নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
আমাদের প্রধান রপ্তানি খাতে চলমান অস্থিরতা, উৎপাদন ইউনিট বন্ধ রাখার ঘটনা এবং শ্রমিকদের পক্ষ থেকে সর্বনিম্ন বেতন দ্বিগুণ করার তাগিদ দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও বৈদেশিক বাণিজ্যের অন্যতম বড় সত্যকে ফুটিয়ে তুলেছে। শিল্পাঞ্চল হিসেবে পরিচিত সাভারের উপকণ্ঠে অর্ধশ শতকের বেশি প্রতিষ্ঠানে ছুটি দেওয়া এবং কর্মচারীদের প্রতিমাসের ন্যূনতম বেতন বর্তমানের এগারো-বারো হাজার থেকে বাড়িয়ে ত্রিশ হাজার টাকায় উন্নীত করার দাবিটি কেবল আর্থিক প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়; এটি মূলত খেটে খাওয়া মানুষের জীবিকার খরচ, উৎপাদন প্রতিষ্ঠানের টিকে থাকার ক্ষমতা এবং বিশ্ববাজারে আমাদের দেশের মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানের সঙ্গে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে জড়িত।
পূর্ববর্তী তিন বছরের ব্যবধানে দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি এবং জিনিসপত্রের দাম বাড়ার কারণে কর্মীদের প্রকৃত উপার্জন এবং জিনিস কেনার ক্ষমতা দারুণভাবে হ্রাস পেয়েছে। ফলস্বরূপ, নতুন বেতন কাঠামোর এই দাবিকে কেবল বাড়তি অর্থ আদায়ের সাধারণ চেষ্টা হিসেবে ভাবার কোনো অবকাশ নেই; বরং এটি দিনমজুর শ্রেণির মানুষের বেঁচে থাকার ন্যূনতম অধিকার ফিরিয়ে পাওয়ার ন্যায্য সংগ্রাম। এই পুরো প্রক্রিয়ায় নীতিনির্ধারক মহলের কার্যক্রম নিয়েও নানা ধরনের সংশয় তৈরি হয়েছে। গত মাসের মাঝামাঝি সময়ে নতুন বেতন কমিটি গঠনের ঘোষণা দেওয়ার পরও সেটির বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রিতা লক্ষ করা গেছে।
শ্রমিকদের রাজপথের আন্দোলন, চলাচলের পথ আটকে রাখা এবং প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বেতন কমিটি গঠনের এই পদক্ষেপ প্রশাসনের দূরদর্শিতার অভাব এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে অর্থবহ আলোচনার ঘাটতিকেই স্পষ্ট করে তোলে। যথাযথ সময়ে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা গেলে হয়তো বর্তমানের এই অবনতিশীল পরিস্থিতি এবং পণ্য উৎপাদনের বিশাল ক্ষতি অনেকাংশেই রোধ করা যেত। কিন্তু বাণিজ্যিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচার করলে, হুট করে সর্বনিম্ন বেতন দ্বিগুণ বা তারও বেশি করা এই খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য প্রচণ্ড আর্থিক সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বিশেষ করে কম লাভ করা ছোট ও মাঝারি মাপের কারখানাগুলোর সামগ্রিক খরচ বহুগুণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বিদেশে পণ্য পাঠানোর ক্ষেত্রে শ্লথগতি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি, বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দা ভাব এবং দেশের ভেতরকার মুদ্রাস্ফীতি সামগ্রিক ব্যবসার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। ফলে কর্মীদের বেতন বৃদ্ধি এবং প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সামর্থ্যের মাঝে একটি সুষম মেলবন্ধন তৈরি করা কোনোভাবেই সহজসাধ্য নয়। কলকারখানার খরচ বাড়লে পণ্যের দামও বাড়িয়ে দিতে হতে পারে, যা আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী অন্যান্য দেশের তুলনায় আমাদের বাজারদরকে কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে ঠেলে দিতে পারে।
তাছাড়া বিদেশি ক্রেতারা অনেক সময় বাড়তি খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পণ্যের মূল্য বাড়াতে নারাজ হওয়ায় এই অতিরিক্ত খরচের মূল চাপ শেষ পর্যন্ত মালিকপক্ষের ঘাড়েই পড়ার প্রবল আশঙ্কা তৈরি হয়। তবে মালিকদের নানা ব্যবসার সংকটের দোহাই দিয়ে সাধারণ কর্মীদের কমে যাওয়া আয়ের বিষয়টি পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়াও কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। কর্মক্ষেত্রে অসন্তোষ, কাজ বন্ধ রাখা, প্রতিষ্ঠান তালাবদ্ধ থাকা, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং নির্দিষ্ট সময়ে পণ্য সরবরাহ করতে না পারা বিশ্ববাজারের ক্রেতাদের আস্থা এবং আমাদের বৈদেশিক বাণিজ্যের সক্ষমতাকে আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
এই বাস্তবতায় কর্মীদের নায্য পাওনার দাবি এবং ব্যবসার আর্থিক কাঠামোর মধ্যে একটি বাস্তবসম্মত সমতা বিধান করা অত্যন্ত জরুরি একটি কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গঠিত কমিটির মূল দায়িত্ব হওয়া উচিত খেটে খাওয়া মানুষের জীবনযাপনের বাস্তব খরচ, মুদ্রাস্ফীতির হার, কারখানার আর্থিক সামর্থ্য এবং বিশ্ববাজারের প্রতিযোগিতার বিষয়টি মাথায় রেখে একটি সুন্দর ও দীর্ঘস্থায়ী বেতন কাঠামো প্রস্তুত করা। এক লাফে বড় ধরনের বেতন বাড়ানোর পরিবর্তে প্রয়োজন অনুযায়ী ধাপে ধাপে বেতন সমন্বয় করা, কাজের গতি বাড়ানো, আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার নিশ্চিত করা, কারখানা পরিচালনার মান উন্নত করা এবং বিদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকে পণ্যের সঠিক মূল্য আদায় নিয়ে অর্থবহ আলোচনা চালানো দরকার।
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও ক্রেতাপ্রতিষ্ঠানগুলোকেও খেটে খাওয়া মানুষের উপযুক্ত পাওনা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আর্থিক দায়িত্ব কাঁধে নিতে হবে। প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদেরও উচিত কেবল সমস্যা তৈরি হওয়ার পর দায়সারা গোছের প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে বরং নিয়মিত বৈঠক করা, নির্দিষ্ট সময়ে বেতন পর্যালোচনা করা এবং বাস্তবসম্মত শ্রমিক আইন নিশ্চিত করা। আমাদের দেশের এই পোশাক খাতের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কেবল কম বেতনের ওপর টিকে থাকা উচিত নয়; বরং এটি হওয়া উচিত কাজের গতি, পণ্যের ভালো মান, দক্ষ পরিচালনা এবং সৌহার্দ্যপূর্ণ শ্রমিক-মালিক সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে। আমাদের সবাইকে মাথায় রাখতে হবে যে খেটে খাওয়া মানুষের সুন্দর জীবন নিশ্চিত করা এবং ব্যবসার দীর্ঘমেয়াদী অগ্রগতি একে অপরের পরিপন্থী নয়; বরং সুদূর ভবিষ্যতে একটি শক্তিশালী, দায়িত্বশীল ও বৈশ্বিক মানে লড়াই করার মতো পোশাক খাত বানাতে উভয় পক্ষই সমানভাবে প্রয়োজন।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর