অধিকৃত পশ্চিম তীরের তাইবেহ শহরে ইউরোপীয় কূটনীতিক, ফ্রান্সের এক মেয়র ও কামব্রের আর্চবিশপের ওপর হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা। এতে তিনজন আহত হয়েছেন এবং একটি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফিলিস্তিনিদের নিজেদের জমিতে জলপাই সংগ্রহে বাধা দেওয়ার ধারাবাহিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এ হামলার ঘটনা ঘটেছে। খবর দ্য গার্ডিয়ানের।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) হামলার শিকার হন উত্তর ফ্রান্সের অলনোয়া-আইমেরি শহরের মেয়র বার্নার্ড বোদু। তিনি মেয়রের দায়িত্বের প্রতীক হিসেবে ফ্রান্সের লাল, সাদা ও নীল রঙের ফিতা পরা অবস্থায় কূটনৈতিক নম্বরপ্লেটযুক্ত একটি গাড়িতে উঠতে যাচ্ছিলেন। এ সময় এক হামলাকারী তাকে আঘাত করে মাটিতে ফেলে দেয়।
এক প্রত্যক্ষদর্শীর তথ্য অনুযায়ী, হামলার সময় মুখোশধারী ওই ব্যক্তি ‘ভিভ লা ফ্রঁস’ (ফ্রান্স দীর্ঘজীবী হোক) বলে চিৎকার করছিল। বোদুর স্ত্রী এবং কামব্রের আর্চবিশপ ভিনসেন্ট ডলমানকেও হুমকি দেয় সাতজনের দলটি। তাদের কয়েকজনের হাতে লাঠি ছিল।
ফিলিস্তিনের খ্রিষ্টান-অধ্যুষিত তাইবেহ শহরের জমিতে জলপাই সংগ্রহে অংশ নিতে গিয়েছিলেন ওই ব্যক্তিরা। তাদের সঙ্গে ছিলেন জেরুজালেমে নিযুক্ত ফরাসি কনসাল জেনারেল, তার স্ত্রী, অন্য কয়েকজন কূটনীতিক এবং বেলজিয়াম ও পোল্যান্ডের কনসালরা।
প্রথমে তাইবেহের কাছের পাহাড়ের নিচের ঢালে জলপাই সংগ্রহে ব্যস্ত একটি দলের ওপর হামলা চালায় বসতি স্থাপনকারীরা। তারা জলপাই চুরির পাশাপাশি ৭০ বছরের বেশি বয়সী এক ফিলিস্তিনি নারীকে লাথি মারে ও গালাগাল করে। এক ব্যক্তিকে এতটাই মারধর করা হয় যে মাথার ক্ষত সারাতে তাকে ছয়টি সেলাই দিতে হয়।
এরপর কূটনীতিকদের ও মেয়র বোদুকে লক্ষ্য করে হামলা চালায় দলটি। উত্তর ফ্রান্সের তার শহরের সঙ্গে তাইবেহের মধ্যে শহর-জোড়া সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার চুক্তি চালু করতে সেখানে গিয়েছিলেন বোদু। হামলার সময় বেলজিয়ামের কূটনৈতিক মিশনের একটি সাঁজোয়া গাড়ির জানালাও ভেঙে ফেলে হামলাকারীরা।
বেলজিয়ামের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ম্যাক্সিম প্রেভো ফিলিস্তিনি, বিদেশি কূটনীতিক ও সাংবাদিকদের ওপর এ সহিংসতার নিন্দা জানিয়েছেন। বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞা আরোপের উদ্যোগ অব্যাহত রাখার কথাও জানান তিনি।
প্রেভো বলেন, ‘জলপাই সংগ্রহ, সংবাদ পরিবেশন কিংবা কূটনৈতিক দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কাউকেই হামলার ঝুঁকিতে পড়া উচিত নয়। ইসরায়েলের অবৈধ বসতি স্থাপনের নীতি থেকে এ সহিংসতাকে আলাদা করে দেখা যায় না। ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের দখলদারত্বের অবসান ঘটাতে হবে।’
তাইবেহের বাসিন্দারা বহু বছর ধরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের ক্রমবর্ধমান হামলার শিকার হলেও সেখানে আগে কখনো বিদেশি কূটনীতিকদের লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়নি বলে জানিয়েছেন শহরটির গির্জার যাজক ফাদার বাশার ফাওয়াদলেহ।
তিনি বলেন, ‘আজ যা ঘটেছে, তা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার ক্ষেত্রে এটি গভীরভাবে উদ্বেগজনক এক উত্তরণ।’
ফাদার ফাওয়াদলেহ বলেন, ‘আন্তর্জাতিক সাক্ষীদের সামনেই যদি এ ধরনের সহিংসতা ঘটতে পারে, তাহলে তাঁরা চলে যাওয়ার পর স্থানীয় পরিবার ও কৃষকদের নিরাপত্তা কোথায়? সে প্রশ্ন উঠতেই পারে। নিজেদের জমি থেকে জলপাই সংগ্রহ করতে গিয়ে কারও শারীরিক হামলার ঝুঁকি নেওয়া উচিত নয়।’
শুক্রবার আবু ফালাহ শহরে জলপাই সংগ্রহের খবর সংগ্রহের সময় ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় গুরুতর আহত হন ওয়াশিংটন পোস্টের আলোকচিত্রী হেইডি লেভিন। শনিবার সকালে তার অস্ত্রোপচার করা হয়। তাকে চিকিৎসা দেওয়া ইসরায়েলের বেইলিনসন হাসপাতালের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, বর্তমানে তার শারীরিক অবস্থা মাঝারি পর্যায়ে রয়েছে।
ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিওন সার হামলার নিন্দা জানিয়েছেন এবং পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন। তবে অধিকৃত পশ্চিম তীরে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় ছাড়া চলাচল করলে বিদেশি কূটনীতিকেরা ইসরায়েলি নাগরিকদের হামলার ঝুঁকিতে পড়তে পারেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক পশ্চিমা কূটনৈতিক সূত্র বলেছে, কূটনীতিকদের ভ্রমণের আগে আগাম তথ্য জানাতে বাধ্য করা কূটনৈতিক রীতিনীতি ও আন্তর্জাতিক আইন উভয়েরই পরিপন্থি।
ওই সূত্রের ভাষ্য, ‘পশ্চিম তীরের অধিকাংশ এলাকা, এরিয়া বি ও সিতে নিরাপত্তার দায়িত্ব ইসরায়েলের। ফলে সেখানে সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতাও দেশটির রয়েছে।’
অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি সহিংসতার ক্ষেত্রে প্রায় সম্পূর্ণ দায়মুক্তির যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ ওলমার্ট। এ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
চলতি মাসের শেষ দিকে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করার প্রত্যাশী বিরোধী রাজনীতিক ও সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকট হামলাটিকে ইসরায়েলি সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় ইহুদি সন্ত্রাস বলে আখ্যা দিয়েছেন।
আইজেনকট অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইহুদি বসতি সম্প্রসারণের সমর্থক। তবে তার মতে, বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন, কারণ হামলাকারীরা পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনের উদ্যোগ ও জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষতি করছে।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর