহ করা হয়ে থাকে।
গত শুক্রবার ভারতীয় সংবাদ সংস্থা এএনআইকে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে দেশভাগের সময়কার নানা রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে জওহরলাল নেহরুর কঠোর সমালোচনা করেন নিশিকান্ত। তিনি জানান যে, সেকালের ত্রিপুরার রাজা বীর বিক্রম সিং নিজের রাজ্যের ভূখণ্ড ও অংশবিশেষ অন্য দেশের কাছে হস্তান্তরের বৈধতা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুলেছিলেন। রাজা তখন নেহরুর কাছে জানতে চেয়েছিলেন, কী অধিকার বা ক্ষমতার বলে তাঁর স্বাধীন রাজ্যের ভূখণ্ড নিয়ে অন্য কেউ আলোচনা বা সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
রাজা বীর বিক্রম সিং স্পষ্ট ভাষায় নেহরুকে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, তাঁর রাজ্যের ভবিষ্যৎ বা ভালো-মন্দের সিদ্ধান্ত তিনি নিজেই গ্রহণ করবেন; তিনি স্বাধীন ভারতে থাকবেন, পাকিস্তানে যুক্ত হবেন, নাকি একটি স্বাধীন সত্তা হিসেবে টিকে থাকবেন—সেই পূর্ণ অধিকার কেবল তাঁর নিজেরই রয়েছে। নিশিকান্ত দুবে সাক্ষাৎকারে আরও উল্লেখ করেন যে, নোয়াখালী, সিলেট এবং চট্টগ্রাম বন্দর—এই তিনটি এলাকা মূলত তিপ্রা বা তৎকালীন ত্রিপুরারই অংশ ছিল, যার রাজা বীর বিক্রম সিং নেহরুর নীতির বিরুদ্ধে নিরবচ্ছিন্নভাবে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
নেহরুকে উদ্দেশ করে ত্রিপুরার রাজা বলেছিলেন, তিনি কী করে নোয়াখালীর মতো অঞ্চল পাকিস্তানকে দান করতে পারেন এবং সিলেট ও চট্টগ্রামে গণভোটের ব্যবস্থা করতে পারেন, তা বোধগম্য নয়। নিশিকান্তের ভাষ্য অনুযায়ী, রাজা বীর বিক্রম সিংয়ের প্রশ্ন ছিল যে, এটি তাঁর ব্যক্তিগত ও রাজ্যের ভূখণ্ড, তাই তিনি নিজেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন।
পরবর্তী সময়ে ভারতের তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সরদার বল্লভভাই প্যাটেল সামরিক বাহিনী পাঠানোর মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং ১৯৪৮ সালের অক্টোবর মাসে ত্রিপুরা রাজ্য আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়। সেই সময় ভারত অন্তর্ভুক্তি চুক্তি বা 'ইনস্ট্রুমেন্ট অব অ্যাকসেশন'-এ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষর করেছিলেন ত্রিপুরার তৎকালীন মহারানি কাঞ্চনপ্রভা দেবী।
১৯৪৬ সালের ঐতিহাসিক নোয়াখালী দাঙ্গার প্রসঙ্গ টেনে এনে নিশিকান্ত দুবে গুরুতর অভিযোগ করেন যে, সেই সংকটময় মুহূর্তে নোয়াখালীর ভয়াবহ পরিস্থিতির প্রতি ন্যূনতম নজর না দিয়ে নেহরু বেশি ব্যস্ত ছিলেন মুসলিম লীগকে ক্ষমতার অংশীদার হিসেবে সরকারে অন্তর্ভুক্ত করার ফন্দি আঁটতে। নিশিকান্তের দাবি অনুযায়ী, ১৯৪৬ সালের ১৫ অক্টোবর শুধু ওই এক দিনেই নোয়াখালীতে প্রায় ১০ হাজার হিন্দু ধর্মাবলম্বীকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল, অথচ দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও জওহরলাল নেহরু একবারের জন্যও নোয়াখালীতে ছুটে যাননি।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হওয়ার প্রধান কারণ হিসেবেও নেহরুর ভ্রান্ত নীতিকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন এই প্রভাবশালী বিজেপি নেতা। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন যে, বর্তমান সময়ে উত্তর-পূর্বাঞ্চল যেভাবে অর্থনৈতিক দিক থেকে পিছিয়ে রয়েছে, সেখানকার অফুরন্ত খনিজ সম্পদ এবং মাটির নিচের গ্যাস ও জ্বালানির সঠিক সদ্ব্যবহার করা যাচ্ছে না, এমনকি ওই সীমান্ত অঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদী মানসিকতা আজও বজায় থাকার একমাত্র কারণ হলো চট্টগ্রাম বন্দরটি ভারতীয়দের হাতের নাগালে না থাকা।
সাক্ষাৎকারের অন্য একটি অংশে নিশিকান্ত চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উত্থাপন করে বলেন যে, সিলেটে তৎকালীন সময়ে যে গণভোট পরিচালিত হয়েছিল, তার মূল দায়িত্বে থাকা বাহারুল ইসলাম আসলে ‘মুসলিম লীগ রেড আর্মি’র সক্রিয় সদস্য ছিলেন এবং তিনি স্বয়ং নোয়াখালী গণহত্যার সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে কংগ্রেস দল তাকে দফায় দফায় রাজনৈতিকভাবে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে দেশের রাজ্যসভার সদস্য এবং পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের সম্মানিত বিচারপতি পর্যন্ত বানিয়েছিল।
এদিকে নিশিকান্ত দুবের এই উসকানিমূলক দাবির প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছেন ত্রিপুরার রাজপরিবারের বংশধর ও তিপ্রা মথা রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠাতা প্রদ্যোৎ বিক্রম মাণিক্য দেববর্মা। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’ প্ল্যাটফর্মে নিজের মতামত প্রকাশ করে লিখেছেন যে, দেশভাগের সেই সংবেদনশীল সময়ে তাঁর নিজ দাদিকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে ত্রিপুরার একটি বিশাল ভূখণ্ড পাকিস্তানকে উপহার স্বরূপ দিয়ে দেওয়া হয়েছিল, যা ছিল মূলত একটি মারাত্মক ও সুদূরপ্রসারী ঐতিহাসিক ভুল। তিনি আরও দাবি করেন যে, আজকের দিনে চট্টগ্রাম বন্দরটি যদি সরাসরি তাঁদের নিয়ন্ত্রণে থাকত, তবে কৌশলগত ‘চিকেনস নেক’ বা শিলিগুড়ি করিডর নিয়ে ভারতকে কোনোকালেই বাড়তি দুশ্চিন্তায় ভুগতে হতো না।
নানা ধরনের উসকানিমূলক, বিতর্কিত ও চাঞ্চল্যকর মন্তব্য করার জন্য দেশজুড়ে বরাবরই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন নিশিকান্ত দুবে, যার ধারাবাহিকতায় এর আগেও তিনি একাধিকবার গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছেন। কিছুদিন আগেই তিনি পশ্চিমবঙ্গের স্পর্শকাতর মালদহ, মুর্শিদাবাদ এবং বিহারের কাটিহার ও কিষানগঞ্জ জেলাগুলোকে একত্রিত করে সম্পূর্ণ নতুন ও পৃথক একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল গঠন করার জোরালো দাবি তুলে দেশজুড়ে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছিলেন। এছাড়া তৃণমূল কংগ্রেসের সাবেক সংসদ সদস্য মহুয়া মৈত্রের বিরুদ্ধে অর্থ নিয়ে জাতীয় সংসদে নির্দিষ্ট প্রশ্ন করার যে গুরুতর অভিযোগ উঠেছিল, সেই ঘটনার নেপথ্যেও প্রধান অভিযোগকারী বা হুইসলব্লোয়ার হিসেবে জোরালো ভূমিকা পালন করেছিলেন এই বিতর্কিত বিজেপি নেতা নিশিকান্ত দুবে।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর