নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
সেকালের রাজনৈতিক ও সামরিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে বিশিষ্ট সাংবাদিক ও প্রখ্যাত গবেষক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস তাঁর সুবিখ্যাত ‘বাংলাদেশ: এ লিগেছি অব ব্লাড’ নামক গ্রন্থে তৎকালীন ঘটনাবলির বিশদ বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছেন। তাঁর বর্ণনায় স্পষ্ট হয়েছে যে, সে বছরের ৩রা নভেম্বরের সামরিক পটপরিবর্তন কোনো সাধারণ জনগণের কল্যাণমুখী আন্দোলন ছিল না, বরং এটি ছিল একটি উচ্চাভিলাষী সামরিক পদক্ষেপ। এই চক্রান্ত সাধারণ সৈনিকদের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিল। জিয়াউর রহমানের গৃহবন্দিত্বের ঘটনা সাধারণ জওয়ানদের মনে প্রচণ্ড অসন্তোষ ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল। কারণ সামরিক বাহিনী ও সাধারণ মানুষ তাঁকে জাতীয় সম্মান এবং সামরিক সততার প্রতীক হিসেবে গণ্য করত। ৩রা নভেম্বর থেকে ৬ই নভেম্বর পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণসহ রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্তে যেসব রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল, তা সাধারণ সিপাই এবং দেশের ধর্মপ্রাণ দেশপ্রেমিক জনসাধারণের কাছে একটি সুনির্দিষ্ট বার্তা পৌঁছে দিয়েছিল। এই বার্তাটি ছিল যে, প্রিয় মাতৃভূমিকে পুনরায় কোনো বিদেশি আধিপত্যবাদের উপনিবেশে পরিণত করার গভীর ষড়যন্ত্র চলছে।
৭ নভেম্বরের প্রথম প্রহরে ঢাকা সেনানিবাসের সাধারণ সৈনিকদের অন্তরে জাতীয়তাবাদী চেতনার এক অভূতপূর্ব বিস্ফোরণ ঘটেছিল। জওয়ানরা ‘নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবার’ এবং ‘সিপাহি-জনতা ভাই ভাই, জিয়াউর রহমান এর মুক্তি চাই’ ধ্বনিতে রাজপথ ও ব্যারাকগুলো মুখরিত করে তুলেছিল। চরম সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে সাধারণ সিপাইরা তাঁদের প্রিয় জেনারেলকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে নিয়ে আসেন। মুক্ত হওয়ার পর তিনি যখন সেনানিবাসে পা রাখেন, তখন হাজার হাজার সাধারণ সৈনিক তাঁকে ঘিরে উল্লাসে ফেটে পড়েছিলেন। জিয়াউর রহমান কোনো ব্যক্তিগত লোভ বা রাজনৈতিক ক্ষমতার লালসা থেকে এগিয়ে আসেননি, বরং সিপাই ও জনতার অবিচল আস্থাই তাঁকে দেশের সুপ্রিম কমান্ডার পদোসীন করেছিল। সেনানিবাসের সিপাইদের এই অভূতপূর্ব বিপ্লবের খবর মুহূর্তের মধ্যে সমগ্র ঢাকা শহরে ছড়িয়ে পড়েছিল। সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাজপথে নেমে এসে সিপাইদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছিলেন। সিপাই ও জনতা একে অপরকে আলিঙ্গন করেন, সাঁজোয়া যানের ওপর চড়ে জাতীয় পতাকা ওড়ান এবং বিদেশি আধিপত্যবাদবিরোধী স্লোগানে আকাশ-বাতাল মুখরিত করেন। পৃথিবীর ইতিহাসে সিপাই ও জনতার এমন রক্তপাতহীন ও স্বতঃস্ফূর্ত গণবিপ্লবের দ্বিতীয় কোনো দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া যায় না।
ঐতিহাসিক সেই রাতের ঘটনার প্রত্যক্ষ বিবরণ প্রদান করেছেন প্রত্যক্ষদর্শী লে. কর্নেল (অব.) এম এ হামিদ পিএসসি। তিনি তাঁর ‘তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা’ (হাওলাদার প্রকাশনী, ত্রয়োদশ সংস্করণ, ২০২৪, পৃষ্ঠা-১৫৮) গ্রন্থে লিখেছেন যে, বিপ্লবী সিপাইরা স্ব স্ব ইউনিট থেকে বেরিয়ে এসে স্বতঃস্ফূর্তভাবে জিয়ার বাসভবনের চারপাশ ঘিরে ফেলেছিলেন। সবারই অভিন্ন লক্ষ্য ছিল জিয়ার বাসভবন এবং সবাই সেখানে একত্র হয়ে প্রাচীর ভেঙে বন্দী জিয়াকে উদ্ধার করবেন, এটিই ছিল পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনা। মহান মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে জিয়াউর রহমানের অসামান্য ভূমিকা, উন্নত মানের পেশাদারত্ব, নিখাদ দেশপ্রেম এবং সততার কারণে তিনি সেই চরম অস্থির মুহূর্তে সেনা সদস্য ও কর্মকর্তাদের পরম ভরসার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিলেন।
দক্ষিণ এশীয় ভূরাজনীতির বিখ্যাত মার্কিন গবেষক লরেন্স লিফশুলজ তাঁর সুবিখ্যাত ‘বাংলাদেশ: দ্য আনফিনিশড রেভুলেশন’ গ্রন্থে ওই দিনের ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন যে, ৭ই নভেম্বরের ভোরের আলো ফোটার পূর্বেই হাজার হাজার সাধারণ সৈনিক এবং বেসামরিক জনতা ঢাকার রাজপথে নেমে এসেছিলেন। সাঁজোয়া যানগুলো সাধারণ মানুষকে দমন করার উদ্দেশ্যে রাজপথে নামেনি, বরং সেনাবাহিনী ও জনগণের মধ্যকার সুদৃঢ় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে পুষ্প দিয়ে সজ্জিত হয়ে রাজপথে আবির্ভূত হয়েছিল।
সূত্র: আজকের পত্রিকা
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর