নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
প্রস্তাবিত নতুন বিধিমালায় যানবাহনের শনাক্তকরণ নম্বর, আধুনিক কিউআর কোডসহ পরিচিতি কার্ড, নির্দিষ্ট ফিটনেস সার্টিফিকেট এবং অঞ্চলভিত্তিক চলাচল নিয়ন্ত্রণের মতো কিছু ইতিবাচক ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তবে অত্যন্ত দুঃখজনক ব্যাপার হলো, দশ নম্বর বিধিতে শুধু প্রশিক্ষণের দায়সারা উল্লেখ থাকলেও চালকদের জন্য কোনো ধরনের বাধ্যতামূলক ড্রাইভিং লাইসেন্স, স্বতন্ত্র অনুমোদন, লিখিত বা ব্যবহারিক পরীক্ষা এবং অযোগ্য চালকদের চিহ্নিত করে বাদ দেওয়ার কার্যকর কোনো রূপরেখা নির্দিষ্ট করা হয়নি।
একজন চালক যদি সঠিকভাবে ট্রাফিক চিহ্ন, পথচারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার নিয়ম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালের সামনের সড়কে গতির সীমা, রাতের বেলা গাড়ি চালানোর কৌশল এবং দুর্ঘটনা ঘটার পরপরই তাৎক্ষণিকভাবে সহায়তার উপায়গুলো সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ থাকেন, তবে গাড়িতে শুধু একটি নম্বর প্লেট ঝুলিয়ে কখনোই সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
প্রশিক্ষণ কার্যক্রমটি যাতে নিছক কোনো আনুষ্ঠানিকতা বা প্রহসনে পরিণত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হলে এর পূর্ণাঙ্গ পাঠ্যক্রম, সরকার অনুমোদিত প্রশিক্ষণ কেন্দ্রসমূহের তালিকা, পরীক্ষার যথাযথ মান এবং ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডার সবার জন্য প্রকাশ করতে হবে। সেই সঙ্গে প্রশিক্ষণ গ্রহণ ও পরীক্ষার জন্য নির্ধারিত খরচও একদম সাধারণ চালকদের সাধ্যের মধ্যে রাখা অত্যন্ত জরুরি।
চালককে যথাযথভাবে দক্ষ করে গড়ে তোলার পরিবর্তে তাঁর ওপর অতিরিক্ত কাগজপত্রের বোঝা চাপিয়ে দিলে তিনি বাধ্য হয়েই নিয়মের বাইরে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেন। নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে সবার আগে প্রয়োজন চালকের দক্ষতা যাচাই করা, আর খেয়াল রাখতে হবে যেন কোনো অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক চাপ তাঁদের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়।
যানবাহনের জন্য নির্ধারিত নিবন্ধন ফিও অত্যন্ত যৌক্তিক হওয়া আবশ্যক, কারণ বর্তমান বিধিমালা অনুযায়ী দুই আসনের যানের জন্য আট হাজার এবং চার আসনের যানের জন্য দশ হাজার টাকা ফি ধার্য করা হয়েছে। এর পাশাপাশি বার্ষিক নবায়ন ফি বাবদ যথাক্রমে চার হাজার ও পাঁচ হাজার টাকা পরিশোধের নিয়ম রাখা হয়েছে, যার সঙ্গে আবার ফিটনেস পরীক্ষার ফিও আলাদাভাবে যুক্ত রয়েছে।
প্রশাসনিক কাজের প্রকৃত ব্যয়, পরীক্ষার খরচ, নাগরিকদের সেবা দেওয়ার মান এবং দিনশেষে চালকের নিজস্ব আয় কেমন হতে পারে, এসব বিষয় বিবেচনা করে আদৌ এই ফি নির্ধারণ করা হয়েছে কি না, তার কোনো সঠিক ব্যাখ্যা বর্তমান বিধিমালায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি।
শহরের বড় একটি অংশের চালক নিজের মালিকানাধীন যান চালান না, বরং তাঁরা দৈনিক ভিত্তিতে ভাড়া নিয়ে এসব বাহন সড়কে নামান; যাদের কেউ কেউ আবার ব্যাংক বা অন্য কোথা থেকে ঋণ নিয়ে গাড়ি কিনেছেন কিংবা পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
এই ধরনের উচ্চহারে নির্ধারিত ফি কোনোভাবেই অনিয়ন্ত্রিত ব্যবসা রোধ করতে পারবে না, বরং উল্টো দরিদ্র চালকদের আরও বেশি করে অনানুষ্ঠানিক খাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে। ফি অবশ্যই আদায় করতে হবে, তবে তা যেন সরাসরি চালকদের আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় এবং কিস্তির মাধ্যমে পরিশোধ করার সুযোগ রাখা হয়।
এভাবে একতরফাভাবে কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই ছাড়াই ফি চাপিয়ে দিয়ে দরিদ্র চালকদের কখনোই বৈধ নিবন্ধনের সীমানায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না, তাই নীতিনির্ধারকদের বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভাবা উচিত।
সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের বিষয় হলো, চার নম্বর বিধির চৌদ্দ উপবিধিতে তৃতীয় পক্ষের বিমার সুবিধার আওতায় মোটরযানগুলোকে খুব ধীরে ধীরে বা পর্যায়ক্রমে আনার কথা বলা হয়েছে। আবেদনপত্রে বিমা নম্বর কেবল ‘যদি থাকে’ এভাবে উল্লেখ করার কারণে কোনো মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রী কিংবা সাধারণ পথচারীর জীবন ও অঙ্গহানির সঠিক ক্ষতিপূরণ পাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
কোনো যান দুর্ঘটনায় পড়ে কাউকে মারাত্মকভাবে আহত করলে সেই ক্ষতিপূরণের সম্পূর্ণ দায়ভার শেষ পর্যন্ত কে গ্রহণ করবে? চালকের নিজস্ব যদি কোনো আর্থিক সম্পদ বা সামর্থ্য না থাকে, তবে সেই দুর্ভাগ্যপীড়িত আহত ব্যক্তির চিকিৎসার বিশাল খরচ কে বহন করবে? বর্তমান নিরাপত্তা বিধিমালার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে সবসময় ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষাকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
তাই নতুন যানের নিবন্ধন এবং পুরোনো যানের নবায়ন উভয় ক্ষেত্রেই তৃতীয় পক্ষের দায়বিমা বাধ্যতামূলক করা এবং পুরোনো যানগুলোর জন্য ছয় থেকে বারো মাসের মধ্যে শতভাগ বিমার আওতায় আসার একটি নির্দিষ্ট রোডম্যাপ তৈরি করা প্রয়োজন। দরিদ্র চালকদের কথা চিন্তা করে সমবায়ী বা গ্রুপভিত্তিক বিমা চালু করা গেলে এর পেছনে খরচ অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
বিমা বাধ্যতামূলক করার আগে বাজারে যেন পর্যাপ্ত ও সাশ্রয়ী পলিসি সুলভ থাকে, গ্রাহকের সহজ শর্তে দাবি নিষ্পতির সুযোগ থাকে এবং যেকোনো দুর্ঘটনার তথ্য দ্রুত যাচাই করার সুব্যবস্থা থাকে, তা আগে থেকেই নিশ্চিত করা অত্যন্ত বাঞ্ছনীয়।
যানবাহনের আয়ুষ্কাল হিসেবে সুনির্দিষ্টভাবে বারো বছর সময় বেঁধে দেওয়ার বিধানটিও পুনর্বিবেচনা করা দরকার, কারণ গাড়িটি ঠিক কত সময় ধরে ব্যবহার করা হয়েছে বা কী যত্নসহকারে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়েছে, তা দেখা জরুরি। যানের কাঠামো কতটা শক্তিশালী ও নিরাপদ, ব্রেক এবং বৈদ্যুতিক সংযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ঠিকঠাক আছে কি না—এসব না দেখে কেবল নিবন্ধনের তারিখ থেকে বয়স গণনা করলে ভালো থাকা যানও বাতিল হয়ে যেতে পারে।
অন্যদিকে, কম বয়সের অথচ অত্যন্ত বিপজ্জনক ও জীর্ণ যান সহজেই চলাচলের অনুমতি পেয়ে যেতে পারে। বয়সসীমার rigid নিয়মের বদলে যানের উৎপাদনের সঠিক তারিখ, কাঠামোগত নিরাপত্তা, পর্যায়ক্রমিক ফিটনেস এবং কোনো অংশ মেরামতযোগ্য কি না, তার ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। পুরোনো যানকে হুট করে একদিনের মধ্যে বাতিল ঘোষণা না করে বরং নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিয়ে সেগুলোকে মানসম্মত করে তোলা এবং অযোগ্য যানগুলো সরাতে সহায়তা করা প্রয়োজন।
চলাচলের নির্দিষ্ট রুট এবং জোন বা এলাকা নির্ধারণের ক্ষেত্রেও এই বিধিমালায় অতিরিক্ত প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে, কিন্তু এই সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলো গ্রহণের কোনো স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি স্পষ্ট করা হয়নি। কোন নির্দিষ্ট সড়কে ই-রিকশা চলবে আর কোনটিতে একেবারেই চলবে না কিংবা নির্দিষ্ট কোনো এলাকায় ঠিক কতগুলো যান চলাচল করতে পারবে, তা নির্ধারণের সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড বা ভিত্তি কী হবে?
যাত্রীদের প্রকৃত চাহিদা, সামগ্রিক গণপরিবহনের সংযোগব্যবস্থা, রাস্তার প্রয়োজনীয় প্রস্থ, অতীতে ঘটা দুর্ঘটনার ইতিহাস, চারপাশের স্কুল-হাসপাতাল, বাজার এবং বিকল্প রাস্তার বিষয়গুলো কি আদৌ বিবেচনায় রাখা হবে? যদি এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সুনির্দিষ্টভাবে বিবেচনায় না নেওয়া হয়, তবে কেবল জোনভিত্তিক নিয়ম চালু করলে তা সম্পূর্ণ হিতে বিপরীত হতে পারে।
নির্দিষ্ট কোনো এলাকায় ই-রিকশা নিষিদ্ধ করার মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অবশ্যই দেখতে হবে যে সেখানে সাধারণ মানুষের চলাচলের জন্য সত্যিই কোনো কার্যকর বিকল্প গণপরিবহন রয়েছে কি না।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতার দিকে তাকালে দেখা যায় যে, যেকোনো খাতের কার্যকর নিয়ন্ত্রণের জন্য অযৌক্তিক নিষেধাজ্ঞার চেয়ে স্পষ্ট কিছু মানদণ্ড এবং তার সঠিক প্রয়োগ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
উদাহরণস্বরূপ ভারতের ই-রিকশার সংজ্ঞায় চালক ছাড়া সর্বোচ্চ চারজন যাত্রী বহন, সর্বোচ্চ চল্লিশ কেজি ওজনের লাগেজ, মোটরের নেট ক্ষমতা দুই হাজার ওয়াট এবং সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় পঁচিশ কিলোমিটারের মতো বিভিন্ন পরিমাপযোগ্য সুনির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করা আছে।
সেখানে গাড়িগুলোর সঠিক নিবন্ধন, চালকের জন্য উপযুক্ত লাইসেন্স, বিমা এবং নির্দিষ্ট পারমিটের সুবিন্যস্ত কাঠামোও সফলভাবে চালু রয়েছে। চলতি বছরের সংশোধনীতে দেশটির উৎপাদনকারী কারখানাগুলোর জন্য গুণমান নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত অডিট এবং আগামী দুই বছরের মধ্যে নতুন ই-রিকশায় নির্দিষ্ট লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি ব্যবহারের বাধ্যতামূলক বিধান যুক্ত করা হয়েছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অবশ্য ভারতের এই নির্দিষ্ট সংখ্যাগত বা পরিমাপগত সীমাগুলো ঠিক হুবহু অন্ধভাবে কপি করা কোনোভাবেই উচিত হবে না, কারণ আমাদের দেশের রাস্তার বাস্তব অবস্থা, যানের নকশা, যাত্রীদের চাহিদা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা একেবারেই আলাদা।
তবে প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে প্রযুক্তিগত মান নিয়ন্ত্রণ, উৎপাদনের সঠিক সময়ে নজরদারি এবং চালকদের দক্ষতা যাচাইয়ের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো থেকে অনেক শিক্ষণীয় বিষয় গ্রহণ করা যেতে পারে।
সূত্র: আজকের পত্রিকা
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর