২০১৯ সালের ইস্টার সানডেতে শ্রীলঙ্কায় ভয়াবহ আত্মঘাতী বোমা হামলা ঠেকাতে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগে দেশটির সাবেক পুলিশপ্রধান এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাবেক এক শীর্ষ কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আদালত।
শুক্রবার তিন বিচারকের একটি বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে এই রায় দেন।আদালতের মতে, সাবেক পুলিশপ্রধান পুজিথ জয়াসুন্দরা এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব হেমাসিরি ফার্নান্দো সম্ভাব্য হামলার আগাম সতর্কতা পাওয়ার পরও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেননি। তাদের এই ব্যর্থতার কারণেই শত শত মানুষের প্রাণহানি ঘটে। ২০১৯ সালের ২১ এপ্রিল ইস্টার সানডের দিন ইসলামিক স্টেট (আইএস) থেকে অনুপ্রাণিত জঙ্গিরা শ্রীলঙ্কার তিনটি গির্জা এবং তিনটি বিলাসবহুল হোটেলে ধারাবাহিক আত্মঘাতী বোমা হামলা চালায়। এতে দুই অস্ট্রেলীয় নাগরিকসহ ২৬০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন।আহত হন আরো ৫০০ জনের বেশি। নিহতদের মধ্যে ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক মানিক সুরিয়ারাচ্চি এবং তার মেয়ে আলেক্সেন্দ্রিয়া। তারা রাজধানী কলম্বোর উত্তরে নেগোম্বোর একটি গির্জায় প্রার্থনায় অংশ নেওয়ার সময় বিস্ফোরণের শিকার হন।আদালতে শুনানির সময় জানানো হয়, হামলার কয়েক সপ্তাহ আগে ভারতের একটি গোয়েন্দা সংস্থা শ্রীলঙ্কাকে সম্ভাব্য আত্মঘাতী হামলার বিষয়ে সতর্ক করেছিল।ওই সতর্কবার্তায় ইসলামপন্থি উগ্রপন্থীদের হামলার আশঙ্কার কথা উল্লেখ ছিল। কিন্তু সেই তথ্য পাওয়ার পরও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়নি এবং হামলা ঠেকাতে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে আদালত পর্যবেক্ষণ দেন। বর্তমানে ৬৬ বছর বয়সী পুজিথ জয়াসুন্দরা এবং ৭৬ বছর বয়সী হেমাসিরি ফার্নান্দো এই রায়ের বিরুদ্ধে শ্রীলঙ্কার সুপ্রিম কোর্টে আপিল করতে পারবেন। তবে আপিলের আগে তারা জামিন না পাওয়া পর্যন্ত কারাগারেই থাকবেন। যদিও আদালত তাদের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন, তবে শ্রীলঙ্কায় ১৯৭৬ সালের পর থেকে কোনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়নি।ফলে আইন বিশেষজ্ঞদের ধারণা, শেষ পর্যন্ত তাদের সাজা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে পরিবর্তিত হতে পারে।
ইস্টার সানডে হামলার কয়েক মাস পর, ২০১৯ সালে জয়াসুন্দরা ও ফার্নান্দোকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রায় চার মাস কারাগারে থাকার পর তারা জামিনে মুক্তি পান। পরে ২০২২ সালে তিন বিচারকের একটি হাইকোর্ট বেঞ্চ একই অভিযোগ থেকে তাদের খালাস দেন। তবে রাষ্ট্রপক্ষ সেই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করলে সুপ্রিম কোর্ট মামলাটি নতুন করে শুনানির নির্দেশ দেন। এরপর চলতি বছরের মার্চে পুনরায় বিচার শুরু হয় এবং সর্বশেষ আদালত তাদের দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন। এর আগে একটি দেওয়ানি মামলায় আদালত হামলায় বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে এই দুই সাবেক কর্মকর্তাকে যৌথভাবে ১২ কোটি ৫০ লাখ শ্রীলঙ্কান রুপি, অর্থাৎ প্রায় ৫ লাখ ৩১ হাজার ৮০০ মার্কিন ডলার পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছিলেন।রাষ্ট্রপক্ষ আদালতে দাবি করেছিল, দুই শীর্ষ কর্মকর্তার অবহেলা ছিল অত্যন্ত গুরুতর এবং তা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের শামিল। সেই কারণেই তাদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলাও করা হয়। ২০২৪ সালে ক্ষমতায় আসা শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট অনুরা কুমারা দিসানায়েকে নির্বাচনী প্রচারে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ইস্টার সানডে হামলার জন্য দায়ীদের আইনের আওতায় আনা হবে। সাম্প্রতিক এই রায়কে সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর