ঢাকা | বঙ্গাব্দ

আনিসুল হকের 'মা' উপন্যাস ও মায়েদের অন্তহীন কান্না

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Nov 8, 2026 ইং
আনিসুল হকের 'মা' উপন্যাস ও মায়েদের অন্তহীন কান্না ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

স্বাধীনতা অর্জনের পেছনে অসংখ্য মানুষের আত্মত্যাগের ইতিহাস জড়িয়ে থাকে, যার পেছনে লুকিয়ে থাকে মায়েদের অন্তহীন নীরব ক্রন্দন। কিছু সাহিত্যকর্ম পড়ার পাঠ চুকে গেলেও তার রেশ মন থেকে মুছে যায় না, বরং হৃদয়জুড়ে এক গভীর শূন্যতা ও আবেগের জন্ম দেয়। তামান্না তাবাসসুম আরিশার আলোচনায় উঠে আসা আনিসুল হকের ‘মা’ উপন্যাসটি তেমনই একটি আবেগঘন সৃষ্টি, যা পাঠককে নিয়ে যায় ভালোবাসা ও বেদনার এক অন্যভুবনে।

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে তৈরি এই উপন্যাসের মূল চরিত্র হিসেবে রয়েছেন শহীদ আজাদ ও তাঁর জননী সাফিয়া বেগম। লেখক এই দুজনের জীবনবৃত্তান্তের মাধ্যমে মাতৃত্বের পরম গভীরতা, দেশের প্রতি ভালোবাসা এবং আপনজনকে চিরতরে হারানোর কষ্ট ফুটিয়ে তুলেছেন। এটি কেবল একজন মুক্তিপাগল তরুণের বীরত্বগাথা নয়, বরং এক জননীর করুণ উপাখ্যান—যাঁর সমগ্র জগৎ জুড়েই ছিলেন তাঁর প্রিয় সন্তান, অথচ শেষ পর্যন্ত তাঁকেই দেশের তরে বিসর্জন দিতে হয়েছে।

সন্তানকে পৃথিবীতে স্বাগত জানানোর সময় মায়েদের মনে থাকে হাজারো স্বপ্ন, চলে লালনপালনের নিরলস প্রচেষ্টা ও নির্ঘুম রাত কাটানোর পালা। কিন্তু সেই সন্তান যখন মাতৃভূমির মুক্তির জন্য জীবন উৎসর্গ করে বসেন, তখন জাতি লাভ করে এক বীর সন্তানকে আর ইতিহাস কুড়ায় শহীদকে, অথচ মা হারান তাঁর জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান ধন।

রাষ্ট্রের কাছে আজাদ একজন বীর হলেও তাঁর জননীর কাছে তিনি চিরকালই সেই স্নেহাতিশয্যে ঘেরা সন্তান, যার জন্য অপেক্ষা কখনো ফুরোয় না। এই সত্য উপলব্ধি করলে বুকের ভেতর এক হাহাকার জেগে ওঠে, কারণ জননীর কাছে সন্তান কেবল একজন মানুষ নন, তিনি তাঁর বেঁচে থাকার প্রেরণা ও সবচেয়ে আপন সত্তা। পৃথিবী হয়তো শহীদ সন্তানকে বীরের মর্যাদায় ভূষিত করে, কিন্তু মায়ের মন কেবল এক পলক সন্তানের মুখ দেখার আকুতি জানায়।

আনিসুল হকের রচনার মুন্সিয়ানা হলো তিনি কেবল ইতিহাসের ঘটনাপ্রবাহ ফুটিয়ে তোলেননি, বরং তার অন্তরালে থাকা মানুষের সুপ্ত অনুভূতিগুলোকে জাগিয়ে তুলেছেন। তাঁর পঠনপাঠন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, মুক্তিযুদ্ধ শুধুই বিজয়ের উৎসব নয়; এটি বহু পরিবারের ভাঙন, অপূর্ণ স্বপ্ন এবং প্রিয়জনকে হারিয়েও আদর্শের পথে অটল থাকার দলিল।

স্বাধীনতা অর্জনের উৎসব আমরা যেভাবে সহজে পালন করি, তার পেছনের ত্যাগকে হয়তো সেভাবে উপলব্ধি করি না। লাল-সবুজের পতাকার দিকে তাকালে বুক গর্বে ভরে উঠলেও, সেই পতাকার দাবিতে মায়েরা যে বুকফাটা কান্না ও দীর্ঘ অপেক্ষার মুখোমুখি হয়েছেন, তা স্মরণ রাখা আবশ্যক।

তামান্না তাবাসসুমের মতে, ‘মা’ নিছক মাতৃত্বের কোনো কাহিনী নয়; এটি ভালোবাসার এমন এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ যেখানে ব্যক্তিগত কষ্টের চেয়েও মহীয়ান হয়ে ওঠে আদর্শ। এই উপন্যাসের মাধ্যমে উপলব্ধি করা যায় যে কিছু ত্যাগের ঋণ কোনো কিছু দিয়েই শোধ করা সম্ভব নয়, আর কিছু ভালোবাসার গভীরতা বর্ণনাতীত।

বইটির শেষ পাতা উল্টানোর পর উপলব্ধি হয় যে, শহীদদের নাম ইতিহাসে খোদাই করা যায় এবং তাঁদের স্মরণে স্মৃতিসৌধও গড়া সম্ভব, কিন্তু মায়েদের হৃদয়ে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয় তার কোনো স্মারক থাকে না। সেই বুকচাপা কষ্ট তাঁরা আজীবন নীরবতা দিয়ে বহন করে যান এবং স্মৃতির ঠিকানায় সন্তানকে খুঁজে ফেরেন।

দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী তামান্না তাবাসসুম আরিশার পর্যবেক্ষণে, আনিসুল হকের এই সাহিত্য শুধু চোখ ভেজায় না, বরং অন্তরাত্মাকে নতুন উপলব্ধির আলোয় সমৃদ্ধ করে। এটি আমাদের চেতনায় গেঁথে দেয় যে, প্রতিটি শহীদের বীরত্বের নেপথ্যে থাকে একটি তছনছ হয়ে যাওয়া পৃথিবী, যার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করেন একজন মা।

সবশেষে বলা যায়, কিছু উপন্যাসের ইতিবাচক সমাপ্তি ঘটলেও তাদের অবয়বে জন্ম নেওয়া কান্না ও ভালোবাসার আবেগের কোনো অবসান ঘটে না। ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী তামান্না তাবাসসুম আরিশার এই লেখনীর মাধ্যমে বইটির সারবত্তা অত্যন্ত সুন্দরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
ইরান পরিস্থিতি নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে ট্রাম্প

ইরান পরিস্থিতি নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে ট্রাম্প