নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
ভারতের অত্যন্ত জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠি সম্প্রতি ককরোচ জনতা পার্টি বা সংক্ষেপে সিজেপি নামক একটি রাজনৈতিক দলের প্রতি নিজের প্রকাশ্য সমর্থন ব্যক্ত করেছিলেন। এই দলটিকে সমর্থন জানানোর পরিণতি হিসেবেই এবার প্রবাসী এই ভারতীয় ইউটিউবারের বিরুদ্ধে বিগত আট বছর আগে দায়ের হওয়া একটি ফৌজদারি মানহানির মামলায় নতুন করে আইনি সমন জারি করা হয়েছে।
আজ শনিবার দিল্লির সাকেত আদালত এই সমন জারি করার আনুষ্ঠানিক নির্দেশ দিয়েছেন। যেহেতু ধ্রুব রাঠি বর্তমানে দেশ ছেড়ে সুদূর বিদেশে বসবাস করছেন, তাই আদালতের সেই সমনটি সরাসরি দিল্লি সংলগ্ন হরিয়ানা রাজ্যের গুরুগ্রাম এলাকায় অবস্থিত তাঁর নিজ বাড়ির মূল দরজায় সাঁটিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই বিশেষ মামলার পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ৩ নভেম্বর তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে।
এদিকে এই ফৌজদারি মানহানির মামলাটি আদালতে দায়ের করেছিলেন বিকাশ সংকৃত্যায়ন, যিনি পরিচিত বিকাশ পান্ডে নামেও। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ‘আই সাপোর্ট নরেন্দ্র মোদি’ শিরোনামে একটি পেজ পরিচালনা করে থাকেন। তাঁর সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছিল যে, ধ্রুব রাঠির নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেলে ‘বিজেপি আইটি সেল পার্ট ২’ নামের একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছিল।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ওই বিতর্কিত ভিডিওটিতে ধ্রুব রাঠি প্রকাশ্যেই দাবি করেছিলেন যে বিকাশ নাকি ভারতীয় জনতা পার্টির আইটি সেলের দ্বিতীয় শীর্ষ স্থানীয় একজন কর্তা। শুধু তাই নয়, বিকাশ পান্ডের আরও গুরুতর অভিযোগ ছিল যে, তাঁর বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অসম্মানজনক ও সম্পূর্ণ ভুয়া খবর ছড়ানোর উদ্দেশ্যে বিকাশ নাকি মহাবীর প্রসাদ নামের এক ব্যক্তিকে বড় অংকের অর্থাৎ ৫০ লাখ রুপি ঘুষ দিতে চেয়েছিল।
বিকাশ জোরালোভাবে দাবি করেছেন যে, ধ্রুব রাঠির সেই ভিডিওতে করা সমস্ত অভিযোগই পুরোপুরি মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। এ ধরনের মিথ্যা প্রোপাগান্ডার কারণে সমাজে তাঁর ব্যক্তিগত সম্মান ও সুনাম চরমভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে। আর এই সুস্পষ্ট মানহানির অভিযোগের ভিত্তিতেই তিনি ইউটিউবারের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ হিসেবে এই ফৌজদারি মামলাটি দায়ের করেছিলেন।
উল্লেখ্য যে, অতীতে ধ্রুব রাঠির আপলোড করা সেই একই ভিডিওটি দিল্লির তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল নিজ অ্যাকাউন্ট থেকে রিটুইট করেছিলেন। এর ফলে দিল্লির সেই আম আদমি পার্টির শীর্ষ নেতাও বড় ধরনের আইনি জটিলতায় জড়িয়ে পড়েছিলেন এবং পরবর্তীতে তাঁকে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে প্রকাশ্যে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হয়েছিল।
মূল মামলাটি আদালতে রুজু হওয়ার পর ২০১৯ সালের জুলাই মাসের দিকে বিচারক ধ্রুব রাঠিকে প্রথমবারের মতো সমন পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু ইউটিউবার তখন থেকেই জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার মতো ইউরোপীয় দেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করায় সেই সমন যথাযথভাবে কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। যার ফলে সম্পূর্ণ আইনি প্রক্রিয়ার গতি অত্যন্ত শ্লথ হয়ে পড়েছিল এবং দীর্ঘসূত্রতা দেখা দিয়েছিল।
পরবর্তীতে ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপি গঠিত হওয়ার পর এবং তাদের বিভিন্ন সরকারবিরোধী আন্দোলন শুরু হলে ধ্রুব রাঠি দূর থেকেই সেগুলোকে রীতিমতো সমর্থন জানাতে থাকেন। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, কর্ণাটকের রাজধানী বেঙ্গালুরুতে সিজেপির আয়োজিত একটি আন্দোলনে সশরীরে অংশ নিতে তিনি জার্মানি থেকে কিছুদিনের জন্য ভারতে চলে আসেন।
বেঙ্গালুরুর রাজপথের সেই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে শামিল হওয়ার পর তিনি রাজধানী দিল্লিতেও আসেন এবং গত ১০ অক্টোবর ‘যন্তর মন্তর ২.০’ নামক একটি বিশেষ অভিযানে অংশ নেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে দুর্ভাগ্যবশত সেই কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার আগেই দিল্লি পুলিশ তাঁকে আটক করেছিল, যা সংবাদমাধ্যমে বেশ আলোচিত হয়েছিল।
ধ্রুব রাঠির হঠাৎ করে দেশে ফিরে আসা এবং সিজেপির মতো দলের হয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ার খবর চারদিকে জানাজানি হওয়ার পর দীর্ঘদিনের পুরোনো সেই মামলাটি নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। মামলাকারী বিকাশের আইনজীবী সাকেত আদালতে জরুরি ভিত্তিতে উপস্থিত হয়ে আবেদন জানান যে ধ্রুব রাঠি এখন ভারতেই অবস্থান করছেন।
আইজীবীর এই চাঞ্চল্যকর তথ্য শোনার পর আদালত গত ১২ অক্টোবর একটি বিশেষ সমন জারির আনুষ্ঠানিক অনুমতি প্রদান করেন। আইনজীবীর ভাষ্যমতে, আদালতের এক নিবেদিত কর্মী সেই সমনটি নির্দিষ্ট ঠিকানায় পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে সোজা দিল্লির নিকটবর্তী হরিয়ানার গুরুগ্রামে ধ্রুব রাঠির বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হন।
কিন্তু আদালতের কর্মী ১৭ অক্টোবর নির্দিষ্ট সেই ঠিকানায় পৌঁছানোর পর দেখতে পান যে বিশাল বাড়িটির প্রধান ফটকে তালা ঝুলছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে আজ শনিবার আদালত নতুন করে জামিনযোগ্য পরোয়ানা জারির নির্দেশ দেন এবং আগামী ৩ নভেম্বর সেই পরোয়ানা সঠিকভাবে কার্যকর হয়েছে কি না, তার প্রতিবেদন খতিয়ে দেখার দিন ধার्य করেছেন।
অন্যদিকে, ভারতের বর্তমান মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি এবং এসআইআর প্রক্রিয়া অবিলম্বে বাতিলের দাবিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিরোধী দলগুলো তীব্র আন্দোলন শুরু করেছে। এই প্রেক্ষাপটে আগামী রোববার দিল্লির ঐতিহাসিক রামলীলা ময়দানে বিরোধী জোটের পক্ষ থেকে একটি বিশাল বিক্ষোভ সমাবেশের আনুষ্ঠানিক আয়োজন করা হয়েছে।
এরই অংশ হিসেবে আজ শনিবার কংগ্রেসের জাতীয় সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গের নিজ বাসভবনে বসে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে প্রতীকী ‘গণ–অভিশংসন’ করা হয়েছে। এদিকে বিদেশে বসেই ধ্রুব রাঠি বিরোধীদের এই চলমান আন্দোলনকে জোরালো সমর্থন জানিয়েছেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও বার্তা প্রকাশ করেছেন। সেই বার্তায় তিনি দলমত নির্বিশেষে দেশের সকল নাগরিককে ‘গণতন্ত্র রক্ষার খাতিরে’ রামলীলা ময়দানের সমাবেশে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর