ঢাকা | বঙ্গাব্দ

তাবেয়িদের সোনালি যুগ ও অনন্য জীবনযাত্রা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Nov 7, 2026 ইং
তাবেয়িদের সোনালি যুগ ও অনন্য জীবনযাত্রা ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

ইসলামি ইতিহাসের একেবারে সূচনালগ্নে সাহাবিদের ঠিক পরবর্তী প্রজন্ম হিসেবে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ স্থান দখল করে আছেন তাবেয়িরা। পরিভাষায় এমন একজন মুসলিমকে তাবেয়ি বলা হয়ে থাকে, যিনি ইমানের সঙ্গে অন্তত একজন সাহাবির সরাসরি সাক্ষাতলাভ করেছিলেন এবং ইমান নিয়েই এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছিলেন।

যদিও সরাসরি মহানবী (সা.)-এর সান্নিধ্য লাভ করার সৌভাগ্য তাঁদের হয়নি, তবুও সাহাবিদের পবিত্র জীবনাদর্শ তাঁরা অত্যন্ত গভীরভাবে নিজেদের হৃদয়ে ধারণ করেছিলেন। ফলে তাঁদের সমগ্র যুগটি ইসলামি জ্ঞান, আল্লাহর ভয় বা তাকওয়া এবং দুনিয়াবিমুখতার এক উজ্জ্বল ও অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে।

স্বয়ং মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এই প্রজন্মের শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা ঘোষণা করে ইরশাদ করেছেন যে, সর্বশ্রেষ্ঠ মানবগোষ্ঠী হলো তাঁর নিজের যুগের মানুষ অর্থাৎ সাহাবিগণ, এরপর তাঁদের পরবর্তী প্রজন্ম অর্থাৎ তাবেয়িগণ, আর এরপর আসে তাদের পরের যুগের মানুষ। সহিহ বুখারি শরিফে ৩৬৫১ নম্বর হাদিসে এই অমূল্য ঘোষণাটি বর্ণিত হয়েছে।

তাবেয়িদের জীবনের প্রধানতম ব্রত ও লক্ষ্য ছিল সাহাবিদের মুখ বা বুক থেকে পবিত্র হাদিস ও মহানবীর সুন্নতগুলো সংগ্রহ করা এবং সংরক্ষণ করা। একটি মাত্র হাদিস শোনার তীব্র বাসনায় তাঁরা মাসের পর মাস উটের পিঠে চড়ে সুদূর মরুভূমি পাড়ি দিতেন এবং ক্লান্তিহীনভাবে সফর করতেন।

তৎকালীন সময়ে মদিনা, মক্কা, কুফা, বসরা ও সিরিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে সাহাবিদের কেন্দ্র করে তাঁরা জ্ঞানের বিশাল সব মজলিশ বা আসর গড়ে তুলেছিলেন। মদিনার বিশিষ্ট তাবেয়ি সাইদ ইবনুল মুসাইয়িব (রহ.) নিজে বর্ণনা করে বলতেন যে, তিনি শুধু একটিমাত্র হাদিস সংগ্রহের উদ্দেশ্যে দিনরাত অবিরাম সফর চালিয়ে যেতেন।

ইবনে সাদের লেখা 'আত-তাবাকাত আল-কুবরা' গ্রন্থের পঞ্চম খণ্ডের ১২০ পৃষ্ঠায় এই তথ্যটি উল্লেখ রয়েছে, যা ১৯৯০ সালে বৈরুতের দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। তাঁদের এই অক্লান্ত ও কঠোর পরিশ্রমের পাশাপাশি নিখুঁত স্মৃতিশক্তির ফলেই আজ আমরা ইসলামের এই বিশুদ্ধ জ্ঞানভান্ডার অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি।

তাবেয়িদের স্বর্ণযুগে ইসলামি সাম্রাজ্যের সীমা বিশাল আকার ধারণ করে রোম থেকে পারস্য পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল এবং চারদিকে প্রচুর পরিমাণে ধনসম্পদের প্রাচুর্য দেখা দিয়েছিল। কিন্তু এত কিছুর পরেও তাবেয়িগণ পার্থিব এই সমস্ত জাগতিক চাকচিক্য থেকে নিজেদের সম্পূর্ণ দূরে ও মুক্ত রেখেছিলেন।

তাঁরা সাহাবিদের অনুসরণে অত্যন্ত সাদাসিধে খাবার গ্রহণ করতেন এবং সাধারণ মানের পোশাক পরিধান করতেন। এই দুনিয়াবিমুখতার নিখুঁত চিত্র তুলে ধরে তাবেয়ি হাসান বসরি (রহ.) একবার বলেছিলেন যে, তিনি বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী এমন ৭০ জন সাহাবির সাক্ষাৎ পেয়েছেন, যাঁদের বর্তমান যুগে দেখলে সাধারণ মানুষ পাগল বলে মনে করত।

তিনি আরও বলেছিলেন যে, সেই সাহাবিগণ যদি বর্তমান যুগের মানুষের এই প্রচণ্ড দুনিয়াপ्रीতি ও মোহ প্রত্যক্ষ করতেন, তবে নিশ্চিতভাবে বলতেন যে, এদের জন্য আখেরাতে বা পরকালে কোনো অংশ অবশিষ্ট নেই। বৈরুতের দারুল কিতাব আল-আরাবি থেকে ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত 'হিলয়াতুল আওলিয়া ওয়া তাবাকাতুল আসফিয়া' গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডের ১৩৪ পৃষ্ঠায় হাসান বসরির এই বক্তব্যটি স্থান পেয়েছে।

হাতে বিপুল পরিমাণ সম্পদ থাকা সত্ত্বেও তাঁরা তা নিজের জন্য জমিয়ে না রেখে গরিব ও দুস্থদের মাঝে বিলিয়ে দিতেন এবং নিজেরা আধ্যাত্মিক প্রশান্তিতে দিন কাটাতেন। তাঁদের সারাটা রাত কাটত আল্লাহর পবিত্র দরবারে জায়নামাজে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ কান্নাকাটি ও ইবাদত-বন্দেগির মধ্য দিয়ে।

দিনের বেলায় তাঁরা অত্যন্ত কর্মব্যস্ত ও পরিশ্রমী জীবনযাপন করলেও রাতের অন্ধকারে তাঁরা পরিণত হতেন একনিষ্ঠ সাধকে। ওয়ায়েস আল-কারানি, জয়নুল আবিদিন কিংবা উরওয়া ইবনে জুবায়েরের মতো মহিমান্বিত তাবেয়িদের ইবাদতের অলৌকিক ও হৃদয়গ্রাহী ঘটনাগুলো ইতিহাসে প্রবাদবাক্যে পরিণত হয়ে আছে।

প্রসিদ্ধ তাবেয়ি উরওয়া ইবনে জুবায়ের (রহ.) যখন মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং তাঁর পায়ে পচন ধরে যায়, তখন চিকিৎসকেরা অস্ত্রোপচার করে পা কেটে ফেলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। সেই সময় তিনি অপারেশনের সময় অজ্ঞান করার কোনো ওষুধ বা মাদকদ্রব্য সেবন করতে স্পষ্টভাবে অস্বীকৃতি জানান।

তিনি চিকিৎসকদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন যে, তিনি যখন পরম মনোযোগের সঙ্গে সালাতে বা নামাজে দাঁড়াবেন, ঠিক সেই মুহূর্তে যেন তারা তাঁর পা কেটে ফেলে, আর তিনি সেটির কোনো টেরই পাবেন না। বৈরুতের মুআসসাসাতুর রিসালাহ থেকে ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত জাহাবির 'সিয়ারু আলামিন নুবালা' গ্রন্থের চতুর্থ খণ্ডের ৪৩০ পৃষ্ঠায় এই ঘটনার বিবরণ রয়েছে।

নামাজ আদায়কালে মহান আল্লাহর প্রতি তাবেয়িদের এই নিখাদ ও গভীর মনঃসংযোগ এবং তাকওয়া আজকের আধুনিক যুগের মানুষের কাছে রূপকথা বা কল্পনারও সম্পূর্ণ অতীত বলে মনে হয়। তবে শুধু ইবাদত-বন্দেগি ও ইলম চর্চায় মগ্ন থাকলেই তাঁরা অন্যের ওপর নির্ভরশীল বা কর্মবিমুখ হয়ে বসে থাকেননি।

বরამ তাঁরা নিজেদের শারীরিক পরিশ্রমে হালাল উপার্জন করতেন এবং সৎভাবে রিজিক অন্বেষণ করাকেও ইবাদতের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে মনে করতেন। উপার্জনের ক্ষেত্রে তাঁরা সততা ও আমানতদারির এমন সুউচ্চ আদর্শ স্থাপন করেছিলেন যে, সামান্যতম সন্দেহের অবকাশ থাকলেও তাঁরা বহু মূল্যবান বা বিপুল অঙ্কের ব্যবসাও নির্দ্বিধায় ত্যাগ করতেন।

বিশিষ্ট তাবেয়ি মুহাম্মদ ইবনে সিরিন (রহ.) পেশায় কাপড় ও তেলের ব্যবসা করতেন এবং একবার তিনি ৪০ হাজার দিরহাম বা রৌপ্যমুদ্রা মূল্যের তেল বাকিতে ক্রয় করেছিলেন। কিন্তু সেই তেলের পাত্রগুলোর ঠিক একটির ভেতর একটি মৃত ইঁদুর ভেসে থাকতে দেখে তাঁর মনে গভীর সন্দেহের সৃষ্টি হয়।

তাঁর মনে আশঙ্কা জাগল যে, হয়তো তেল মাড়াইয়ের মূল কারখানাতেই কোনোভাবে ইঁদুরটি পড়েছিল এবং এর ফলে পুরো তেলের চালানটিই অপবিত্র হয়ে গেছে। এই সন্দেহের বশে তিনি বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে সম্পূর্ণ তেল মাটিতে ঢেলে নষ্ট করে ফেলেন, যাতে কোনো মুসলমানের কাছে কোনো অবস্থাতেই সন্দেহযুক্ত পণ্য বিক্রি না হয়।

পরবর্তীতে এই বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ার কারণে তিনি মারাত্মক ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন এবং এর ফলে তাঁকে কারাবরণও করতে হয়েছিল, তবুও তিনি তাঁর নীতি ও আদর্শ থেকে চুল পরিমাণ বিচ্যুত হননি। বৈরুতের দারুল কিতাব আল-আরাবি থেকে ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত 'হিলয়াতুল আওলিয়া ওয়া তাবাকাতুল আসফিয়া' গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডের ২৬৪ পৃষ্ঠায় এই ঘটনাটি বর্ণিত হয়েছে।

তাঁরা সবসময় মহানবী (সা.)-এর সেই অত্যন্ত কঠিন ও সতর্কবাণীটি হৃদয়ে স্মরণ রাখতেন, যেখানে ইরশাদ হয়েছে যে, যে মানবশরীর হারাম খাদ্য বা উপার্জনের মাধ্যমে পুষ্ট হয়েছে, দোতালা বা জাহান্নামের আগুনই তার জন্য সবচেয়ে বেশি উপযোগী। সুনানে তিরমিজি শরিফের ৬১৪ নম্বর হাদিসে এই সতর্কবাণীটি উল্লেখ করা হয়েছে।

তাবেয়িদের চরিত্রের সবচেয়ে সুন্দর ও মহিমান্বিত দিকটি ছিল তাঁদের পারস্পরিক সুগভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং বিনয়। তাঁরা বয়োজ্যেষ্ঠ সাহাবিদের নিজ পিতার মতো অত্যন্ত ভক্তি ও সম্মান করতেন এবং নিজেদের মধ্যে যেকোনো বিষয়ে মতানৈক্য বা মতপার্থক্য দেখা দিলেও কখনো শিষ্টাচারের সীমা লঙ্ঘন করতেন না।

বিশিষ্ট তাবেয়ি আমির আশ-শাবি (রহ.) একবার সাহাবি ইবনে সাবিতের প্রতি সম্মান প্রদর্শনস্বরূপ তাঁর বাহনের পাদানি নিজের হাতে ধরে রেখেছিলেন। উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.) সম্পর্কে কোনো হাদিস বা ঘটনা বর্ণনা করার সময় তাবেয়ি মাসরুক (রহ.) সবসময় একটি নির্দিষ্ট বাক্য উচ্চারণ করতেন।

তিনি বলতেন যে, তাঁকে এই হাদিস বর্ণনা করেছেন সিদ্দিকা বিনতুস সিদ্দিক, স্বয়ং আল্লাহ তাআলা যাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করেছেন এবং যিনি মহান আল্লাহর অত্যন্ত প্রিয়ভাজন বান্দা। বৈরুতের মুআসসাসাতুর রিসালাহ থেকে প্রকাশিত জাহাবির 'সিয়ারু আলামিন নুবালা' গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডে এই বিবরণটি পাওয়া যায়।

ইমাম আবু হানিফা এবং ইমাম আবদুর রহমান আওজায়ি (রহ.)-এর মধ্যে সালাতে প্রতি তাকবিরের সময় দুই হাত তোলাসহ আরও অনেক ফিকহি মাসআলায় উল্লেখযোগ্য মতভেদ ছিল। এই বিষয়ে পবিত্র মক্কা নগরীতে তাঁদের মধ্যে একটি প্রকাশ্য علمی বিতর্কও অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

কিন্তু এতসব মতপার্থক্য সত্ত্বেও তাঁদের সবার পবিত্র অন্তরে একে অপরের প্রতি ছিল অগাধ শ্রদ্ধা, ভক্তি ও নিখাদ ভালোবাসা। সেই বিতর্ক সম্পন্ন হওয়ার পর আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারককে উদ্দেশ করে ইমাম আওজায়ি (রহ.) বলেছিলেন যে, তিনি এই কুফাবাসী ব্যক্তিত্ব তথা ইমাম আবু হানিফার অগাধ জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দেখে দারুণভাবে ঈর্ষান্বিত হয়েছেন।

তিনি আরও স্বীকার করেছিলেন যে, ইমাম আবু হানিফার ব্যাপারে তাঁর কাছে ইতিপূর্বে যা কিছু বলা হয়েছিল, তিনি বাস্তবে তার সম্পূর্ণ বিপরীত একজন মহান ব্যক্তি। পরবর্তীতে ইমাম আবু হানিফার ইন্তেকালের সংবাদ শুনে ইমাম আওজায়ি গভীর শোক প্রকাশ করে বলেছিলেন যে, আজ ইসলামি ইলমের একটি বিরাট স্তম্ভ চিরতরে ধ্বংস হয়ে গেল।

ইবনে আবদিল বার কর্তৃক রচিত এবং ১৯৯৪ সালে দাম্মামের দারু ইবনিল জাওজি থেকে প্রকাশিত 'জামিউ বায়ানিল ইলম ওয়া ফাদলিহি' গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডের ১০৭৯ পৃষ্ঠায় এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি লিপিবদ্ধ রয়েছে। পরিশেষে বলা যায় যে, তাবেয়িদের এই বর্ণাঢ্য জীবনযাপন আমাদের এই শিক্ষাই প্রদান করে যে, দুনিয়ার ক্ষমতার চূড়ায় বসে কিংবা বিপুল সম্পদের প্রাচুর্যের মাঝে থেকেও কীভাবে মানুষের অন্তরকে একমাত্র আল্লাহর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত রাখা সম্ভব।

তাঁরা ছিলেন মহানবী (সা.)-এর রেখে যাওয়া সুন্নতের জীবন্ত ও মূর্ত প্রতিচ্ছবি, যাঁদের অনুপম তাকওয়া, গভীর ইলম এবং আপসহীন সততার শক্ত ভিত্তির ওপরই আজকের সম্পূর্ণ ইসলামি সভ্যতার সুদৃশ্য ইমারত দাঁড়িয়ে রয়েছে।

সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
১৬ বছর বয়সে পদার্থবিজ্ঞানে ফেল, হতাশা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্

১৬ বছর বয়সে পদার্থবিজ্ঞানে ফেল, হতাশা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্