ঢাকা | বঙ্গাব্দ

সামাজিক মাধ্যমে তথ্যপ্রবাহের চ্যালেঞ্জ ও অপেশাদারদের দৌরাত্ম্য

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Nov 4, 2026 ইং
সামাজিক মাধ্যমে তথ্যপ্রবাহের চ্যালেঞ্জ ও অপেশাদারদের দৌরাত্ম্য ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

বর্তমান সময়ে সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা মহলে গভীর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এর মূল কারণ হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপক প্রসারের ফলে প্রচলিত গণমাধ্যমের ওপর থেকে তথ্যপ্রবাহের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়া। ইন্টারনেট সংযোগ ও আধুনিক মুঠোফোনের সহজলভ্যতার যুগে নির্দিষ্ট সময়ে টেলিভিশনের পর্দার সামনে বসে থাকা কিংবা সকালবেলা দৈনিক খবরের কাগজের জন্য অপেক্ষা করার পুরোনো অভ্যাস এখন আর নেই বললেই চলে। যেকোনো ছোট-বড় ঘটনা বা দুর্ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গেই তার স্থিরচিত্র বা ভিডিও ক্লিপ মুহূর্তের মধ্যে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছে।

স্মার্টফোনের যুগ শুরু হওয়ার পর থেকেই অনেকে বলতে শুরু করেন যে নাগরিক সাংবাদিকতার দিন আসছে। এমনকি অনেক পুরোনো ও প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যমও ক্রাউডসোর্সিং বা সাধারণ মানুষের ধারণ করা ছবি ও ভিডিও ব্যবহারের ওপর নির্ভরতা বাড়াতে শুরু করে। ২০১৬ সালে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের একটি গবেষণায় বলা হয়েছিল, ২০০৯ সালের পর থেকেই বিশ্বের প্রথমসারির সংবাদমাধ্যমগুলোর বার্তাকক্ষগুলো দ্রুত খবর সংগ্রহ এবং তা বিতরণের কাজে সোশ্যাল মিডিয়াকে যুক্ত করার উপায় খুঁজছে।

আমাদের দেশে এই পরিবর্তিত বাস্তবতাকে মেনে নেওয়ার প্রক্রিয়াটি কিছুটা বিলম্বে শুরু হয়েছে। সংবাদপত্রের বার্তাকক্ষগুলোতে অনেক সময় খবরের প্রকৃত মূল্যায়নের চেয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার জনপ্রিয়তার গতিপ্রকৃতি বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে, যা ঐতিহ্যবাহী সম্পাদকীয় গরিমাকে ম্লান করে দিচ্ছে। এর সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা বিভিন্ন ভুয়া কনটেন্টের মারাত্মক চ্যালেঞ্জ।

প্রযুক্তির এই রূপান্তরের কারণে অনেকের মনে এই ভুল ধারণার সৃষ্টি হয়েছে যে অবাধ তথ্যপ্রবাহের ধারা অনেক শক্তিশালী হয়েছে এবং প্রাতিষ্ঠানিক সাংবাদিকতার প্রয়োজনীয়তা কমে গেছে। সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে কিছু পেশাদার সাংবাদিক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে ব্যক্তিগতভাবে প্রভাবশালী হয়ে ওঠার পাশাপাশি প্রচুর অপেশাদার মানুষও বিপুল পরিমাণ অনুসারী তৈরি করতে সমর্থ হয়েছেন।

তবে সংবাদের সত্যতা যাচাই কিংবা জনস্বার্থ সংরক্ষণের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালা ছাড়াই এই ইনফ্লুয়েন্সারদের জনপ্রিয়তা ও সহজ উপার্জনের সুযোগ তৈরি হওয়ায় মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর প্রবণতা বিপজ্জনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলেই বর্তমানে উন্নত দেশগুলোতে অ্যান্টিইনফ্লুয়েন্সার বা ডিইনফ্লুয়েন্সার আন্দোলন অত্যন্ত জোরালো হয়ে উঠেছে এবং ভোগ্যপণ্যের বাজারে তারা সাফল্যও পাচ্ছে।

বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তার দেরিতে হওয়ায় এসব প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অপতৎপরতা প্রতিরোধের উদ্যোগ এখনো কাঙ্ক্ষিত গতি পায়নি। পাশাপাশি, এ দেশের প্রভাবশালী ইনফ্লুয়েন্সাররা বাণিজ্যিক পৃষ্ঠপোষকতা অর্জনে খুব একটা সফল হতে পারেননি, বরং তাঁদের বেশিরভাগ কার্যক্রম মূলত রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর স্বার্থে পরিচালিত হয়ে থাকে।

একাধিক সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে সংঘবদ্ধ দল তৈরির মাধ্যমে দেশের শীর্ষস্থানীয় দুটি পত্রিকা প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের কার্যালয়ে হামলা এবং অগ্নিসংযোগের মতো ন্যক্কারজনক অপরাধ সংঘটিত করার মধ্য দিয়ে তাদের এই destructive ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।

অবাধ তথ্যপ্রবাহের এই যুগে আরেকটি বড় সমস্যা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে অপেশাদারদের দৌরাত্ম্য। মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলোর কর্মীরা যখন মাঠে কাজ করতে যান, তখন প্রায় প্রতিটি ঘটনার সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে তাদের এই অনিয়মিত ও মুঠোফোননির্ভর শৌখিন খবর সংগ্রাহকদের ব্যাপক ভিড়ের মুখোমুখি হতে হয়।

পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ ধারণ করে যখন এই অপেশাদার সংবাদকর্মীরা বিভিন্ন স্থানে খবর সংগ্রহ ও তা প্রচার করার বিনিময়ে অর্থ দাবি করতে শুরু করেন। এর ফলে একদিকে যেমন প্রকৃত পেশাদার সাংবাদিকদের সামাজিক মর্যাদা মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের মনে এই ধারণার বীজ রোপিত হচ্ছে যে টাকা খরচ করলেই যেকোনো খবর কেনা সম্ভব।

গণমাধ্যমের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ক্ষেত্রেও ঠিক একই ধরনের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি সংখ্যক সংবাদমাধ্যম বাজারে এসেছে। আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার কোনো সুদূর প্রসারী সম্ভাবনা নেই জানা সত্ত্বেও অনেক প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তা নতুন নতুন গণমাধ্যম গড়ে তুলেছেন।

বিশেষ করে শেখ হাসিনার দীর্ঘ ১৭ বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসনামলে অতিরিক্ত সংখ্যা দিয়ে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রমাণের একটি সরকারি অপকৌশল অব্যাহত ছিল। সেই সময়ে দলীয় মতাদর্শে বিশ্বাসী তোষণকারীদের অবাধে নতুন নতুন সংবাদমাধ্যম খোলার সরকারি অনুমতি দেওয়া হতো।

পত্রিকা বিতরণকারী হকারদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাজারে যেখানে নিয়মিতভাবে ৫০টির বেশি দৈনিক বিক্রি হয় না, ঠিক সেখানে জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত সরকারি হিসাব অনুযায়ী নিবন্ধিত পত্রিকার সংখ্যা ১৪৩৬টিতে গিয়ে ঠেকেছে। এর মধ্যে শুধু রাজধানী ঢাকা থেকেই প্রকাশিত হয় বলে দাবি করা হয় ৫৯২টি দৈনিক সংবাদপত্র।

ফলে এগুলোর সিংহভাগেরই মূল লক্ষ্য থাকে নানা উপায়ে রাষ্ট্রীয় আর্থিক সুবিধা বা বিজ্ঞাপন হাতিয়ে নেওয়া। অনেক প্রকাশকের মূল উদ্দেশ্যই থাকে তাদের নিজস্ব বাণিজ্যিক কিংবা রাজনৈতিক স্বার্থের প্রচার ও প্রসার ঘটানো। রাজনৈতিক ক্ষমতার অংশীদার হওয়া অথবা নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষা করার প্রয়োজনে তারা মূলত এসব প্রতিষ্ঠানে বড় অংকের ভর্তুকি দিয়ে থাকেন।

এর পেছনে প্রধান কারণ হলো প্রচলিত এই ধারণাটি যে গণমাধ্যমের মালিকরা অত্যন্ত ক্ষমতাধর ব্যক্তি এবং যার নিয়ন্ত্রণে যত বেশি সংবাদমাধ্যম থাকবে, তিনি ততটাই বেশি প্রভাবশালী।

সংবাদমাধ্যমের এই অনিয়ন্ত্রিত ও মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধির কারণে বিজ্ঞাপন বাজার ও সামগ্রিক আয়ের ক্ষেত্রটি তীব্র সঙ্কটের মুখে পড়ছে। রুগ্ণ ও দুর্বল প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়ায় তারা বাধ্য হয়ে বিভিন্ন মহლის পৃষ্ঠপোষকতামুখী হয়ে পড়ছে। একটি সংবাদমাধ্যম যত বেশি বাহ্যিক পৃষ্ঠপোষকতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠবে, তার তোষণবাদী হওয়ার সম্ভাবনা ততটাই বাড়াবে এবং তারা স্বাধীন সাংবাদিকতা বিসর্জন দেবে।

এই অদৃশ্য ও অনানুষ্ঠানিক প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা কেবল সংবাদপত্রের মালিকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর মালিকানার ক্ষেত্রেও সমানভাবে বিস্তার লাভ করেছে। এই প্রভাব নিজেদের হাতে কুক্ষিগত করার অসুস্থ প্রতিযোগিতায় অনেক বাণিজ্যিক গোষ্ঠী একই সঙ্গে টেলিভিশন, সংবাদপত্র, রেডিও এবং অনলাইন নিউজ পোর্টাল পরিচালনা করছে। কেউ কেউ এই খাতে নতুন করে মূলধন বিনিয়োগ করছেন এবং একের পর এক প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণ করে চলেছেন।

পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় বিভিন্ন শিল্প খাতে অলিগার্কি বা মুষ্টিমেয় মানুষের একাধিপত্য তৈরি হতে দেওয়া হলেও কোনো সভ্য রাষ্ট্রই সংবাদমাধ্যমের জগতে একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে দেয় না। অথচ আমাদের দেশে এখন একাধিক প্রভাবশালী গোষ্ঠী গণমাধ্যমে অলিগার্কি প্রতিষ্ঠার উন্মাদ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত রয়েছে। এর ফলে বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক স্বার্থে অপতথ্য ছড়িয়ে অপসাংবাদিকতার লজ্জাজনক রেকর্ড সৃষ্টি হচ্ছে।

সবমিলিয়ে সংবাদমাধ্যমের এই অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার বিজ্ঞাপনের বাজার ও সামগ্রিক আয়ের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। দুর্বল ও অসুস্থ প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার কারণে তারা পৃষ্ঠপোষকতার ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে এবং এই নির্ভরতা তাদের তোষণবাদী ও স্বাধীনতাহীন করে তুলছে।

ইউটিউব, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, স্ন্যাপচ্যাট কিংবা টিকটকের মতো সামাজিক মাধ্যমগুলো যখন তথ্যপ্রবাহের জগতে নতুন নতুন মারাত্মক চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছে, তখন সম্মিলিতভাবে তা মোকাবিলা করার কোনো কৌশল খোঁজা হচ্ছে না। বরং এক অসুস্থ ও অন্ধ প্রতিযোগিতায় সংবাদমাধ্যমের বার্তাকক্ষগুলো নজিরবিহীন এক গভীর সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। সার্বিক অবস্থাকে এককথায় চরম নৈরাজ্যজনক বলাই শ্রেয়, আর নৈরাজ্য ও হতাশার এই সংক্রমণ অত্যন্ত দ্রুত ছড়ায় এবং বর্তমানে আমরা ঠিক সেই সংকটময় যুগ পার করছি।

সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
ব্যবসায়ে বরকত ও কল্যাণ অর্জনের তিন দিক

ব্যবসায়ে বরকত ও কল্যাণ অর্জনের তিন দিক